কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনে আলোর ইশারা
ড. বিশ্বজিৎ সুর চৌধুরী
ড. বিশ্বজিৎ সুর চৌধুরী
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২০ | ০৭:০৪ | আপডেট: ১০ আগস্ট ২০২০ | ০৮:৫৭
গোটা বিশ্বের মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছে কবে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন বের হবে তার জন্য। দিন যত যাচ্ছে তথ্যউপাত্ত ততই বাড়ছে আর তাতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে বায়োমেডিক্যাল গবেষণা সঠিক পথেই এগুচ্ছে রেকর্ড পরিমাণ অল্পসময়ের মধ্যে মানুষকে সাহায্য করার জন্য।
জুলাই মাসের ১৪ তারিখে নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে গবেষকেরা এই ভ্যাকসিনের ব্যাপারে তথ্য প্রকাশ করেছে। এই ভ্যাকসিনের মুখ্য উপাদান হচ্ছে ছোট্ট একটা 'এমআরএনএ' যা থেকে প্রোটিন তৈরি হয়। যেটি দেহে কোন সংক্রমণ ঘটায় না। এই ‘এমআরএনএ’ মানুষের পেশীতে ইনজেকশন করা হলে তা দ্রুত দেহের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে করোনা ভাইরাসের প্রোটিন তৈরি করার জন্য। পরবর্তীতে তা দেহের মধ্যে করোনার অ্যান্টিবডি তৈরি করবে।
সাধারণত ৫-১০ বছর সময় লাগে কোন সংক্রমণজনিত রোগের ভ্যাকসিন তৈরি করতে। কিন্তু, করোনার মত বিশ্বজুড়ে মহামারী সৃষ্টি করা রোগের জন্য এতটা সময় কারো হাতে নেই। তাই, চীনে করোনার প্রাদূর্ভাব দেখা দেওয়ার পর যখন করোনার জিনম সিকুয়েন্সে বের হল, তারপর পরই বিজ্ঞানীরা করোনার স্পাইক প্রোটিনের ওপর দৃষ্টি আরোপ করে যা দিয়েই করোনা মানুষকে সংক্রমিত করে।
এই বিজ্ঞানীদেরই সার্স ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে যে নকশা আগে থেকেই তৈরি করা ছিল তাতে কিছু পরিমার্জন করা হয় যাতে করোনার স্পাইক প্রোটিনটা ঠিক মত কাজ করে। তারপর, মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই ল্যাবে ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়। এর পর ম্যাসাচুয়েস্টের মডার্না বায়োটেক কোম্পানির সাথে কাজ করা শুরু করে বিজ্ঞানীরা। মডার্নার ক্যান্সার ভ্যাকসিন তৈরির অভিজ্ঞতা আছে। মাত্র ৬৬ দিন লাগে জনুয়ারিতে করোনার জিনম সিকুয়েন্স বের হবার পর থেকে মানুষের দেহে প্রথম ট্রায়াল শুরু করা পর্যন্ত।
আমেরিকার ন্যাশনাল ইনিস্টিটিউট অব হেলথ এর সহযোগিতায় মানুষের দেহে প্রথম ট্রায়ালে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন এই ভ্যাকসিন (যার নাম এমআরএনএ-১২৭৩’) নিরাপদ এবং দেহ বেশ সহনশীল। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, যে সব স্বেচ্ছাসেবীরা এই ট্রায়ালে অংশ নিয়েছিল তাদের দেহে যথেষ্ঠ পরিমাণ অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে যা দেহে ভাইরাসের আক্রমণ থেকে দেহ কে রক্ষা করেছে। ট্রায়ালটি হয়েছে কাইসের পার্মানেন্টি ওয়াশিংটন হেলথ রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং এমরি ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিন, আটলান্টার যৌথ উদ্যোগে। সেখানে প্রতি স্বেচ্ছাসেবী ভ্যাকসিনের তিনটি ডোজের এক একটি এক মাস অন্তর অন্তর হাতের উপরের পেশীতে একবারে দুটো করে ইনজেকশন নিয়েছিল।
স্বেচ্ছাসেবীদের সারা বছর তাদের স্বাস্থ্য ও অ্যান্টিবডি উৎপাদনের বিষয়ে পর্যবেক্ষণ করা হবে। যদিও সম্প্রতি প্রকাশিত জার্নালের রিপোর্টে ৪৫ জন ১৮-৫৫ বছর বয়সী ব্যক্তির প্রথম ট্রায়াল এর দ্বিতীয় ইনজেকশন ডোজের পর প্রথম ৫৭ দিনের তথ্যের উপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। এই তথ্য থেকে যা জানা গেছে তা হচ্ছে:
১. নির্দিষ্ট মাত্রার ভ্যাকসিন কোন সেচ্ছাসেবীর দেহে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।
২. দেখা গেছে ১০০ মিলিগ্রাম হচ্ছে কাঙ্ক্ষিত মাত্রা যা যথেষ্ট পরিমানে অ্যান্টিবডি তৈরি করে মানুষের দেহে কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া না ঘটিয়ে।
৩. স্বেচ্ছাসেবীদের প্রায় অর্ধেক সংখ্যক যাদের কে উচ্চ মাত্রার ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছিল তাদের মধ্যে ক্লান্তিবোধ, মাথাব্যথা, ঠান্ডা ভাব, পেশীর ব্যাথা, বা যেখানে ভ্যাকসিন ইনজেকশন দেয়া হয়েছিল সেখানে ব্যাথা অনুভূত হয়েছিল। যার ফলে, এই উচ্চমাত্রার ভ্যাকসিন পরবর্তী ট্রায়ালে আর ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
৪. ১০০ মিলিগ্রাম মাত্রার দুটো ইনজেকশন খুবই শক্তিশালীভাবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়েছে, যা পরীক্ষা করা হয়েছে ২য় ইনজেকশনের ৪৩ দিন পর। প্রকৃতপক্ষে, এই অ্যান্টিবডি উৎপাদন ক্ষমতা যারা করোনা থেকে মুক্তি পাচ্ছে তাদের দেহের অ্যান্টিবডির চাইতেও বেশি।
এই উৎসাহব্যঞ্জক ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে ‘এম আর এন এ-১২৭৩’ ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ট্রায়াল শুরু হয়েছে। ট্রায়ালে ৬০০ জন সুস্থ মানুষকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যেখানে মানুষের সুস্থতা এবং অ্যান্টিবডি তৈরির সক্ষমতা নির্ধারণ করা হবে।
তৃতীয় ট্রায়াল ৩০,০০০ স্বেচ্ছাসেবীর ওপর। যেখানে করোনা প্রবলভাবে জেঁকে বসেছে সেসব এলাকার মানুষকে স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে নেওয়া হবে। এই ট্রায়ালের নাম দেওয়া হয়েছে ‘মাস্টার প্রটোকল‘ যা কিনা সরকারি এবং বেসরকারি মিলে প্রায় ২০ টা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি, একাডেমিক এক্সপার্ট, এবং অনেকগুলো ফেডারেল এজেন্সির সমন্বয়ে গঠিত। ‘অপারেশন রাপ স্পিড‘ নামে আমেরিকা সরকারের যৌথ উদ্যোগে এই ট্রায়াল কে সহযোগিতা করা হচ্ছে এবং এটাও নিশ্চিত করা হচ্ছে যে নিরাপদ এবং কার্যকরী ভ্যাকসিন প্রমাণিত হয়ে যাওয়া মাত্রই লক্ষ লক্ষ ভ্যাকসিন তৈরি করা হবে। এই প্রথম ফেজের ৩ টা ট্রায়াল কয়েক মাসের মধ্যেই শেষ হবে।
এখনো অনেক কাজ বাকি এবং যেকোন কিছুই ঘটতে পারে শেষটা ভাল মত শেষ না হওয়া পর্যন্ত। তারপরও গবেষকরা যথেষ্ট আস্থাশীল যে এই করোনা মহামারী থেকে তাদের ভ্যাকসিন সারা পৃথিবীর মানুষকে রক্ষা করবে। তাই, ভ্যাকসিন বাজারে না আসা পর্যন্ত সবাইকে সোশ্যাল ডিসটানসিং এবং স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলতেই হবে, সুদিন আসতে হয়ত আর বেশি দিন বাকি নেই।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান
চিত্র: ন্যাশনাল ইনিস্টিটিউট অব হেলথ, আমেরিকা

- বিষয় :
- করোনা ভ্যাকসিন