মুস্তাফা মনোয়ার
শিশুদের পাপেটশিল্প বন্ধু
মুস্তাফা মনোয়ার [জন্ম: ১ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৫–মৃত্যু: ২৯ জুন ২০২৬]
রশীদ হারুন
প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ০৮:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘বাল্যকাল হইতে আমাদের শিক্ষার সহিত আনন্দ নাই। কেবল যাহা-কিছু নিতান্ত আবশ্যক তাহাই কণ্ঠস্থ করিতেছি। তেমন করিয়া কোনোমতে কাজ চলে মাত্র, কিন্তু বিকাশলাভ হয় না।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই উক্তি অথবা ‘ভালো করিয়া দেখিতে গেলে শিশুর মতো পুরাতন আর-কিছুই নাই। দেশকাল শিক্ষা প্রথা-অনুসারে বয়স্ক মানবের কত নূতন পরিবর্তন হইয়াছে, কিন্তু শিশু শত সহস্র বৎসর পূর্বে যেমন ছিল আজও তেমনি আছে।’
এই উক্তি এবং শিক্ষা ও পাঠদান বিষয়ক নানা উক্তির উপস্থিতি প্রায়শঃ লক্ষ করা যায় পাপেট বিষয়ক মুস্তাফা মনোয়ারের বিবিধ লেখায়। মুস্তাফা মনোয়ারও বিশ্বাস করেন, ‘দেশে ঠাকুরমাদের রূপকথা বলা শেখানোর জন্য স্কুল খোলা উচিৎ।’ তাঁর মতে, ‘রূপকথা বা কল্পনার জগৎ শিশুদের সবচেয়ে বড় শিক্ষালয়।’
‘এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’ (ইপিডিসি) শিক্ষা বিষয়ে; বিশেষত শিশু শিক্ষা বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্বাস ও অভিমতকে ধারণ করে তাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে পরিচালিত করছে। দেশে পাপেট শিল্পকলার প্রয়োগ, প্রসার ও উন্নয়নের জন্য বহুমুখী কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। যেমন- শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে দেশাত্মবোধ জাগ্রত করা এবং দেশীয় সংস্কৃতি ও কৃষ্টির সাথে পরিচিত করার জন্য দেশজগল্প, লোকগাথা, নীতিকথা অবলম্বনে পাপেট অনুষ্ঠান নির্মাণ করা, ঐতিহ্যবাহী পুতুলনাট্যের সাথে সংশ্লিষ্ট শিল্পী ও কুশলীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করে আধুনিক, বিজ্ঞানমনষ্ক ও আন্তর্জাতিক মানের শিল্পকলা সৃষ্টির উপযোগী করে তোলা, পাপেট শিল্পের সুষ্ঠু বিকাশ এবং যোগাযোগ মাধ্যম হিসাবে এই প্রথাসিদ্ধ মাধ্যমের যথাযথ ব্যবহার ও প্রয়োগ, পাপেট তৈরি, পরিচালনা এবং পরিবেশনা কৌশল বিষয়ে পারদর্শিতা তৈরির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, এই শিল্পের সাথে জড়িত দেশ বিদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে স¤পর্ক স্থাপন করা ও যোগাযোগ রক্ষা করা, শিল্প মাধ্যম হিসাবে পাপেট নাট্যের উন্নয়ন, পরিবেশ রক্ষা, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে পাপেট কাহিনীর বিষয়বস্তু নির্বাচন ও রচনা করা এবং যথাযথ মাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা করা।
একইসঙ্গে শিক্ষা প্রদানের মাধ্যম হিসাবে পাপেটকে কার্যকরী উপকরণ হিসাবে ব্যবহারকরা, পাপেট মিডিয়া স¤পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে সেমিনার আয়োজন, পোস্টার, লিফলেট মুদ্রণ, পুস্তিকা প্রকাশ ও বিতরণ করা, টেলিভিশন এবং ভিডিও মাধ্যমে প্রচারের জন্য শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান নির্মাণ ও উন্নয়ন, দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও অডিটোরিয়ামে নিয়মিত পাপেট শো করা।
পাপেট থিয়েটার ও এ বিষয়ক কর্মশালা প্রসঙ্গে মুস্তাফা মনোয়ারের বোঝাপড়া ও পরিকল্পনা ছিল ব্যাপক। বর্তমান লেখকের পিএইচডি অভিসন্দর্ভ ‘বাংলাদেশের পুতুল নাচ’ এর জন্য মুস্তাফা মনোয়ার বিশেষ সাক্ষাৎকার প্রদান করেন। সাক্ষাৎকারের অংশ নিচে পত্রস্থ হল–
‘পাপেট থিয়েটার হচ্ছে একটি কম্পোজিট টোটাল আর্ট। চারু ও কারুকলার এবং সাহিত্যের সকল শাখা, ভিজুয়াল ও পারফরমিং আর্টের বিবিধ শাখার সম্মিলিত শিল্পকলা হলো পাপেট থিয়েটার। সকল কালের মানুষের সঙ্গেই পাপেট থিয়েটারের সখ্য তৈরি হয়। এই শিল্প তাই চিরকালীন হয়েও আধুনিক। এই শিল্প-সখ্য গড়ে তুলবার জন্য পাপেট শিল্পকলার শিল্পীদের পারদর্শিতা অর্জন করতে হয় পাপেট নির্মাণ কৌশল, পাপেট চালনা, পাপেট অভিনয় কৌশল, কণ্ঠশীলন, শিশু তথা দর্শক-মনস্তত্ত্ব, পাপেট অনুষ্ঠান আয়োজন ও পরিবেশনা পদ্ধতি, বিনোদনের সাথে আনন্দময় শিক্ষার সংযোগ প্রভৃতি বিচিত্র বিষয়ে। পাপেট তৈরি, পরিচালনা, অভিনয়, মঞ্চদৃশ্য রচনা, কণ্ঠ প্রস্তুতি প্রভৃতি বিষয়ে প্রশিক্ষিত করে তোলার লক্ষ্যে ‘মাল্টিমিডিয়া পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’ হাতে নিয়েছিল ট্রেনিং কর্মসূচী। উক্ত ট্রেনিং কর্মসূচীর আওতায় ছয়টি ব্যাচে সর্বমোট ৬০ জনের মত ট্রেনিং গ্রহণ করেছিল। প্রথম ব্যাচে অংশ গ্রহণ করেছিল ১৪ জন, কোর্স সমাপ্ত করতে পেরেছিল ১০ জন, দ্বিতীয় ব্যাচে ২০ জন, তৃতীয় ব্যাচেও ২০ জন। প্রশিক্ষণ প্রাপ্তদের মধ্যথেকে অনেকেই পরবর্তী সময়ে ‘মাল্টিমিডিয়া পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টারে’র সাথে সম্পৃক্ত থেকেছেন।
প্রশিক্ষণ প্রাপ্তির ফলে অনেকেই পাপেট তৈরি ও পরিচালনা, কণ্ঠাভিনয় প্রভৃতিতে দক্ষতা অর্জন করেছেন। প্রশিক্ষিত শিল্পীদের অনেকেই পাপেট তৈরি, পাপেট পরিচালনা, মঞ্চ ও দৃশ্য নির্মাণ, কণ্ঠাভিনয়, আলোক প্রক্ষেপণ প্রভৃতিকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করেছেন। এদের মধ্যে মির্জা শাহরিয়ার আলম, কামাল মো. আহসান বিপুল, জাকিয়া সুলতানা শান্তা, অনুকূল চন্দ্র দাস, মো. জিল্লুর রহমান-এর নাম উল্লেখযোগ্য।
সকল শিশুই তাৎক্ষণিকভাবে তার নিজস্ব উপায়ে কিছু করতে ভালোবাসে যেমন- খেলা, গান, চিত্রাঙ্কন প্রভৃতির মাধ্যমে নিজের ইচ্ছাকে প্রকাশ করে। একজন বয়স্ক ব্যক্তি অপেক্ষা একটি শিশুর সৃষ্টিশীল ক্ষমতা অনেক বেশি, কেননা তার রয়েছে দেখার জন্য চমৎকার জাদুকরি চোখ। আমাদের অবশ্যই উচিত শিশুদের এই সুন্দর সৃষ্টিশীল চিন্তাগুলোকে প্রকাশ করতে দেয়া, উদ্বুদ্ধ করা। অনেকে মনে করেন তিনি শিল্প ও নান্দনিক বিষয়ে ভালো পাঠদান করতে পারেন না, কারণ তারা মনে করেন তারা নিজেরা শৈল্পিক নন। অথচ কোনো শিক্ষকেরই এমন মনে করা উচিত না। শিক্ষকতার মূল কথাই হচ্ছে উদ্বুদ্ধ বা উজ্জীবিত করণ। তাঁরা চেষ্টা করলে অবশ্যই নিজেদের সৃষ্টিশীল চিন্তা চেতনার উন্নয়ন ঘটাতে পারেন। শিক্ষকের সমর্থন ও উদ্দীপনায় শিশু ও শিক্ষক উভয়েরই নান্দনিক বোধ উন্নীত হবে। শিল্পকলা ও নান্দনিক ক্রিয়াকর্ম কখনই শিক্ষা কারিকুলামের বাইরে নয়। প্রাথমিক শিক্ষার জন্য ঐতিহ্যবাহী লৌকিক ধারার পুতুলনাট্য বা পাপেট্রি একটি সর্বজনীন মাধ্যম হিসাবে গুর”ত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।পাপেটনাট্য চারু ও কারুকলার সমন্বয়ে গঠিত একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পকলা; কেননা এর মধ্যে রয়েছে ডিজাইন, ভাস্কর্য, চিত্রকলা, সাহিত্য, অভিনয়, সঙ্গীত এবং অন্যান্য সকল পারফর্মিং শিল্পকলা। শিক্ষা যোগযোগের ক্ষেত্রে মাধ্যম, উপকরণ, প্রয়োগ পদ্ধতি চিহ্নিতকরণ খুবই জরুরি। অনেক দিন ধরে শিক্ষক শিক্ষা যোগাযোগের জন্য পুস্তক, চক-ডাস্টার, বোর্ড প্রভৃতি উপকরণ ব্যবহার করে আসছেন। অন্যদিকে উন্নত বিশ্বের দেশসমূহে শিক্ষকগণ ব্যবহার করছেন রেডিও, টেলিভিশন, ফটোগ্রাফ, ফিল্ম, টেপ-রেকর্ডার, ভিসিআর, ওভার হেড প্রজেক্টর, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, কম্পিউটার, ইন্টারনেট প্রভৃতি। যোগাযোগের এই সকল উপকরণ ব্যবহার করে প্রচলিত পন্থার পাশাপাশি একজন শিক্ষক আধুনিক পদ্ধতিতে পাঠদান করতে পারেন।
বাংলাদেশ ঘন জনবসতিপূর্ণ একটি গরিব দেশ। আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা যোগাযোগ প্রযুক্তি নিয়ে খুব বেশি ভাবতে পারি না। কিন্তু আমরা তো বসে থাকতে পারি না! সরকারের ইচ্ছা, আমাদের শিশুরা সকলেই শিক্ষালাভ করবে এবং অন্তত প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে যেন তা অর্জিত হয়। স্কুল ও শিক্ষাকে আনন্দময়-আকর্ষণীয় করে তোলা শিক্ষকের দায়িত্ব। কিন্তু তাঁদের উপযুক্ত উপকরণের অভাব। শিক্ষাদানের জন্য তাঁদের সম্বল কেবল কণ্ঠ, মুখভঙ্গি, পুস্তক আর চক-বোর্ড। সহজ উপায়ে বহুমুখি শিক্ষণ পদ্ধতিতে শিক্ষাদান কেমন করে সম্ভব, সে বিষয়ে আমরা তাঁদের সহযোগিতা ও উদ্বুদ্ধ করতে পারি।
আমরা বলতে চাই, যোগাযোগের আধুনিক প্রযুক্তি আমরা রাতারাতি এনে দিতে পারবো না। সেগুলো হয়তো ধীরে ধীরে এসে যাবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বহুমাত্রিক শিক্ষা ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে পাপেটের ব্যাপক ভূমিকা বিষয়ে আমরা কার্যকর সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারি।
সকল বয়সের বিশেষ করে শিশুদের আনন্দ ও বিনোদনের পাপেট্রি একটি প্রাচীন এবং সর্বজনীন শিল্প মাধ্যম। বাংলাদেশে পাপেট্রি বা পুতুলনাট্যের একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য আছে। অনেক কাল ধরে আমাদের দেশের লোকেরা পুতুলনাট্যের বিনোদনের ভেতর দিয়ে নৈতিক অনেক শিক্ষাই লাভ করতো। এমনকি বর্তমান সময়েও মেলা ও উৎসব পার্বণে সব বয়সের, বিশেষত শিশুদের আনন্দের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে পাপেটনাট্য। পুতুলনাট্য মূলত সকল শিল্পকলার প্রাণকেন্দ্র; এর মধ্যে ডিজাইন, ড্রইং, পেইন্টিং, ভাস্কর্য, অভিনয়, সঙ্গীত, নৃত্য, উপস্থাপনা প্রভৃতি সমন্বিতভাবে বিদ্যমান।এই অনুপম শিল্পকুশলতার কারণেই পাপেটনাট্য স্বাভাবিকভাবে বহুবিধ যোগাযোগ মাধ্যম হিসাবে স্থান করে আছে। শব্দ প্রয়োগ ও নড়াচড়ার নিপুণ কৌশল এবং দৃশ্য সজ্জার মনোমুগ্ধকর পরিবেশের ঐকতানে পাপেট্রি একটি আনন্দঘন মূহুর্তের উন্মেষ ঘটায়। সুতরাং শিক্ষাদানের বিষয় উপস্থানার ক্ষেত্রে তথ্য-যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে পাপেটে ব্যবহারিক প্রয়োগ ঘটালে খুবই কার্যকরী ফললাভ হবে। নিপুণ পরিচালনার গুণে পাপেটের কল্প-জগতকেও সত্যমূলক মনে হয়। একটি পাপেট শিশুদের বিরাট আনন্দের উৎস। শিশুরা পাপেট বানাতে পছন্দ করে। তাদের কল্পনা ও সৃষ্টিশীলতা দিয়ে তৈরি পাপেট দিয়ে যখন খেলা শুরু করে তখন তাদের আনন্দের আর সীমা থাকে না। সৃষ্টির উত্তেজনা সৃষ্টিশক্তি প্রকাশের মুক্তি এবং সৃষ্টির আনন্দ এই তিন-ই হতে পারে আদর্শ শিক্ষার দর্শন। সুতরাং পাপেটের শিক্ষণ-কৌশল কাজে লাগিয়ে শিক্ষার সর্বোচ্চ মর্ম উদ্ধার আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিৎ। উ. ভাষা, নৈতিকতা, সমাজ বিদ্যা থেকে শুরু করে গণিত পর্যন্ত যেকোন বিষয়-ই পাপেটের মাধ্যমে শিক্ষাদান করা সম্ভব; যদি শিক্ষক পাপেটের প্রয়োগ কৌশল বিষয়ে প্রশিক্ষিত হন। পাপেটের প্রয়োগ ঘটিয়ে শিক্ষক ও শিশুর চমৎকার আনন্দময় ব্যক্তিগত সম্পর্ক উন্নয়ন করা সম্ভব। এর ফলে শিশুর ব্যক্তিত্ব-বোধ উৎকর্ষ লাভ করে। যেকোন তুচ্ছ বা বাতিল জিনিসপত্র দিয়েও পাপেট তৈরি করা সম্ভব। সুতরাং প্রাথমিক পর্যায়ের স্কুলগুলোতে পাপেট পরিচিতি ও প্রয়োগ কর্মসূচীতে অর্থনৈতিক সমস্যা তেমন কোন সমস্যা নয়।
কর্মশালায় অংশ নেয়া একজন শিক্ষকের অভিজ্ঞতা
জনাব নূরুল আমীন (৫২) উত্তরা আজমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। ১৯৯৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ মার্চ তিনি পাপেট ও ফিগার ব্যবহার শিক্ষণ পদ্ধতির কর্মশালায় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। উক্ত কর্মশালাকে নিজের জীবনের ‘মাইল ফলক’ হিসাবে মনে করেন জনাব আমিন। প্রশিক্ষণে স্বর-সৃষ্টি ও উচ্চারণ অনুশীলন প্রসঙ্গে বলেন, ‘মুখের ভিতর কলম ঠুকিয়ে কিংবা ‘পাখি পাকা পেঁপে খায়’ ইত্যাদি কৌশলের মাধ্যমে প্র্যাকটিস করানো হয়েছে। আমার শিক্ষক জীবনকে এই ট্রেনিং সমৃদ্ধ করেছে।’ তাঁর মতে ‘বহুমুখী শিক্ষণ পদ্ধতিতে পাপেট ও ফিগার ব্যবহার করে শিক্ষণ পদ্ধতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একটা নতুন আনন্দদায়ক ফলপ্রসূ পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটেছে।’ কোন কোন বিষয়ে প্রয়োগ করেন জানতে চাইলে বলেন, ‘বাংলাতেই পাপেট ও ফিগারের ব্যবহারের সুযোগ বেশি তবে আমি সব বিষয়েই ব্যবহার করি। এমন কি অংকেও। কখনও কখনও ধর্ম ক্লাসেও।’ অংকে পাপেট ব্যবহার প্রসঙ্গে বলেন, ‘যেমন শিয়াল বা সিংহ বা মোরগের পাপেট যদি এক, দুই, তিন গণনা করে অথবা নামতা পড়ে এবং কণ্ঠেও অভিনয় করে তাহলে ছাত্র-ছাত্রীরা বেশি মনোযোগী হয়।’ পাপেট মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণ স¤পর্কে জানান, ‘শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত আনন্দ পায়। বিশেষ করে আমার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। পাপেটের কারণে প্রায়ই অতিরিক্ত ক্লাস নিতে হয় আমাকে।’ ‘ক্লাসের পড়ার সাথে মিল করে’ তিনি পাপেট ব্যবহার করেন। চরিত্র অনুযায়ী কখনও কখনও পোশাকও পরিবর্তন করেন। ক্লাসে পাপেট ও ফিগার ব্যবহারের কৌশল প্রসঙ্গে বলেন, ‘পাপেট হল এক প্রকার পুতুল আর ফিগার হলো আকৃতি। যেমন একটি কাপড় হাতে নিয়ে ছাত্রদের বললাম, ‘দেখতো কি সুন্দর চোখ, কেমন করে ডাকছে’। এ পদ্ধতি শিশুর কল্পনা শক্তি বৃদ্ধির জন্য ফলপ্রসূ।’ প্রসঙ্গত পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন, ‘আমি ওদের ভাষা বুঝি না। ওরাও আমার ভাষা বোঝেন না। আমি রুমালকে ফিগার বানিয়ে গল্প বলে ওদের সাথে এক প্রকার আন্তস¤পর্ক তৈরি করলাম। ভাষা না বুঝলেও ফিগারের সাহায্যে অনেক কিছু বোঝা যায়।’ জনাব নূরুল আমীনের সহকর্মীরা তাঁর কাছে শিখতে চান। অন্যান্য স্কুলের শিক্ষার্থীরাও যখন তাঁর পাপেট প্রোগ্রাম দেখে, তারাও উৎসাহ বোধ করেন। গাজীপুরের একজন মহিলা পুতুল নিয়ে জনাব আমীনের নিকট আসেন শিখতে। ‘খরগোশ ও কচ্ছপের গল্প’ পাপেটের মাধ্যমে দেখানোর সময় বেশি আনন্দ পান। কেননা তাঁর কণ্ঠের বৈচিত্র্যময় ব্যবহার ও পাপেটের ছান্দিক চলনে ছাত্র-ছাত্রীরা একাগ্রচিত্তে মনোযোগ দিয়ে দেখে। স্কুলে কি কি পাপেট আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন রকমের পাপেট আছে। তবে একই পাপেটকে বিভিন্ন চরিত্র বানানো যায়। যেমন, একটি ছাত্রীর পাপেট পুতুলকে শাড়ি পরিয়ে বউয়ের পাপেট, সাদা কাপড় পরিয়ে বুড়ির পাপেট বানানো যায়। এছাড়াও কিছু পশু পাখির পাপেট রয়েছে যেমন- বক, বাঘ, শিয়াল, কচ্ছপ ইত্যাদি। আমি মাটি দিয়ে কুমিরের পাপেট বানিয়েছি। কুমির আর শিয়ালের গল্পে মাটির তৈরি কুমির ব্যবহার করি।’ পাঠ্যসূচীতে পাপেটের অন্তর্ভূক্তি প্রসঙ্গে বলেন, ‘পাপেট কৌশলটি আরও ছড়িয়ে দেয়া উচিত। প্রত্যেক স্কুলে পাপেট পদ্ধতি প্রয়োগ করা খুবই প্রয়োজন। শুধু প্রাইমারি পর্যায়ে না, উচ্চ শ্রেণিতেও এই পদ্ধতির দরকার আছে।’পাপেট ও ফিগার ব্যবহার করে শিক্ষণ পদ্ধতির সফলতা স¤পর্কে তাঁর অভিমত হচ্ছে, ‘এ পদ্ধতি শিশুদের জন্য অত্যন্ত আনন্দদায়ক। শিশুদের কল্পনা শক্তিকে বৃদ্ধি করতে পাপেট ফলপ্রসূ। তাই ফিগার পাপেট, গ্লাভ্স পাপেট ও রড পাপেট, তিনটি পাপেট পদ্ধতি-ই শিশুদের জন্য কার্যকরী। তবে ফিগার পাপেট সবচেয়ে উপযোগী। তর্জনী আঙ্গুলে মাথা আর বৃদ্ধা ও কনিষ্ঠা আঙ্গুল হাত হিসাবে ব্যবহার করতে হয়। এর সাথে বাচিক অভিনয়ের মিল রেখে উপস্থাপন করলে দর্শক সহজেই আকৃষ্ট হয় ও আনন্দ উপভোগ করে। আমাদের স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান ও মেলা ২০০৪-এ পাপেট দিয়ে প্রধান অতিথিকে সম্ভাষিত করে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছি।’
- বিষয় :
- গল্প
