জেনে রাখুন
ডেঙ্গু: কিছু বিষয় জানতে হবে
ডা. নাসির উদ্দিন আহমদ
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে। প্রতিদিন ডেঙ্গুতে মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডেঙ্গু রোগী মামুলি জ্বর থেকে অল্পতেই সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে শতকরা পাঁচ ভাগ রোগীর তৈরি হতে পারে গুরুতর জটিলতা।
জটিলতা কাদের বেশি
সাধারণত শিশু, বৃদ্ধ, স্থূলকায় ব্যক্তি ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জটিলতা বেশি হতে পারে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, জন্মগত হৃদরোগ, কিডনি ফেইলর, লিভার সিরোসিস ও পেপটিক আলসারের রোগীদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এ ছাড়া যে সমস্ত নারীর মাসিকের সময় অধিক রক্তক্ষরণ ঘটে, যারা স্টেরয়েড অথবা ব্যথানাশক ওষুধ গ্রহণ করছেন তারাও অধিক ঝুঁকিগ্রস্ত।
বিলম্বে চিকিৎসায় বিপদ
ডেঙ্গু চিকিৎসায় বিলম্ব হলে বিপদ। ডেঙ্গুতে যখন জ্বর চলে যায় তখন অনেকেই মনে করে এই বুঝি বিপদ কেটে গেল। আসলে বিপদের সূত্রপাত তখন থেকে। এ পর্যায়ে অনেকের রক্তনালি থেকে রক্তরস বের হয়ে আসে। রক্তচাপ কমে যায়, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে এবং রোগী নেতিয়ে পড়ে। প্রস্রাব কমে যায়–এ অবস্থাকে বলে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। এ সময় অনেকের ফুসফুসে ও পেটে পানি চলে আসে।
দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু ভয়ানক
যারা আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন তাদের তীব্র ডেঙ্গু হওয়ার আশঙ্কা ১৫ গুণ বেড়ে যায়। দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু দ্বারা আক্রান্ত হলে শরীরে প্রবিষ্ট ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনা তথা ইমিউনতন্ত্রের যুদ্ধংদেহি আচরণের কারণে মানবশরীরে শুরু হয় বিষম বিপর্যয়। রক্তনালির দেয়াল ছিদ্রযুক্ত হয়ে পড়ে। কখনও সখনও এ সমস্ত রক্তনালির মাঝে রক্ত জমাট বেঁধে যায় এবং অনেক অঙ্গ হয়ে পড়ে বিকল।
রক্তক্ষরণ
ভাইরাসের আক্রমণে প্লাটিলেট কমে যায়, রক্তনালিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়। ফলে শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে শুরু হতে পারে রক্তক্ষরণ। রক্তক্ষরণ কখনও হতে পারে মৃদু মাত্রার, কখনও হতে পারে তীব্রমাত্রার। রক্তপাত হতে পারে বিভিন্ন পথে। দাঁতের গোড়া ও নাক থেকে হতে পারে মৃদু মাত্রার রক্তক্ষরণ। বমি কিংবা পায়খানার সঙ্গে হতে পারে রক্তপাত। নারীদের ঋতুস্রাবের রক্তপ্রবাহ বেড়ে যায়, এমনকি প্রস্রাবের পথেও আসতে পারে রক্ত। মস্তিষ্কেও শুরু হতে পারে রক্তপাত।
অন্যান্য অঙ্গে আক্রমণ
এ সময় লিভার আক্রান্ত হতে পারে। ফলে লিভার বড় হয়ে যায় এবং এনজাইম বেড়ে যায় বহু গুণ। পিত্তাশয় আক্রান্ত হয় প্রায়ই এবং প্রদাহ হয় অঙ্গটিতে। এই ভাইরাসে মস্তিষ্ক আক্রান্ত হলে রোগী অজ্ঞান পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। শুরু হতে পারে খিঁচুনি, হৃদস্পন্দন হতে পারে এলোমেলো। হৃৎপিণ্ডের পেশিকোষ আক্রান্ত হয়ে হতে পারে কার্ডিওমায়োপ্যাথি। কিডনি, ফুসফুস, অগ্ন্যাশয়–সব অঙ্গ হতে পারে বিকল। এটিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় বলে মাল্টি অর্গান ফেইলর।
করণীয়
জ্বর হলে অবহেলা না করে প্রথমেই জানা দরকার ডেঙ্গু কিনা। ডেঙ্গু হলে নিয়মিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থেকে জটিলতা নির্ণয় এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। বিপদচিহ্ন দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। ডেঙ্গু চিকিৎসায় দেরি করলে বিপদ হতে পারে। ডেঙ্গু প্রতিরোধের দিকে সবচেয়ে বেশি নজর দিতে হবে। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে এবং মশা যাতে কামড়াতে না পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে।
[লেখক: বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ]
- বিষয় :
- ডেঙ্গু