ঢাকা শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

জাতীয় সংলাপে বক্তারা

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ঘরে ঘরে সৌরবিদ্যুতের তাগিদ

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ঘরে ঘরে সৌরবিদ্যুতের তাগিদ
×
×

জাতীয় সংলাপে বক্তারা। ছবি: সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ২২:৫৬ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ২২:৫৭

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এতে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর বাংলাদেশের অর্থনীতির চাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে আবাসিক ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করলে জ্বালানি আমদানির ব্যয় কমানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এ খাত সম্প্রসারণে সহজ শর্তে ঋণ, ব্যাটারি সংরক্ষণ, মানসম্মত সরঞ্জাম এবং দক্ষ জনবল নিশ্চিত করতে হবে। 

‘আবাসিক ছাদে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা: চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। আজ শনিবার রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ মিলনায়তনে এ সংলাপের আয়োজন করে নিউ এজ ও কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (ক্লিন)। 

অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, আবাসিক ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যয়বহুল জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি তরুণদের কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন খুব জটিল কাজ নয়। এ খাতে বিপুল কর্মসংস্থান হতে পারে। 

তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে সরকার-টু-সরকার জ্বালানি সরবরাহ চুক্তিতে ফোর্স মেজর ঘোষণা করতে হয়েছে। ফলে স্পট মার্কেট থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনতে হচ্ছে। এতে প্রতি ইউনিটের দাম ১০-১৩ ডলার থেকে বেড়ে ৩২ ডলারে উঠেছে। জ্বালানিতে ভর্তুকি বাবদ সরকারের ব্যয় হয়েছে ১৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন বাড়াতে সংশ্লিষ্ট ভবনের পৌরকর কমানোর বিষয়ও সরকার বিবেচনা করছে। 

মূল প্রবন্ধে ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, দেশের বিদ্যুৎ ব্যবহারের বড় অংশ আবাসিক খাতে। তাই ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে। এ খাত সম্প্রসারণে ২৫ হাজার কোটি টাকার ঘূর্ণায়মান তহবিল গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি। বর্তমানে এ খাতে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার তহবিল রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। 

তাঁর হিসাবে, এক লাখ বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা গেলে এক লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। প্রতি কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থায় বছরে জ্বালানি আমদানিতে প্রায় ২৯ হাজার ৬০০ থেকে ৩১ হাজার ৩০০ টাকা সাশ্রয় হতে পারে। পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমবে প্রায় ১ দশমিক ৪ টন। তিনি বলেন, দক্ষ কারিগরের অভাবে অনেক প্রতিষ্ঠানকে চীন ও ভারত থেকে কর্মী আনতে হয়। তরুণদের সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। 

নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন করে জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে। এ পরিস্থিতিতে কোন নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন, আর কোনটি এড়িয়ে চলা উচিত, সে বিষয়ে নীতিনির্ধারক, শিল্পোদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তথ্যভিত্তিক আলোচনা জরুরি। 

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আবাসিক সৌরবিদ্যুতের জন্য পৃথক কর্মসূচি নিতে হবে। এলাকাভিত্তিক ক্ষুদ্র বিদ্যুৎ গ্রিড গড়ে তুললে বিনিয়োগ বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হতে পারে। ভবন নির্মাণবিধি অনুযায়ী স্থাপিত সৌরপ্যানেলও নেট মিটারিংয়ের আওতায় আনার প্রস্তাব দেন তিনি।

ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) ভাইস প্রেসিডেন্ট ইমরুল হাসান জানান, আগামী ছয় মাসে আবাসিক ও শিল্পকারখানার ছাদে ৫০০ মেগাওয়াট করে মোট এক হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের লক্ষ্য রয়েছে। দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৫৬ শতাংশ আবাসিক খাতে। এ চাহিদা বছরে প্রায় ৮ শতাংশ বাড়ছে। ৫০০ মেগাওয়াট আবাসিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে বছরে প্রায় ৫৭ কোটি ৫০ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জ্বালানি আমদানিতে ১৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব।

অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্কট হ্যামিলটন বলেন, সৌরপ্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারির মান নিশ্চিত করতে হবে। নিম্নমানের সরঞ্জাম ও ত্রুটিপূর্ণ স্থাপন পুরো উদ্যোগকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। বিদ্যুৎ সরবরাহের ওঠানামা সামাল দিতে ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থাও জরুরি। 

ব্রাইট গ্রিন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান দীপাল চন্দ্র বড়ুয়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের নীতিমালা, প্রজ্ঞাপন ও নির্দেশনা একীভূত করে পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দেন। তিনি দেশের প্রায় ১০ হাজার ব্যাংক শাখার মাধ্যমে গ্রামীণ পরিবারগুলোকে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সেবায় ছয় মাস থেকে এক বছর ভ্যাট ও কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেন।

বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ সৌরবিদ্যুৎ খাতে কর সুবিধা অব্যাহত রাখা, সহজ অর্থায়ন এবং স্থিতিশীল নীতিমালা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

র‌্যানকন ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা সুবাইল বিন আলম বলেন, পুরোনো ভবন ও টিনের চালায় সৌরপ্যানেল স্থাপনের আগে কারিগরি মূল্যায়ন জরুরি। আমদানি করা পুরোনো প্যানেল নতুন নামে বিক্রির প্রবণতা ঠেকাতে মান নিয়ন্ত্রণও নিশ্চিত করতে হবে। 
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের জ্বালানি সমন্বয়ক নেওয়াজুল মওলা এবং এমিনেন্সের প্রধান নির্বাহী শামীম হায়দার তালুকদার।

আরও পড়ুন

×