ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এক্সপ্লেইনার

মার্কিন নাবিকদের সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা, হোমার যা জানতেন, বিজ্ঞান যা বলছে

মার্কিন নাবিকদের সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা, হোমার যা জানতেন, বিজ্ঞান যা বলছে
×

সাগরে মার্কিন রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। ফাইল ছবি: এএফপি

হিন্দুস্থান টাইমস

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:৩৭ | আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:৩৯

মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এ অবস্থানরত ৫ হাজারের মতো নাবিক ও মেরিন সেনা টানা ২৫০ দিনেরও বেশি সময় সমুদ্রে কাটাচ্ছেন। আধুনিক যুগে কোনো বন্দরে নোঙর না করে মার্কিন রণতরীর দীর্ঘ সময় সাগরে থাকার এটিই প্রথম ঘটনা।

একাধিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এরই মধ্যে কয়েকজন নাবিক সাগরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। পরিবারের সদস্যরা মার্কিন আইনপ্রণেতাদের কাছে নাবিকদের ভেঙে পড়া মানসিক অবস্থার কথা জানিয়েছেন। এক নাবিক তাঁর স্ত্রীকে খুদে বার্তায় লিখেছেন, ‘আগামীকাল যেন তাঁর আর ঘুম না ভাঙে।’

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ সাগরে মোতায়েন রাখার মেয়াদ নিয়মিত বাড়ানো হচ্ছে। জাহাজের বদ্ধ পরিবেশ, ক্রমাগত দুলুনি, অনিদ্রা ও জনবিচ্ছিন্নতা একজন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে- এই সংকট তা স্পষ্ট করে তুলেছে।

রণতরীর শোচনীয় অবস্থা সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে
দ্য গার্ডিয়ান ও আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন সাগরে যাত্রা শুরু করে ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর। শুরুতে এটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উদ্দেশ্যে রওনা হলেও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্যের দিকে নেওয়া হয়। গত মে মাসে এই জাহাজের অভিযান শেষ হওয়ার কথা ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে জাহাজের নাবিক ও সেনারা মাত্র দুইদিন স্থলে নামার সুযোগ পেয়েছিলেন। 

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক গণমাধ্যম স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস-এর তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগোতে নাবিকদের পরিবারের সদস্যদের মতবিনিময় সভা হয়। এতে অন্তত ২০০ জনের স্বজনরা অংশ নেন। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সভায় এক নারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মার্কিন নৌবাহিনী ‘আমাদের ও নেতৃত্বের মধ্যকার আস্থা’ ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।

রণতরীতে সাবান ও টুথপেস্টও নেই বলে জানিয়েছেন এক কংগ্রেস সদস্য। ফাইল ছবি: এএফপি

একাধিক মার্কিন ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, রণতরীতে থাকা অন্তত তিনজন নাবিক সাগরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। তাদের মধ্যে একজনকে হেলিকপ্টারের সাহায্যে উদ্ধার করা হয়েছে। এই খবরগুলো সামনে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক ক্ষোভ ও সমালোচনা শুরু হয়।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাবিকদের মানসিক অবস্থার অবনতি সংক্রান্ত উদ্বেগ খারিজ করে দিয়েছেন। তাঁর দাবি, পরিবারগুলোর মধ্যে কোনো উদ্বেগ নেই। জাহাজটি শিগগিরই ফিরে আসবে। সেখানে আরেকটি রণতরী পাঠানো হচ্ছে।

এদিকে আব্রাহাম লিংকন রণতরীতে নিত্যপণ্যের সংকট থাকার কথা জানিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে চিঠি লিখেছেন কানেকটিকাটের ডেমোক্রেট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল। আরেক ডেমোক্রেট সিনেটর মার্ক কেলি নাবিকদের সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টার খবরগুলোকে উদ্বেগজনক হিসেবে অভিহিত করেছেন। 

ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্রেট কংগ্রেস সদস্য মাইক লেভিনও জাহাজের ভেতর শোচনীয় পরিবেশের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি জানান, সেখানকার শৌচাগারগুলোতে ছত্রাক জমেছে। এক বেলার খাবারের পরিমাণও অর্ধেকে নেমেছে। এমনকি ব্যবহারের জন্য সাবান বা টুথপেস্টও নেই। 

‘সি ম্যাডনেস’ ও হোমারের দেখা বাস্তবতা
আধুনিক নৌবাহিনীর নথিপত্রে এ ধরনের ঘটনার হিসাব রাখা শুরুর বহু আগে সাহিত্যিকরা সাগরের অভিজ্ঞতা তাদের লেখায় তুলে ধরতেন। ১৭৯৮ সালে সামুয়েল টেলর কোলরিজের বিখ্যাত কবিতা ‘দ্য রাইম অব দ্য অ্যানশেন্ট মেরিনার’-এ বাতাসের অভাবে স্থবির হয়ে পড়া একটি জাহাজ এবং নাবিকদের মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার চিত্র ফুটে উঠেছে।

একইভাবে ১৮৫১ সালে প্রকাশিত হারমান মেলভিলের ‘মবি-ডিক’ উপন্যাসেও দীর্ঘ এক সমুদ্রযাত্রায় ক্যাপ্টেন আহাবের ক্রমে উন্মাদ হয়ে যাওয়ার গল্প ফুটে ওঠে। 

প্রাচীন গ্রিসের মহাকবি হোমারের ওডিসিতেও সাগরের টিকে থাকার গল্প আছে। এই মহাকাব্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ক্রিস্টোফার নোলান সম্প্রতি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। প্রাচীনকালে নাবিকদের অভিজ্ঞতার ধরন কেমন ছিল, সেটি বুঝতে গবেষকরা বিভিন্ন সময় মহাকাব্যটির দারস্থ হয়েছেন।

জার্মান সেন্টার ফর ভার্টিগো অ্যান্ড ব্যালেন্স ডিসঅর্ডারস-এর গবেষক ডোরিন হুপার্ট, জুডি বেনসন ও থমাস ব্র্যান্ড ২০১৭ সালে ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন নিউরোলজি’ সাময়িকীতে একটি রিভিউ প্রকাশ করেন। সেখানে তাঁরা হোমারের সময় (খ্রিষ্টপূর্ব ৮০০ অব্দ) থেকে শুরু করে পরবর্তী রোমান যুগ পর্যন্ত গতিজনিত অসুস্থতার (মোশন সিকনেস) চিকিৎসা সম্পর্কিত বর্ণনা তুলে ধরেন।

গবেষকরা জানান, অপরিচিত গতির প্রতি শরীরের অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে প্রাচীন গ্রিকরা অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। সাধারণত অভিজ্ঞ নাবিকরা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন। যা আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষায় ‘হ্যাবিচুয়েশন’ বা অভ্যস্ততা নামে পরিচিত।

মার্কিন রণতরীতে নাবিক ও মেরিন সেনারা। ফাইল ছবি: ইউএস নেভি

কেমব্রিজের সাময়িকী ‘অ্যান্টিকথন’-এ ২০১৯ সালে একটি গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশ হয়। এতে গবেষক রূপার্ট ম্যান যুক্তি দেন যে, ওডিসির বেশ কয়েকটি ঘটনা নিছক কাল্পনিক গল্প নয়। বরং তা বাস্তব সমুদ্রযাত্রার অভিজ্ঞতার আলোকে লেখা হয়েছিল। 

উদাহরণ হিসেবে রুপার্ট ম্যান দেবী ইনো বা লিউকোথিয়া সংক্রান্ত পর্বটির কথা উল্লেখ করেন। জাহাজডুবির পর ওডিসিয়াস যখন চরম বিপদে পড়েন, তখন এই দেবী আবির্ভূত হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছানোর পথ দেখান। আধুনিককালে সাগর থেকে বেঁচে ফেরার বিভিন্ন বাস্তব গল্পেও এমন ঘটনার প্রমাণ মেলে। যেখানে চরম একাকীত্ব ও জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে মানুষ প্রায়ই নিজের পাশে অন্য কারও উপস্থিতি অনুভব করার কথা জানান।

মেরু অভিযান ও পর্বত আরোহীদের বেঁচে ফেরার গল্পেও এ ধরনের মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতাকে অনেক সময় ‘থার্ড ম্যান ফ্যাক্টর’ বা তৃতীয় সত্তার উপস্থিতি হিসেবে অভিহিত করা হয়। 

আধুনিক বিজ্ঞান কী বলছে?
সমতলে অবস্থানের সময় মানুষের মস্তিষ্ক দেহের ভারসাম্য ও গতির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পায়। তবে সমুদ্রে গেলে শরীর ও মস্তিষ্কের মধ্যে সংকেত আদান-প্রদানে গোলযোগ দেখা দেয়। একদিকে চোখের দেখায় আকাশ ও সমুদ্রের সীমানা সমান্তরাল মনে হয়। অন্যদিকে মাথায় থাকা ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণকারী অঙ্গ ‘ভেস্টিবুলার সিস্টেম’ জাহাজের দুলুনি টের পায়।

দীর্ঘ সময় এমন দুলুনির মধ্যে থাকলে স্নায়ুতন্ত্র এর সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যায়। ফলে নাবিকরা সাগর থেকে স্থলে ফেরার পরও প্রতিক্রিয়াটি থেকে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘মাল দঁ দেবার্কমঁ সিন্দ্রোম’ বা এমডিডিএস। এটি মূলত একপ্রকার দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা। যেখানে মাটিতে দাঁড়িয়েও শরীর দুলছে বা ভাসছে বলে মনে হয়। 

নিউইয়র্ক একাডেমি অব সায়েন্সেসের ২০১৫ সালের এক নথিতে এমডিডিএস রোগীদের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতার বিস্তারিত তুলে ধরেন স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ইউন-হি চা। এতে মানসিক উদ্বেগ, ক্রমাগত ক্লান্তি, ধীর চিন্তাশক্তি এবং চোখে দেখা গতির প্রতি সংবেদনশীলতার সময়কার মস্তিষ্কের ছবি দেখানো হয়।

জাহাজের ক্রুদের ওপর দুটি ভিন্ন শিফটের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করেছেন গবেষক মিকো মাইলিলা ও তাঁর সহযোগীরা। ২০২২ সালে এ সংক্রান্ত নিবন্ধ প্রকাশ হয়েছে ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিক হেলথ’-এ।  গবেষণায় দেখা যায়, বয়সে প্রবীণ এবং দীর্ঘদিন ধরে নৌবাহিনীতে কর্মরত নাবিকদের মধ্যে জাহাজে থাকার সময় অতিরিক্ত ঘুমের ভাব, ক্লান্তি ও মানসিক চাপের মাত্রা তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে যাদের শারীরিক সক্ষমতা ও ফিটনেস ভালো, তাঁদের মধ্যে এই তিনটির প্রভাবই বেশ কম।

আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের ঘাটতি কেবল মানুষকে ক্লান্তই করে না, বরং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানসিক ক্ষমতাও নষ্ট করে দেয়।

ওয়াশিংটনভিত্তিক অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর মেরিটাইম স্ট্র্যাটেজি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, নৌ ও সাবমেরিন কার্যক্রমে ট্রমাটিক ব্রেন ইনজুরি, বিস্ফোরণের মুখোমুখি হওয়া, একাকীত্ব ও বাতাসের চাপের পরিবর্তনে শারীরিক ধকল তৈরি হয়। কিন্তু এটি সব সময়ই উপেক্ষিত থাকে।

আব্রাহাম লিংকনের নাবিকদের ওপর এখনও কোনো গবেষণা চালানো হয়নি। সেন্টার ফর মেরিটাইম স্ট্র্যাটেজির প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে, নাবিকদের শারীরিক ও মানসিক সমস্যাগুলো মিলে যে সংকট তৈরি হয়, সেদিকে বিশ্বের নৌবাহিনীগুলোর এখনই নজর দেওয়া উচিত।

আরও পড়ুন

×