শ্রদ্ধাঞ্জলি
মাটির মানুষ ছিলেন ব্যাংকার সোলায়মান খান মজলিশ
সোলায়মান খান মজলিশ
মতিউল হাসান
প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬ | ২৩:৩৫
সোলায়মান খান মজলিশ গত ৩০ মার্চ ইন্তেকাল করেন। তিনি মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় সম্ভ্রান্ত মজলিশ পরিবারে ১৯৪৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী তিনি মজলিশ উপাধি গ্রহণ করেন। এই পরিবারের একটা অংশ সিরাজগঞ্জে বসতি স্থাপন করে এবং দেশ বিদেশে ছড়িয়ে পরে। তবে ঐতিহ্য অনুযায়ী খান মজলিশ উপাধি বংশ পরম্পরায় যুগের পর যুগ ধরে স্বমহিমায় উজ্জ্বল। এই পরিবারের ছেলে বা মেয়েরা ‘খান মজলিশ’ পদবি লাভ করেন। স্বাধীনতা পূর্ব বিশিষ্ট সংবাদ পাঠক দাউদ খান মজলিশ পরবর্তী নিকট সময়ে বাংলাদেশে স্বনামধন্য নাক-কান-গলার চিকিৎসক খান মজলিশ হিসেবে সমাদৃত হন। অনেক সংসদ সদস্য এই পরিবার থেকে এসেছেন। এই পরিবারের মহিলা ডিসি বিগত সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর বিশাল দুর্নীতির কার্যক্রমের প্রতিবাদী ভূমিকা পালনে প্রশংসিত হন। মানিকগঞ্জ শহরে খান মজলিশ টাওয়ার মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে।
সোলায়মান খান মজলিশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৪ সালে ইতিহাস বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ১৯৬৬ সালে তৎকালীন ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকে যোগদান করেন, যা স্বাধীনতা পরবর্তীতে জনতা ব্যাংক নাম ধারণ করে। বেসরকারি ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংকে চাকুরি শুরু করেন ১৯৮৪ সালে এবং ডিএমডি হন। ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠাকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যমুনা ব্যাংকে যুক্ত হন। পরবর্তীতে বিশ্বব্যাংক এবং সোনালী ব্যাংকের রিফর্ম কমিটির এডভাইজার হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। এরপর ২০০৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত কটন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ২০১৭ সাল থেকে ২০২৫ সালের শুরু পর্যন্ত গ্রুপের এডভাইজার হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।
করোনাকালে উনার পরিবারের সাথে আমার পরিবারের বৈবাহিক আলোচনা চলছিল। একটি হোটেলে আমরা দেখা করি বিশেষ ব্যবস্থায়। ড্রাইভার না থাকায় সত্তোরঊর্ধ্ব এই ভদ্রলোক নিজেই গাড়ি চালিয়ে আসেন। প্রথম দেখাতে উনার ব্যাক্তিত্ব, জ্ঞানের গভীরতা ও সৌজন্যবোধ আমাদের পুরো পরিবারকে বিমোহিত করে। সম্পর্ক স্থাপন সময়কালে আমাদের ব্যাংকের একজন পরিচালক ব্যাপারটি জানতে পারেন এবং আমাকে বলেন খান মজলিশ সাহেব মাটির মানুষ। আমি যে ব্যাংকে প্রবেশনারি অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করি সে ব্যাংকের উচ্চস্থরের কর্মকর্তা ছিলেন উনার অনেক বন্ধু। পরবর্তীতে তাদের মধ্য থেকে ঐ ব্যাংক সহ অন্যান্য কয়েকটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হন। তাই প্রথম প্রথম উনাকে স্যার বলে সম্বোধন করতাম। পরে উনার আপত্তিতে ভাইসাহেব ডাকতাম। আকবর আলী খান সাহেবের লেখা বইতে ব্যাংকার হিসেবে উনার নামের উল্লেখ ছিল। আকবর আলী খান প্রায়শই উনার থেকে ব্যাংকিং বিষয়ক পরামর্শ নিতেন।
উনি ব্যাংকিং জীবনের অভিজ্ঞতার কথা বলতেন। আমি মনোমুগ্ধ হয়ে শুনতাম। স্বাধীনতার পর ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের জয়দেবপুরের একটি শাখায় পোস্টিং হয়। তিনি ব্যাচেলর বাসায় একাই থাকতেন। ব্রাঞ্চের সিকিউরিটি গার্ড ছিল পাঠান। একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টির রাতে পাঠান সাইকেল চালিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে উনার রুটি নিয়ে আসে এবং বলে এই বৃষ্টির রাতে তুমি না খেয়ে ঘুমাবে এটা ভেবে তোমার জন্য খাবার নিয়ে আসলাম। পাঠান একদিন তার নিজ বাড়ি পশ্চিম পাকিস্তানে যাওয়ার জন্য ছুটি চাইলে ম্যানেজার নামঞ্জুর করেন। শুনে সোলায়মান খান তার ছুটির ব্যবস্থা করে দেন।
স্বাধীনতার পর জনতা ব্যাংকে তিনি ক্রেডিট ডিপার্টমেন্টে কাজ করতেন। পরবর্তীতে স্মৃতিচারণ করতেন একটি ক্রেডিট প্রপোজাল পাশ করানোর জন্য কতো কসরত করতে হতো! এজিএম সাহেব নিজে জিএম সাহেবের কাছে গিয়ে যতক্ষণ লোন খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকত ততক্ষণ ইতিবাচক সাড়া পেতেন না। এজন্য আশির দশকে ঋণ খেলাপি শব্দটা ব্যাংকারদের কাছে এতোটা পরিচিত ছিল না। ৯০ দশকের পর থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে মহামারি হিসেবে দেখা দেয় খেলাপি ঋণ। ন্যাশনাল ব্যাংকে ডিএমডি হিসেবে কাজ করার সময় প্রায়ই চাপ আসত উপর মহল থেকে। তবে তিনি কোন চাপের মুখে মাথানত করতেন না। একবার এক প্রভাবশালী পরিচালক চাপ তৈরি করে সফল না হয়ে কাউকে বলেন, উনাকে বেশি ঘাটিও না, এমনও হতে পারে সে চাকরিই ছেড়ে দিবে।
যমুনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে থাকাকালে অন্যান্য ব্যাংকের এমডি বন্ধুমহল থেকে অনুরোধ আসত তাদের করা লোকাল এলসির বিপরীতে বিল ডিসকাউন্ট করে টাকা দেওয়ার জন্য। কিন্তু তিনি করতেন না। উনি আমাকে বলেন যে পরিমাণ এলসি ভ্যালু দেখা যায় তার মাল আদান প্রদান যদি সত্যিই হতো তাহলে ট্রাকের জ্যামে ঢাকা অচল হয়ে যেতো। এই ধরণের অনৈতিক ব্যাংকিং রুখতে পেরেছিলেন বলেই আশির দশকে বেসরকারী ব্যাংকগুলো মাথা উঁচু করে সম্মানের সাথে তাদের কার্যক্রম চালু রাখতে পেরেছিল।
বনানী কবরস্থানে যাওয়া হয় না নানা কারণে। মধ্যবিত্তদের কবর কেনার রেওয়াজ এবং কবর দেওয়ার সক্ষমতা কম থাকা এর মধ্যে অন্যতম। তবুও উনার দাফনে গিয়ে দেখলাম বেশ পরিপাটি ও সুশৃঙ্খলভাবে কবরের সারি ও বিখ্যাত সব লোকজনের নামফলক। চোখে পড়লো গাজী শামসুর রহমানের নাম যিনি আশির দশকে বিটিভিতে সহজে আইন শেখানোর একটা অনুষ্ঠান করতেন, যাতে বাদী-বিবাদী খবির ও দবিরের নাম উল্লেখ করে সহজ ভাষায় আইন বুঝাতেন। একটা কবরে লেখা দেখলাম ‘কে যাও মুসলিম ভাই, মোর কবরের পাশে ক্ষণিক দাঁড়াও, আমার সালাম নাও’। বিশেষ করে বাংলাদেশের সাবেক অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের স্ত্রী জোহরা তাজউদ্দিনের কবরে জসিমউদ্দীনের ১৯৪২ সালে লেখা কবিতার একটি পংক্তি আছে ছোট লিলিকে লেখা। লিলি উনার ডাকনাম।
শ্রদ্ধা জানাই একজন সৎ নৈতিকতার গুণে গুণান্বিত একজন সাহসী ব্যাংকারকে।
মতিউল হাসান: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি
- বিষয় :
- শ্রদ্ধাঞ্জলি
