ভিকারুননিসা
বুলিং, কোচিং বাণিজ্যের বিষয়ে আলোচনার দাবি, অধ্যক্ষের ‘না’
ছবি: সংগৃহীত
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৪:২৮
রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বসুন্ধরা শাখার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইবতিশাম রাফিফ ইসলাম আরিশার মৃত্যুর ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকদের আচরণ, শিক্ষার্থীদের বুলিং এবং কোচিং বাণিজ্যসহ কয়েকটি অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন অভিভাবক।
অভিভাবকদের দাবি, শিক্ষার্থীদের মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। একই সঙ্গে আরিশার মৃত্যুর পেছনে বিদ্যালয়ের পরিবেশ বা কোনো শিক্ষকের ভূমিকা ছিল কিনা, তাও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
গতকাল সোমবার ভিকারুননিসার বেইলি রোড ক্যাম্পাসের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কয়েকজন অভিভাবক এসব অভিযোগ জানান। পরে ক্যাম্পাসের বাইরে সাংবাদিকদের সামনে অভিযোগ ও দাবি তুলে ধরেন তারা। অভিভাবকদের মধ্যে ছিলেন এমএএম ইফতেখার মোমিন, আনোয়ার হোসেন হাওলাদার, মো. গোলাম কিবরিয়া ও আল আসমাউল হুসনা।
এমএএম ইফতেখার মোমিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা যখন আমাদের সন্তানদের স্কুলে দিয়ে আসি, তখন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে তাদের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা হচ্ছে, তা সবসময় জানতে পারি না। শিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বুলিংয়ের অভিযোগ সম্প্রতি সামনে আসছে। আবার শিক্ষার্থীদের নিজেদের মধ্যেও বুলিংয়ের ঘটনা রয়েছে। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রশাসন কী ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে, অধ্যক্ষের কাছে সে বিষয়েও জানতে চেয়েছি।’
আরিশার মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোনো শোকবার্তা বা আনুষ্ঠানিক শোক প্রকাশ না করার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন অভিভাবকরা। ইফতেখার মোমিন বলেন, ‘একটি বাচ্চা মারা গেল, অথচ তার জন্য একটি শোকবার্তা দেওয়া হলো না, এক মিনিট নীরবতা পালন করা হলো না। আমরা জানতে চেয়েছি, একটি শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠান হিসেবে যে দায়বদ্ধতা থাকার কথা, সেটি পালন করা হয়েছে কিনা?’
কোচিং নিয়ে ক্ষোভ
ভিকারুননিসায় কোচিং বাণিজ্য নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন অভিভাবকরা। তাদের অভিযোগ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্কুলের শিক্ষকের কাছে কোচিং না করার ফলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসিক চাপ, হয়রানি বা বুলিংয়ের পরিবেশ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন তারা।
ইফতেখার মোমিন বলেন, ‘আমরা কোচিং বাণিজ্য বন্ধ চাই। সরকার কোচিং বাণিজ্য বন্ধের যে উদ্যোগের কথা বলেছে, আমরা তার সঙ্গে একমত। কোচিং বাণিজ্য যত দিন বন্ধ না হবে, তত দিন বাচ্চাদের বুলিং ও হ্যারাসমেন্টও বন্ধ হবে না। একটি বাচ্চার প্রাণ গেছে, সেটার পেছনেও কোচিং বাণিজ্য জড়িত বলে আমরা মনে করছি।’
ধানমন্ডি শাখার তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থী ৪৭ দিন ধরে ক্লাসে যেতে পারছে না বলে দাবি করেন ইফতেখার মোমিন। ওই ঘটনাতেও কোচিং বাণিজ্যের বিষয় এসেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর কোচিংয়ের আর্থিক চাপের কথাও তুলে ধরেন এই অভিভাবক। তাঁর প্রশ্ন, স্কুলে পড়ার পরও যদি একই শিক্ষকের কাছে কোচিং করতে হয়, তাহলে স্কুলের প্রয়োজন কী?
হেড গার্ল নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ
ভিকারুননিসায় হেড গার্ল নির্বাচন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে অভিভাবকদের। তাদের দাবি, এ পদকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন পক্ষের তদবিরের সুযোগ তৈরি হয়। এমনকি বিভিন্ন সময়ে হেড গার্ল ও তার প্যানেলকে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ব্যবহার করার অভিযোগও রয়েছে বলে জানান তারা। অভিভাবকরা মনে করেন, শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব নির্বাচন ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অধ্যক্ষের সঙ্গে কী কথা হলো
অধ্যক্ষের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়ে ইফতেখার মোমিন বলেন, দেখা করতে গিয়ে তাদের প্রায় দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। পরে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা হলে তিনি বিষয়গুলো দেখছেন এবং সঠিক বিচার করবেন বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা তাকে বলেছি, যে বাচ্চাটি মারা গেল, তার বিষয়ে সঠিক তদন্ত করতে হবে। যে শিক্ষকের বিরুদ্ধে বুলিংয়ের অভিযোগ রয়েছে, তার বিরুদ্ধেও তদন্ত করতে হবে। তদন্ত নিরপেক্ষ না হলে পরবর্তী সময়ে অভিভাবকরা এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে।’
আলোচনার কথা অস্বীকার অধ্যক্ষের
জানতে চাইলে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম শিক্ষার্থীর মৃত্যু বা অভিযোগ নিয়ে অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনার কথা অস্বীকার করেন। মোবাইল ফোনে তিনি বলেন, ‘অভিভাবকদের সঙ্গে আমার এ ধরনের কোনো ইস্যু নিয়ে কথা হয়নি। তারা স্বাভাবিকভাবে এসেছিলেন। আমাদের সঙ্গে অভিভাবক হিসেবে কথা হয়েছে।’
বসুন্ধরা শাখার এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা এবং এর পেছনে কোনো শিক্ষকের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বসুন্ধরায় যে মেয়েটা আত্মহত্যা করেছিল, তার কোনো অভিযোগ ছিল না।
ঘটনাটি নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে তদন্ত করা হয়েছে জানিয়ে মাজেদা বেগম বলেন, ‘আমরা মনে করছি, মেয়েটার বিষয়ে কিছু করা উচিত। এ ব্যাপারে অনেক তদন্ত আছে, আমরাও তদন্ত করেছি।’