ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পর্ব-১

যুদ্ধবন্দী শৈশব

যুদ্ধবন্দী শৈশব
×

সুরাইয়া পারভীন

সুরাইয়া পারভীন

প্রকাশ: ১২ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১০:০০ | আপডেট: ১২ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১০:০৬

ভূমিকা:

চোখ বুঝলেই আজো আমি আমার শৈশবকে দেখতে পাই। পশ্চিম পাকিস্তানে বন্দী শৈশব। পশ্চিম পাকিস্তানের 'কোরঙ্গী  ক্রীক'  অথবা 'বোলান্দ হীল'- এর ক্যাম্পে বন্দী শৈশব৷ শিনু বা লিপির সঙ্গে স্কুলের চার পাশে ফল্লী গাছের নিচে ঘুরে বেড়ানোর শৈশব৷ চোখের সামনে এখনও দেখতে পাই। গাছের নিচে ঝরা পাকা ফল্লী তুলে নিচ্ছি, চিবাচ্ছি, রস টুকু খেয়ে ছোবা ফেলে দিচ্ছি। কেবলই মনে হয়- যদি আবারও যেতে পারতাম সেই ফল্লীগাছ তলায়। কাঁটাযুক্ত সেই ফল্লীগাছ। যেখানে সবুজ-হলুদ ফল্লী ঝুলছে গাছে গাছে! আবারও ফল্লী কুড়াতাম। ফল্লী কুড়ানোর স্মৃতি আমাকে নিয়ে যায় ঘটনাবহুল শৈশবে-

১৯৭১ সাল: মুক্তিযুদ্ধ

১৯৭১ সাল। দেশে মুক্তিযুদ্ধ চলছে। স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ। আমার বাবা ফ্লাইট সার্জেন্ট আলহাজ মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ (তখন সার্জেন্ট ছিলেন) পাকিস্তান এয়ারফোর্সে কর্মরত, তার কর্মস্থল সৌদি আরব। প্রশিক্ষক হিসেবে ১৯৬৮ সালে তাকে সৌদি আরবে পাঠানো হয় তিন বছরের জন্য। পরবর্তী সময়ে তার কাজের মেয়াদ ৩ মাস বাড়ানো হয়।

মুক্তিযুদ্ধ তখন শুরু হয়ে গেছে। আমার মা এবং আমরা চার ভাইবোন সৌদি আরবে বাবার সঙ্গে অবস্থান করছিলাম। আমি এবং আমার ভাইবোনেরা তখন অনেক ছোট। যুদ্ধ কী জিনিস বুঝতে পারি না। সৌদি আরবে যত বাঙালি- সবার মাঝে চাপা উত্তেজনা, অস্থিরতা। সবার মুখ চিন্তিত, গম্ভীর। আমি স্পষ্ট করে কিছু বুঝতে না পারলেও ভয়ানক কিছু একটা যে ঘটছে দেশে, তা আঁচ করতে পারি।

কিছুদিনের মধ্যেই জানতে পারি- আমাদের আর সৌদি আরবে থাকা চলবে না। পশ্চিম পাকিস্তান সরকার ডিফেন্সের যত বাঙালিকে বিভিন্ন দেশে পাঠিয়েছিল তাদের আবার পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এ নির্দেশ পাওয়ার পর লিভিং ইন (ব্যাচেলর) যারা- দু'এক জন সৌদী আরব থেকে পালিয়ে সরাসরি দেশে চলে আসতে সক্ষম হন। কেউ কেউ ধরা পড়েন এবং তাদের পশ্চিম পাকিস্তানিদের অত্যাচারের মুখে পড়তে হয়। কেউ কেউ লন্ডনে পালিয়ে গিয়ে সেখান থেকে দেশে ফেরা যায় কি-না সেই ভাবনা-চিন্তাও শুরু করেন। আমার বাবাও ভীষণ চিন্তায় পড়েন- কী করা উচিৎ? আমার বাবা তখন আমার নানার পরামর্শ চেয়ে ইঙ্গিত পূর্ণ চিঠি লেখেন। আমার নানা বিচক্ষণ লোক, ইঙ্গিত বুঝতে সমস্যা হলো না তার। তিনিও ইঙ্গিতে আমার বাবাকে পালিয়ে দেশে ফিরতে নিষেধ করেন। কারণ গ্রামে গ্রামে তখন মিলিটারি ঢুকে গেছে। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে। মেয়ে-বউদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। অনেক চিন্তা-ভাবনার পর পরিবারসহ যত বাঙালি সেখানে ছিল সবাই তখন পশ্চিম পাকিস্তানেই ফেরার সিদ্ধান্ত নেয়।

মে কিংবা জুন (১৯৭১ সাল) মাস হবে। পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি এয়ারপোর্টে দুরু দুরু বক্ষে নামলাম আমরা। আমার মা আগেই এয়ারপোর্টে নেমে আমাদের ভাইবোনেদের কথা বলতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন, যাতে এয়ারপোর্টে থাকা পাকিস্তানিরা বুঝতে না পারে আমরা বাঙালি। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে আব্বা খুঁজে নিলেন দীন ইসলাম কাকাকে। আব্বার কাজিন তিনি। উনিও এয়ারফোর্সে ছিলেন। আমাদের জন্য একটা থাকার ব্যবস্থা করে রাখতে আব্বা তাকে বলে রেখেছিলেন। দিনু কাকা (উনাকে আমরা দিনু কাকা বলেই ডাকতাম) তখনও ব্যাচেলর। তিনি তার পরিচিত, যতদূর মনে পড়ে রুহুল আমিন নামে একজনের সঙ্গে কথা বলেন, যার বাড়ি আমাদের কিশোরগঞ্জের ভৈরবে। তিনি (রুহুল আমিন) নিজের ছোট্ট বাসার এক রুম ছেড়ে দেন, আমাদের জন্য। কথা ছিল- আপাতত সেখানে উঠবো এবং পরে নিজেরা বাসা খুঁজে নেব। সেখানে ওঠার পর তাদের সঙ্গে সম্পর্ক এতো ভালো হলো যে, কোয়ার্টার পাওয়ার আগ পর্যন্ত অনিশ্চিত কোথাও আমাদের আর যেতে দিলেন না তারা। তাদের ওই বাসাতেই তিনমাস ছিলাম আমরা।

পশ্চিম পাকিস্তানে পৌঁছানোর পরদিনই আব্বা অফিসে গেলে তার জয়েনিং হয়ে যায়, পোস্টিং হয় আমাদের চারভাইবোনের জন্মস্থান কোরঙ্গী ক্রীক ক্যাম্পে। তিন মাস পর আব্বার নামে কোরঙ্গী ক্রীক ক্যাম্পে কোয়ার্টার বরাদ্দ দেওয়া হয়।

১৯৭১ সালের খুব সম্ভবত সেপ্টেম্বর মাসের দিকে কোরঙ্গী ক্রীক ক্যাম্পের ডাবল রুমের দোতলার একটা ফ্ল্যাট পেলেন আব্বা। আমরা উঠলাম সেখানে। শুরু হলো বন্দীজীবন। আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে এবং আমাদের নিচের ফ্ল্যাটে ছিল বাঙালি পরিবার। ক্যাম্পে একটি হাসপাতাল ছিল। একটি স্কুলও ছিল যেখানে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান হতো। সৌদি আরবে থাকতেই আম্মা অ, আ শিখিয়েছিলেন। এখানে এসে আব্বা আমাকে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি না করে সরাসরি দ্বিতীয় শ্রেণিতে আর আমার দুই ভাইকে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি করে দেন। ক্যাম্পের বাংলা স্কুলটি তখন স্কুলের প্রাইমারি বিল্ডিংয়ে বাংলাভাষীদের জন্য এবং হাইস্কুলের ধপধপে  সাদা বিল্ডিংয়ে উর্দুভাষীদের ক্লাস হতো। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পের বাইরে করাচি শহরে বাংলা স্কুলে গিয়ে পড়তে হতো, যদিও সে সময় তা বন্ধ ছিল।

স্কুলের দুই বিল্ডিংয়ের মাঝে ছোট্ট একটি মাঠ হলেও তা ছিল দুই দেশের সীমান্ত রেখার মতো অদৃশ্য কাঁটাতারের বেড়াসম, সে সীমানা পার করার অধিকার বাঙলি শিক্ষার্থীদের ছিল না। পাকিস্তানি ছাত্র-ছাত্রীদের আমরা যমের মত ভয় পেতাম, কাছে যেতাম না। তারা ভীষণ রুঢ় আচরণ করতো। স্কুলের মতো পুরো ক্যাম্প জুড়েই বাঙালিদের বিচরণ ছিল নির্দিষ্ট করা।

সামনেই ছিল রোজার ঈদ। সবাই বুঝতে পারছিলাম- ঈদের ছুটির পর স্কুলটি আর খুলবে না। কারণ অন্য অনেক ক্যাম্পের স্কুল ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ব্যাপারটি বুঝতে পেরে শেষ দিনে পিকনিকের আয়োজন করলেন শিক্ষকরা। আনন্দের পর 'চির বিদায়ের' কান্না ছাত্র-শিক্ষকের। এরপর আর কখনও কারো সঙ্গে দেখা হবে কিনা, বেঁচেই থাকবে কিনা, কোনো নিশ্চয়তা তো ছিল না। আমার বাবা একজন শিক্ষককে প্রাইভেট শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করলেন বাসায় এসে পড়াবেন বলে। কিছুদিন পর স্যার আর আসেন না। আমরা বাবা তখন বলেন- নিশ্চয়ই তোমরা স্যারের কথা শোনোনি, বেয়াদবি করেছো, তাই তিনি আসা বন্ধ করেছেন। এরপর আব্বা স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারেন- তাদের ওপর হুকুম জারি হয়েছে, কোনো বাঙালির বাসায় গিয়ে পড়ানো যাবে না।  কিছুদিন পর শিক্ষকদের ক্যাম্প থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

[ চলবে ]

আরও পড়ুন

×