রাড্ডা সেন্টারে হামলা-ভাঙচুর
টিকার তথ্য ও ট্যাব হারানোয় সেবা কার্যক্রম ব্যাহত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:৩৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
হামলা-ভাঙচুরে লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়ার পাঁচ দিন পরও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি মিরপুর ১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের কার্যক্রম। চারপাশে ভাঙা দেয়াল ও কংক্রিটের স্তূপ, চলছে মেরামত ও সংস্কারকাজ। এর মধ্যেই গতকাল বুধবার আরও একটি কক্ষে সীমিত পরিসরে রোগীদের সেবা চালু করা হয়েছে। আগে থেকেই একটি কক্ষে টিকাদান কার্যক্রম চলছিল। নতুন করে চালু হওয়া কক্ষে মায়েদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
জানা যায়, গতকাল একদিকে ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ভবনটি ব্যবহার উপযোগী করার কাজ চলছিল, অন্যদিকে চালু রাখা হয় প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা। কেন্দ্রের বিভিন্ন অংশে শ্রমিকরা ভাঙা স্থাপনা মেরামত ও নতুন করে নির্মাণকাজ করেছেন। সামনের টিনের ছাউনির কাঠামো নতুন করে তৈরি করেছেন। ভেঙে যাওয়া বারান্দার দেয়ালে নতুন ইটের গাঁথুনি দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন কক্ষে বৈদ্যুতিক সংযোগ ও পাখা লাগানোর কাজও চলেছে। বেশ কিছু জানালায় নতুন লোহার গ্রিল বসানো হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত পানির সংযোগ চালু হয়নি।
রাড্ডার কর্মকর্তারা জানান, গতকাল সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত শিশু টিকাদান ও মায়েদের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চলে। পাশাপাশি যেসব সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার জন্য ব্যক্তিগত গোপনীয়তা প্রয়োজন হয় না, সেসব সেবাও সীমিত পরিসরে দেওয়া যাচ্ছে। গতকাল টিকাদানসহ ৭১ জনকে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়েছে। তবে অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের সেবা, প্রসব-পরবর্তী সেবা, কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা, প্রজনন স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও পুষ্টিসেবা পুরোপুরি চালু করতে আরও সময় লাগবে।
তারা জানান, টিকার তথ্য ও ট্যাব হারিয়ে যাওয়ায় সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। আগে টিকা নেওয়া শিশুদের তথ্য সংরক্ষিত থাকায় নির্ধারিত সময়ে অভিভাবকদের ফোন করে টিকার কথা মনে করিয়ে দেওয়া হতো। এখন সেই তথ্য না থাকায় অভিভাবকদের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করেই টিকা দিতে হচ্ছে। এ ছাড়া অন্তঃসত্ত্বা নারী ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয় তথ্য-নথি না থাকায় নিয়মিত যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছে না। যন্ত্রপাতি ও পরিবার পরিকল্পনার বিভিন্ন সামগ্রী না থাকায় প্রাথমিক সেবার বাইরে অন্য সেবাও দেওয়া যাচ্ছে না।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার বলেন, বৈদ্যুতিক সংযোগ পাওয়া গেলেও পানির সংযোগ মেলেনি। শৌচাগার সচল হতেও কিছুটা সময় লাগবে। গতকাল একটি কক্ষেই টিকা ও অন্যান্য সেবা দেওয়া হচ্ছিল। আজ পাশের আরেকটি কক্ষ চালু করা হয়েছে।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের
সহায়তায় কেন্দ্রের সংস্কারকাজ চলছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে কেন্দ্রটি ব্যবহার উপযোগী করার আশা করছেন তিনি।
রাড্ডা সেন্টারের সংস্কারকাজ তদারক করছেন শাহ আলী থানা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। মিরপুর এলাকায় ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি শিশুদের টিকাদান, শিশু স্বাস্থ্যসেবা, প্রজনন স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন সেবা দিয়ে আসছিল।
গত বৃহস্পতিবার রাতে এই সেন্টারে মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশি অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি আধা পাকা ভবনও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ভবনটি থেকে সব ধরনের আসবাব, ওষুধসামগ্রী, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফ্রিজ, এসি, আলমারি নিয়ে যায় হামলাকারীরা। এতে পুরো স্থাপনাটির কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। হামলাকারীরা ভাঙচুর-লুটপাটের পর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমিতি লি.’-এর সাইনবোর্ড টানিয়ে চলে যান।
এ ঘটনায় শাহ আলী থানায় ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য হানিফ মিয়াসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২০০-২৫০ জনকে আসামি করে মামলা করেন রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার। এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে এখন পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা কারাগারে রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে লুট হওয়া আসবাব, টিকা, নথিপত্র, ফ্রিজ, প্রিন্টার, জেনারেটরসহ বিভিন্ন ধরনের মালপত্র এবং দুটি কাভার্ডভ্যান উদ্ধার করা হয়েছে।
ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে শাহ আলী থানার ওসি মো. রাজীব সমকালকে বলেন, এ মামলায় নতুন কেউ গ্রেপ্তার নেই, তদন্ত চলছে।
এদিকে রাড্ডা সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। গতকাল সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে দুর্গাপূজা-সংক্রান্ত আইনশৃঙ্খলা সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এ ঘটনায় এক পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
- বিষয় :
- ভাঙচুর