ঢাকা বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬

বিউটি বোর্ডিং

ঘর আছে, নেই সেই জৌলুস ও আড্ডা

ঘর আছে, নেই সেই জৌলুস ও আড্ডা
×

বিউটি বোর্ডিং

সাফা খাতুন

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১৩:৩৩ | আপডেট: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১৩:৪৫

সময় গড়িয়েছে সময়ের নিজস্ব নিয়মে। আর বিবর্তনের ধারায় হারিয়ে গেছে পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক ‘বিউটি বোর্ডিং’-এর সেই পুরনো রূপ ও জৌলুস। কালের সাক্ষী হয়ে নোনাধরা দেওয়ালে অতীতের ঐতিহ্য ও রোমাঞ্চকর স্মৃতি নিয়ে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে মূল ভবনটি। সময়ের পরিক্রমায় ভেতরের আসবাবপত্র পাল্টেছে, পরিবর্তন এসেছে মানুষ ও সংস্কৃতিতে। তবে ভবনটির দেওয়ালে এখনো বাঁধাই করা আছে প্রতিষ্ঠাতাদের ছবি, আর খোদাই করা রয়েছে গুণী মানুষদের নাম যারা দীর্ঘ সময় ধরে এই বোর্ডিংয়ের সাথে জড়িয়ে ছিলেন। ঘর ও অবকাঠামো আগের মতো থাকলেও, আজ আর নেই সেই মানুষ, সেই প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক চর্চা ও জাঁকজমকপূর্ণ আড্ডা।

একসময় পুরান ঢাকার এই বিউটি বোর্ডিং ছিল দেশের বরেণ্য কবি, সাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম প্রধান আড্ডাস্থল। সরস আড্ডায় মুখরিত থাকত প্রতিটি কোণ। কালের বিবর্তনে সেই মুখর আড্ডা এখন আর জমে ওঠে না। তবে ঐতিহ্যের টানে এখনো দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধারণ মানুষ ও ভ্রমণপিপাসুরা এখানে ছুটে আসেন। ছুটির দিন, বিশেষ করে শুক্রবারে দর্শনার্থীদের ভিড় একটু বেশিই চোখে পড়ে। মাঝে মাঝে ‘কবি সংসদ’ নামের একটি সংগঠন এখানে এসে কবিতার আসর বসায়। এছাড়া নতুন প্রজন্মের কবি-সাহিত্যিকরাও শিকড়ের টানে এখানে আসেন।

বাংলাবাজারের বইয়ের গলি পার হয়ে একটু সামনে এগোলেই চোখে পড়বে জীর্ণ দেওয়ালে লেখা ‘বিউটি বোর্ডিং’। ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা মেলে কিছুটা উন্মুক্ত চত্বর। চত্বরের বাঁ পাশে রয়েছে মৌসুমী ও পাতাবাহার ফুলের বাগান। বাগানের মাঝখানে অতিথিদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে; বড় কাপড়ের ছাতার নিচে রাখা রয়েছে চেয়ার-টেবিল। ঠিক পাশেই রয়েছে অতিথিদের খাওয়ার সুব্যবস্থা। দেওয়ালের গায়ে খোদাই করা গুণীজনদের নাম আজও যেন অতীতকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

১৯৪৯ সালে সুধীর চন্দ্র দাসের কাছ থেকে ১১ কাঠা জমি লিজ নিয়ে প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহা ও তাঁর ভাই নলিনী মোহন সাহা এই ঐতিহ্যবাহী বিউটি বোর্ডিং প্রতিষ্ঠা করেন। নলিনী মোহনের বড় মেয়ে ‘বিউটি’-র নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে দেশে ফিরে প্রহ্লাদ সাহার দুই ছেলে সমর সাহা ও তারক সাহা নতুন করে বোর্ডিংটির প্রাণ ফেরানোর উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে ইমরুল চৌধুরীর উদ্যোগে ‘বিউটি বোর্ডিং সুধী সংঘ’ গঠিত হয় এবং ১৯৯৮ সালে ৬০ সদস্যের একটি ট্রাস্টি বোর্ড প্রতিষ্ঠা পায়। ২০০০ সাল থেকে এই বোর্ডের মাধ্যমে বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিকদের সম্মাননা প্রদান শুরু হয়। বেলাল চৌধুরী, কবি আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, দেবদাস চক্রবর্তী, কবি সৈয়দ শামসুল হক ও সমরজিৎ রায় চৌধুরীর মতো প্রখ্যাত ব্যক্তিবর্গ এই সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

বর্তমানে বোর্ডিংটিতে মোট ৭ জন কর্মচারী নিয়োজিত আছেন, যার মধ্যে ৪ জন বাবুর্চি। দর্শনার্থী ও অতিথিদের জন্য সকাল ও রাতে হালকা নাস্তা এবং দুপুরে ঐতিহ্যবাহী ভারী খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। থাকার জন্য রয়েছে মোট ২৫টি ঘর (সিঙ্গেল ও ডাবল)। নির্দিষ্ট ভাড়ায় দর্শনার্থীরা এখানে রাত্রিযাপন করতে পারেন। ফ্যামিলি ডাবল বেড ১৪০০ টাকা এবং ব্যাচেলর ডাবল বেড ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। এছাড়া সিঙ্গেল বেডের ভাড়া নিচতলায় ৩০০ টাকা এবং ওপরের তলায় ৪০০ টাকা।

বর্তমানে বিউটি বোর্ডিং পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহার বংশধরেরা। মালিক সমর সাহা নিজেকে ‘মালিক’ না বলে বোর্ডিংয়ের ‘কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, "মুক্তিযুদ্ধের সময় বাবা শহীদ হন। আমার ভাইও আমাদের ছেড়ে পরপারে চলে গেছেন। মানুষ এখনো এখানে ঘুরতে আসে, কিন্তু আগের মতো সেই আড্ডা আর জমে না। চেষ্টা করছি বাবার তৈরি এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে, কিন্তু কতদিন পারব জানি না। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা দলবেঁধে আসে, গল্প করে।"

বিউটি বোর্ডিংয়ে ঘুরতে আসা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাকিল আহমেদ বলেন, "বইয়ের পাতায় আর বিভিন্ন প্রামাণ্যচিত্রে বিউটি বোর্ডিংয়ের অনেক গল্প পড়েছি। আজ প্রথবারের মতো সরাসরি এসে সেই ঐতিহাসিক স্থানের আবহ অনুভবের চেষ্টা করছি। স্থানটি সংরক্ষণ করা খুব জরুরি।"

মিরপুর থেকে পুরান ঢাকায় ঘুরতে আসা হাসিব বলেন, "আমার দাদুর মুখে বিউটি বোর্ডিংয়ের অনেক গল্প শুনেছি। তাই কৌতূহল থেকেই আজ এখানে ঘুরতে আসা। খুব ভালো লাগছে, পরে বন্ধুদেরও সাথে নিয়ে আসব। এখানে এসে আমাদের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অনেক অজানা বিষয় জানতে পারলাম।"

স্থানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন করে পুরান ঢাকার স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা সামসুল হক আফসোস প্রকাশ করে বলেন, "আমরা ছোটবেলা থেকেই বিউটি বোর্ডিংকে লেখক-শিল্পীদের আড্ডা দিয়ে গমগম করতে দেখেছি। এখনকার প্রজন্ম ডিজিটাল প্রযুক্তি নিয়ে ব্যস্ত, তাই এই ধরনের সাংস্কৃতিক আড্ডা হারিয়ে যাচ্ছে। বিউটি বোর্ডিং শুধু একটি ভবন নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির এক অমূল্য দলিল।"

আরও পড়ুন

×