ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬

লাখো বই বাক্সবন্দি, সুনসান পাবলিক লাইব্রেরি

লাখো বই বাক্সবন্দি, সুনসান পাবলিক লাইব্রেরি
×

রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন ভবনে সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারের অস্থায়ী পাঠকক্ষ। পাঠক নেই, একেবারে সুনসান। সম্প্রতি তোলা- সমকাল

 দ্রোহী তারা

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:৩৪ | আপডেট: ০১ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:৩৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

আশ্বিনের পড়ন্ত বিকেল। রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি) ভবনে সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারের (পাবলিক লাইব্রেরি) অস্থায়ী পাঠকক্ষে ঢুকতেই চোখে পড়ে সারি সারি চেয়ার-টেবিল। একটি টেবিলে দুজন বই পড়ছেন। আরেকজন বই থেকে তথ্য তুলে নিচ্ছেন খাতায়। আর কোনো পাঠক নেই।

একসময় শাহবাগে এই গণগ্রন্থাগারে প্রতিদিন ৮০০ থেকে ৯০০ পাঠক  আসতেন। এখন অস্থায়ী ঠিকানায় সেই সংখ্যা নেমে এসেছে একশরও নিচে। অস্থায়ী পাঠকক্ষে রাখা হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার বই। প্রায় দুই লাখ ৬৪ হাজার বই রয়েছে বাক্সবন্দি। 

নতুন ভবন নির্মাণের জন্য ২০২১ সালে শাহবাগের পুরোনো ভবন থেকে বইপত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। তখন ২০২৫ সালের মধ্যে নতুন ভবনে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। এখন প্রকল্প শেষ করার নতুন লক্ষ্য ধরা হয়েছে ২০২৮ সালের জুন।

বই আছে, পাঠকের নাগালের বাইরে
গত বুধবার বিকেলে অস্থায়ী পাঠাগারের ১৩ তলায় বই পড়ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী নাজমুল হাসান। থাকেন শহীদুল্লাহ্ হলে। প্রায়ই এখানে আসেন। তিনি বলেন, বই কম, জায়গাও অপ্রতুল। একটি জাতীয় গ্রন্থাগারে যে ধরনের পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা, এখন তার অনেকটাই নেই। এতে পাঠকের আগ্রহ কমে গেছে। অধিকাংশ সময় চেয়ারগুলো ফাঁকাই থাকে।

শাহবাগের পুরোনো ভবনের সামনের লাল সিঁড়িতে একসময় শিক্ষার্থী ও পাঠকদের আড্ডা জমত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৫-০৬ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী জোবায়দুর রহমানের স্মৃতিতেও রয়ে গেছে সেই দিনগুলো। শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় জাতীয় গণগ্রন্থাগারে অনেক সময় কাটিয়েছেন। এখন শাহবাগ দিয়ে যাওয়ার সময় নির্মাণাধীন ভবন দেখলে সেই স্মৃতি মনে পড়ে।

বাক্সে বন্দি প্রায় আড়াই লাখ বই
অস্থায়ী গ্রন্থাগারের এক পাশে রাখা বইয়ের বাক্সগুলো দেখলেই বোঝা যায়, শুধু পাঠকের জায়গাই সংকুচিত হয়নি; বইয়েরও হয়েছে। স্থান সংকুলানের কারণে প্রায় আড়াই লাখ বই বাক্সবন্দি করে রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিন এভাবে পড়ে থাকায় বইয়ের কাগজ, বাঁধাই ও মুদ্রণ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দুর্লভ বই ও গুরুত্বপূর্ণ নথির ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি।

তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রোকনুজ্জামান বলেন, শুধু বাক্সে রেখে দিলেই বই সংরক্ষণের ঝুঁকি এড়ানো যায় না। বইয়ের ধরন ও অন্যান্য অবস্থার ওপর সংরক্ষণ পদ্ধতি নির্ভর করে। দুর্বল কাগজ বা বাঁধাইয়ের বই দীর্ঘদিন বাক্সবন্দি থাকলে ক্ষতির আশঙ্কা বেশি।

তাঁর মতে, বাক্সে থাকা বই নির্দিষ্ট সময় পরপর পরীক্ষা করা দরকার। আর্দ্রতায় বই স্যাঁতসেঁতে হয়ে যেতে পারে। তাই ধুলা পরিষ্কার করা, প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রয়োগসহ নিয়মিত পরিচর্যা জরুরি।

গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মনীষ চাকমা বলেন, স্থানান্তরের কারণে কিছু বই নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তবে কত সংখ্যক বই ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে, এখনই বলা সম্ভব নয়। বইগুলো সুরক্ষিত রাখতে যথাসাধ্য চেষ্টা করা হচ্ছে।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মূল্যবান বই ও নথি সুরক্ষায় কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিছু বই স্ক্যান করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের সহায়তায় দুর্লভ কিছু বই সংরক্ষণের চেষ্টাও চলছে। তবে ঝুঁকিতে থাকা বইয়ের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

একসময় ৮০০ পাঠক, এখন ১০০-এর নিচে
শাহবাগের পুরোনো ভবনে প্রতিদিন ৮০০ থেকে ৯০০ পাঠক এলেও অস্থায়ী ঠিকানায় সেই সংখ্যা একশর নিচে। বসার জায়গা কমে যাওয়া, বইয়ের বড় অংশ বাক্সবন্দি থাকা এবং বর্তমান অবস্থান পাঠকদের জন্য তুলনামূলক কম সুবিধাজনক হওয়াকে কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

গত বুধবার শাহবাগের নির্মাণাধীন ভবনের সামনে কথা হয় কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে। তাদের কেউই অস্থায়ী জাতীয় গণগ্রন্থাগারে যান না। কেউ কেউ জানেনও না বর্তমানে গ্রন্থাগারটি কোথায়। প্রয়োজনীয় বই ও তথ্যের জন্য তারা কাছাকাছি পাঠাগার কিংবা অনলাইনের ওপর নির্ভর করছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ওয়াসিম হোসেন বলেন, জাতীয় গণগ্রন্থাগারের কথা তিনি সিনিয়রদের কাছে অনেক শুনেছেন, ছবিও দেখেছেন। সেখানে গিয়ে পড়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু এখনকার অবস্থান সম্পর্কে তাঁর তেমন ধারণা নেই।

আরেক শিক্ষার্থী জাহিদুল আলম বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগেই পাবলিক লাইব্রেরির কথা শুনেছেন। কিন্তু এখন সেটি কোথায়, তা তিনি জানেন না।

মাসে ভাড়া গুনতে হচ্ছে ২৬ লাখ টাকা
পাঠকসেবার সংকটের পাশাপাশি অস্থায়ী ব্যবস্থায় সরকারের বাড়তি ব্যয়ও হচ্ছে। জাতীয় গণগ্রন্থাগারের পাঠকসেবা চলছে আইইবি ভবনের দুটি ফ্লোরে। দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের পাশে বিএসএল ভবন থেকে।

এ জন্য প্রতি মাসে প্রায় ২৬ লাখ টাকা ভাড়া গুনতে হচ্ছে। নতুন ভবনে কার্যক্রম ফিরলে এই বাড়তি খরচের প্রয়োজন হবে না। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় অস্থায়ী ব্যবস্থার মেয়াদও দীর্ঘ হচ্ছে।

পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি নির্মাণকাজ
জাতীয় গণগ্রন্থাগারের নতুন ভবন নির্মাণ প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হয় ২০২১ সালের জুনে। প্রথম বছর পুরোনো ভবন ভাঙার কাজ চলে। এরপর শুরু হয় নতুন ভবন নির্মাণ। গত বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি।

ঠিকাদারিপ্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ তদারককারী ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক মো. রফিকুজ্জামান জানান, প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি এখন প্রায় ৬৫ শতাংশ।

গতকাল বুধবার নির্মাণাধীন ভবন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ভবনের মূল কাঠামো দৃশ্যমান। বিভিন্ন তলায় অভ্যন্তরীণ নির্মাণকাজ চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। নতুন প্রস্তাবে ২০২৮ সালের জুনে প্রকল্প শেষ করার কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাবটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বর্তমানে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে রয়েছে।

সময় বাড়ার সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয়ও বেড়েছে। প্রথম অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৫৬১ কোটি টাকা। পরে তা বাড়িয়ে ৬২০ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। একনেক ব্যয় আরও যাচাই করতে বলার পর পর্যালোচনা করে ৫৮৮ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

মহাপরিচালক মনীষ চাকমা বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর কারণ খতিয়ে দেখতে আইএমইডির একটি দল নির্মাণ এলাকা পরিদর্শন করেছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলে ৫৮৮ কোটি টাকার প্রস্তাবটি আবার একনেকে পাঠানো হবে।

শুধু পাঠকসেবা নয়
জাতীয় গণগ্রন্থাগারের কাজ শুধু পাঠকদের বই পড়ার সুযোগ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের ৭১টি সরকারি গণগ্রন্থাগারের জন্য প্রতিবছর প্রায় দুই কোটি টাকার বই কেনা হয়। এসব বই সংগ্রহের পর তালিকাভুক্তি, শ্রেণিবিন্যাস ও বাছাইয়ের কাজও এখান থেকে করা হয়।

জাতীয় দিবসকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, আলোচনা ও অন্যান্য আয়োজনের পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও শিশু-কিশোরদের পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার কাজেও প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা রয়েছে।

অস্থায়ী ঠিকানায় জায়গা কম থাকায় এসব কাজ আগের মতো করা যাচ্ছে না। পাঠকসেবার পাশাপাশি বই সংরক্ষণ ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনার দাপ্তরিক কাজও সীমিত জায়গায় চালাতে হচ্ছে।

নতুন ভবনের জন্য প্রতীক্ষা
নতুন ভবন চালু হলে পাঠকদের জন্য বাড়বে সুযোগ-সুবিধা। সাধারণ পাঠাগারের পাশাপাশি সেখানে বিজ্ঞান পাঠাগার, রেফারেন্স পাঠকক্ষ, শিশু-কিশোর শাখা ও অনলাইন পাঠাগার রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। থাকবে মিলনায়তন, ক্যাফেটেরিয়া, ই-লাইব্রেরি, জিমনেসিয়াম ও শিশু কর্নার। প্রতিবন্ধী পাঠকদের জন্যও থাকবে বিশেষ ব্যবস্থা।

ভূগর্ভস্থ গাড়ি পার্কিং ও মিলনায়তন এবং নিচতলা থেকে নবম তলা পর্যন্ত বিভিন্ন দাপ্তরিক ও পাঠাগার-সংশ্লিষ্ট সুবিধা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। আবাসনের জন্য পাশেই নির্মাণ করা হচ্ছে পৃথক ১০ তলা ভবন।

কিন্তু নতুন ভবনের দরজা খুলতে আরও সময় লাগবে। ততদিন অস্থায়ী পাঠকক্ষে সীমিত বই, সীমিত জায়গা আর ফাঁকা চেয়ার নিয়েই চলবে জাতীয় গণগ্রন্থাগার। আর বইয়ের বড় একটি অংশ পড়ে থাকবে বাক্সে– পাঠকের অপেক্ষায়।

 

আরও পড়ুন

×