স্মরণ
চট্টলবীর মহিউদ্দিন
মোহাম্মদ বেলাল হোসেন
প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০২১ | ১২:০০
এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রামের 'মেথর'দের নাম পাল্টিয়ে নতুন নাম দেন 'সেবক'। ইউনিফর্ম হিসেবে তাদের দেন হলুদ রঙের পোশাক; এতে লেখা হয় 'সেবক' শব্দটি। তাদের বসবাসের জায়গাটির নাম পরিবর্তন করে রাখেন 'সেবক কলোনি'। সেবকদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা, চিকিৎসা ও বিনোদনের ব্যবস্থা করেন। সমাজে মানুষ হিসেবে তাদের বসবাসের সুযোগ করে দেন। এভাবে মানবিক কর্ম দিয়ে জনমানুষের অতল শ্রদ্ধায় সিক্ত হয়েছিলেন চট্টলবীর মহিউদ্দিন চৌধুরী।
সমাজে চলমান গা-ভাসিয়ে দেওয়া রাজনীতির যুগে সবার টার্গেট থাকে দলের পদ দখল। পদ দখল করে দলনেতা হওয়া যায়, কিন্তু জননেতা হওয়া যায় না। জননেতার প্রধান গুণ মানবিক হওয়া, মানবতার জন্য কাজ করা। মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মানুষ আজও সংকট-সংগ্রামে স্মরণ করে, অনুসরণ করে। তারা শোষকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন; গেয়েছেন মানবতার জয়গান। মহিউদ্দিন চৌধুরী সেই অর্থে ছিলেন একজন পরিপূর্ণ মানবিক মানুষ। তার কৃতকর্মের মধ্যে চতুরতা ছিল না, অহমিকা ছিল না। ছিল অদম্য সাহস, কর্মস্পৃহা ও দেশপ্রেম।
মহিউদ্দিন চৌধুরীর পুরো নাম আবুল বশর মোহাম্মদ মহিউদ্দিন চৌধুরী। ১৯৪৪ সালের ১ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা রেলওয়েতে কর্মরত থাকায় মহিউদ্দিন চৌধুরীর শৈশব কাটে চট্টগ্রাম শহরে। মহিউদ্দিন চৌধুরী যখন সরকারি সিটি কলেজের ছাত্র, তখনই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ তার মনে দাগ কাটে। ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে নেতৃত্ব দেন মহানগর ছাত্রলীগের। ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেন সক্রিয়ভাবে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন মহিউদ্দিন চৌধুরী। নেভাল বেস টর্চার ক্যাম্পে ধারাবাহিক নির্যাতনের এক পর্যায়ে পাগলের অভিনয় করে কারাগার থেকে বের হয়ে চলে যান ভারতে। হরিনা ইয়ুথ ক্যাম্পে পৌঁছে দেখেন, তার নামেই সেখানে করা হয়েছে 'শহীদ মহিউদ্দিন ব্যারাক'। সহকর্মীরা মনে করেছিল, তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন পাকিস্তানি সেনাদের হাতে। ভারতের উত্তর প্রদেশের তান্দুয়া কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ শেষে 'মাউন্ট ব্যাটালিয়ন'-এর প্লাটুন কমান্ডার নিযুক্ত হন মহিউদ্দিন। পরে বিএলএফের মিডল ও সাউথ কলামের কমান্ডার নিযুক্ত হন তিনি। পার্বত্য এলাকায় তিনশ মুক্তিযোদ্ধার দলনেতা হিসেবে সম্মুখ সমরে নেতৃত্ব দেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। ১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর সহযোদ্ধাদের নিয়ে বিজয়ীর বেশে তিনি চট্টগ্রামে ফিরে আসেন।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে ১৯৯৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত একটানা ১৭ বছর দায়িত্ব পালন করেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করেছেন তিনি। আপন হাতে ঢেলে সাজিয়েছেন নগরের অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে। নতুন আয়বর্ধক প্রকল্প হাতে নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে একটি স্বাবলম্বী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে গড়ে তোলেন মাতৃসদন হাসপাতাল ও আরবান হেলথ ক্লিনিক। পৌর চেয়ারম্যান নুর আহমদ চট্টগ্রাম শহরে শিক্ষাব্যবস্থার যে অগ্রগতির সূচনা করেন, তাতে নতুন গতি সঞ্চার করেছেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা আয়োজনের মধ্য দিয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনাসমৃদ্ধ জনমানুষের প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন।
সমাজ ও রাজনীতিতে সবাই নেতা বা নায়কের স্থান করে নিতে পারেন না। ইতিহাসে নায়ক হওয়ার মতো মানুষ সব কালে, সব যুগে সৃষ্টি হয় না। ইতিহাস আপন তাগিদে নায়কের উদ্ভব ঘটায়। চট্টলবীর এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী তেমনি এক অবিসংবাদিত নেতা, যার সৃষ্টি ইতিহাসের প্রয়োজনে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতির মুক্তির সংগ্রাম এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের একনিষ্ঠ কর্মী মহিউদ্দিন চৌধুরী। আজ থেকে হাজার বছর পরে যখন চট্টগ্রামের উন্নতি ও সমৃদ্ধির ইতিহাস লেখা হবে, তখন লেখক ও গবেষকদের ফুটনোটে বারবার ফিরে আসবে মানবিক মানুষ চট্টলবীর মহিউদ্দিন নামটি।
মোহাম্মদ বেলাল হোসেন : উপসচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক
শিক্ষা বোর্ড, চট্টগ্রাম
[email protected]
- বিষয় :
- স্মরণ
- মোহাম্মদ বেলাল হোসেন