হয়ে ওঠা না-ওঠার বেদনা
আলফ্রেড খোকন
প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ০৮:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
মানুষের যেমন প্রতিবেশী হয়, প্রতিবেশী লাগে–শুধু কি মানুষের? কার, কিসের প্রতিবেশী দরকার হয় না? উদ্ভিদ, জড় ও জীব উভয়েরই প্রতিবেশী দেখতে পাই। প্রতিবেশী মানুষ, তার মধ্যে ভালোমন্দ আছে। কিন্তু এই ভালোমন্দ, কাছের দূরের প্রতিবেশী মানুষ মিলে যেমন একইসাথে আনন্দ ও নিরানন্দদায়ক প্রতিবেশীরও জন্ম দেয়; আনন্দ আর বেদনার প্রতিবেশী মানে পঙক্তির মত, সেই পঙক্তির মধ্যে যখন দেখি একটি সাদা বিড়ালের মিঁউ ডাক, তখন তা আরও প্রতিবেশীময় হয়ে ওঠে, এতে আমরা কোনো না কোনো কল্পনার ইমেজে ভেসে উঠতে পারি, উপলব্ধি করতে পারি। যেমন দেখবেন কোনো বনে একদিকেই একরকমের গাছপালার জন্ম হয়, এরও নাম প্রতিবেশীপরায়ণতা। সাধারণত আমবাগানে জামগাছ প্রতিবেশী হয় না। কিন্তু হঠাৎ যখন অনেক আমগাছের ভিড়ে একটি জামগাছ প্রতিবেশী হয়ে উঁকি দেয়, এবং থোকা থোকা জাম ধরে জামগাছের শাখায়, তখন আরেক ব্যঞ্জনা খোঁপা করে দাঁড়ায়। তার মাধুরী কিছুটা ব্যাখ্যা করা গেলেও কিছুটা অব্যাখ্যাত থেকে যায়। আবার ধরুন একরকমের তৃণফুলের পাড়ায় হঠাৎ যখন ভিন্নগোত্রের কিংবা ভিন্ন রঙের একটি তৃণফুলগাছ তার ভিন্ন ফুলটি নিয়ে উঁকি দেয়, তখন ওই তৃণফুলের সমারোহ আরও আরামদায়ক ওয়ে ওঠে। প্রতিবেশীর এই রূপ আমরা সর্বত্রই কমবেশি দেখতে পাই, কখনও তা উজ্জ্বল হয়ে ধরা দেয়, কখনও তা অনুজ্জ্বল থাকে। কবিতার প্রতিবেশীরাও তেমন। একটি কবিতার জন্ম, বৃত্তান্ত ও বিস্তার, হয়ে ওঠা না ওঠার অনেক ছন্দ, দ্বন্দ্ব ও কল্পনা জড়িয়ে কবির সঙ্গে প্রতিবেশী হয়ে ওঠে।
এরকম একটি কবিতার প্রতিবেশীর কথা যদি বলি–তবে কবিতাটি পাঠের আগে একটি গল্প মনে পড়ে। একদিন ঢাকার এক অফিসার্স কোয়ার্টারের ভেতর দিয়ে সকালবেলা আমি রমনার দিকে হেঁটে যাই। এই কোয়ার্টারটি গাছপালায় ঘেরা। হঠাৎ একটি কোকিলের কুহু রব শুনতে পেলাম। কিন্তু ওপরের দিকে তাকিয়ে কোকিলকে দেখতে পেলাম না। তখন বসন্তকাল সমাগত। পরদিন একই পথ দিয়ে রমনার দিকে যেতে আবারও কোকিলের কুহু কুহু রব শুনি। আমার মনে হলো এই কোকিলের ডাক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় হয়েছে। কারণ, প্রতিদিন একই স্থানে তার উপস্থিতি টের পাওয়ার দরুণ আমার এই উপলব্ধি। এবং তা অবশ্যই ছিল ওই সরকারি কোয়ার্টারের একটি গাছের মগডালে। হঠাৎ সুউচ্চ ইউক্যালিপটাস গাছের মগডালে তাকে মুহূর্তের জন্য আবিষ্কার করি। তারপর প্রতিবেশীময় আমার এ অভিজ্ঞান জন্ম নিল–সে কেনো বেসরকারি কলোনিতে ডাকে না। এই কোকিলের প্রতিবেশীপ্রবণতা নিয়ে একটি কবিতার জন্ম হয়। এই কবিতাটি পাঠ করলে আমরা যে মৃদু অভিপ্রায় জানতে পারি, তা এরকম–
মৃদু অভিপ্রায়
আজই প্রথম সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় কোকিলের ডাক শোনা গেল;
এই ডাক রুটিন মাফিক,
তাতে কোনো ব্যাকুলতা নাই।
দৃশ্যত বেসরকারি উদ্যোগে যেসব বনজঙ্গল বেড়ে ওঠে
সেসব জায়গা থেকে যখন কোকিলের ব্যাকুল কণ্ঠস্বর কানে আসে
তাতে ফাল্গুন-চৈত্রের প্রতি একধরনের তীব্রতা বেড়ে যায়।
আজ সকালে যখন অফিসার্স কোয়ার্টারের ভেতর দিয়ে
রমনার দিকে হেঁটে যাচ্ছিলাম
তখনই কলোনির সুউচ্চ ইউক্যালিপটাস গাছের মগডালে
একটি কোকিলের মৃদু অভিপ্রায় টের পাই;
কিন্তু এই অভিপ্রায়ের মধ্যে চোখের পলক পড়তেই
অন্য এক আকর্ষণীয়া আমার মনোযোগ কেড়ে নেয়।
তারপ্রতি মনোযোগে দিতে যেয়ে
হঠাৎ কোকিলকে হারিয়ে ফেলি।
আপনারা তো জানেনই কোকিল বেশ চতুর পাখি,
তা না হলে কি অন্যের বাসায় ডিম পেড়ে আসে!
যখনই সে টের পায় তার প্রতি কারও মনোযোগের,
মুহূর্তেই চুপটি মারে পাতার আড়ালে
ফাঁকি দিয়ে অন্য ডালে চলে যায় চোখের পলকে।
এ বাগানে আমরা যতই খুঁজতে থাকি,
পাশের বাগান থেকে শোনা যায় তার রাগত স্বর;
আবার কোকিলের জন্য মনোযোগ প্রতিস্থাপন করতেই দেখি–সে নেই!
সারাজীবন এই হয়–
মনোযোগের মৃদু অভাব পেলে
পৃথিবীর সব আকর্ষণীয়া সন্তর্পণে বাঁক নেয় অন্য গলিতে।
তখন আমিও হারিয়ে ফেলি তাকে–
আজ প্রত্যুষে ইস্কাটন গার্ডেনের সরকারি কোয়ার্টারে
কোকিলের ডাক শোনার পর এমনই মাশুল দিতে হলো যে,
একটি পলক ছোঁ মেরে নিয়ে গেল ঢেউ, গভীর তরঙ্গ–মৃদু অভিপ্রায়িকাকে।
(রচনাকাল ২১/০৩/২০১৮)
আমি এই ছোট্ট জীবন ধরে এমনই দেখেছি যে–মনোযোগের মৃদু অভাব পেলে, পৃথিবীর সব আকর্ষণীয়া সন্তর্পণে বাঁক নেয় অন্য গলিতে। এটাই প্রতিবেশীর রাগ অনুরাগের গল্প। ফলে প্রতিবেশীর প্রতি গভীর মনোযোগ দিতে হয়। লাজুক কোকিলের মত, সন্তর্পণে বাঁক নেয়া গভীর আকর্ষণীয়ার মত, যেমন মনের মধ্যে কবিতার যে বুঁদ বুঁদ সৃষ্টি হয়, তাকে মিলিয়ে যেতে না দেয়ার মত। প্রতিবেশী আবেগনির্ভর, ছন্দনির্ভর, দ্বন্দ্বনির্ভর, গভীর মনোযোগনির্ভর। যেমন প্রতিবেশী কোকিলের রব শুনতে যেয়ে, হঠাৎ সন্ধ্যার এক গভীর আকর্ষণীয়াকে মুহূর্তে হারিয়ে ফেলি এবং একটি পঙক্তির জন্ম হয়– দৃশ্যের ঢেউ ছোঁ মেরে নিয়ে যায় তাকে, নিয়ে যায় মৃদু অভিপ্রায়িকাকে। তারপর মনে পড়ল আরও অনেককে। সেই সব সমুদ্রের পারে দাঁড়িয়ে থেকে, মনে পড়ল রূপসী বাংলাকে–
তোমরা যেখানে সাধ চ’লে যাও–আমি এই বাংলার পারে
র’য়ে যাব; দেখিব কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে;
দেখিব খয়েরি ডানা শালিখের সন্ধ্যায় হিম হয়ে আসে
ধবল রোমের নিচে তাহার হলুদ ঠ্যাং ঘাসে অন্ধকারে
নেচে চলে–একবার–দুইবার–তারপর হঠাৎ তাহারে
বনের হিজল গাছ ডাক দিয়ে নিয়ে যায় হৃদয়ের পাশে;
দেখিব মেয়েলি হাত সকরুণ–শাদা শাঁখা ধূসর বাতাসে
শঙ্খের মত কাঁদে: সন্ধ্যায় দাঁড়াল সে পুকুরের ধারে,
খইরঙা হাঁসটিরে নিয়ে যাবে যেন কোন কাহিনীর দেশে–/ ‘পরণ-কথা’র গন্ধ লেগে আছে যেন তার নরম শরীরে,/ কলমীদামের থেকে জন্মেছে সে যেন এই পুকুরের নীড়ে–/ নীরবে পা ধোয় জলে একবার– তারপর দূরে নিরুদ্দেশে/ চ’লে যায় কুয়াশায়,–তবু জানি কোনোদিন পৃথিবীর ভিড়ে/ হারাব না তারে আমি–সে যে আছে আমার এ বাংলার তীরে
(রূপসী বাংলা–জীবনানন্দ দাশ)
এই কবিতার প্রতিবেশী সম্পর্কটা দেখুন ছন্দে, দ্বন্দ্বে, উপমা, মানে, অভিমানে কিভাবে জড়াজড়ি করে আছে। এই হল প্রতিবেশীর মোহন রূপ। প্রতিদিন সম্পর্ককে বিকশিত করার মাধ্যমে যেমন সুহৃদ প্রতিবেশীর জন্ম হয়, তেমনি প্রত্যহ কবিতার অধরা মাধুরীকে পেতে গেলে একজন কবিকে কাব্যজীবনের প্রতিবেশী হয়ে উঠতে হয়। ‘তোমরা যেখানে সাধ চ’লে যাও– আমি এই বাংলার পারে র’য়ে যাব’; কারণ এই প্রতিবেশী বাংলার সাথে কবির দেখা হবে ভোরের বাতাসে ঝরা কাঁঠালপাতার সাথে। কারণ খয়েরি ডানার শালিখের পাখনার সঙ্গে সন্ধ্যার হিম প্রতিবেসে দেখা হবে। কারণ সেই শালিখের ধবল রোমের নিচে তাহার হলুদ ঠ্যাং ঘাসের অন্ধকারে বিকশিত হলে তার সাথে দেখা হবে। কবির এই প্রতিবেশী বাসনা বাংলার পারে থেকেই সম্পর্কিত হবে, সেখানে অন্য কোনো দূর দেশে যেয়ে কাজ নেই, অদেখা দেশের প্রতিবেশী হতে না-চাওয়ার এই কবি প্রতিবেশীর এমন ধারণা রচনা করেন, যেন তাতে অন্য প্রতিবেশীও মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হয়।
আবার কলমীফুল যে পুকুরের নীড়ে জন্মে, এই পুকুরও যে একটি নীড় হতে পারে, সেই নীড়ের প্রতিবেশী কলমীর পাপড়ি যেন পা ধোয় এই পুকুর নীড়ের জলে–কি বিস্ময়কর উপমা দিয়ে কবি তার প্রতিবেশীকে আহ্বান করেন, ফলে কলমীফুলের কাছে পুকুর একটি জলাশয় না হয়ে নীড় হয়ে যায়! যদিও নীরবে পা ধুইয়ে এই কলমীদাম একদিন চলে যাবে কুয়াশার মত দূরের নিরুদ্দেশে। তখন কলমীফুল আর শুধু ফুল থাকে না, হাত-পা-নাক-চোখ আর কানের এক জীবন্ত শরীর হয়ে ওঠে! এবং এইভাবে প্রতিবেশী বিকশিত হয়। এই বিকাশের নাম কবিতা।
একদিন কুয়াশার মত যে চলে যাবে দূরের নিরুদ্দেশে মানুষ ও মানবীর মত, তাতে কোনো দুঃখ নেই, কারণ তাতেও সে হারাবে না কোনোদিন, যে আছে বাংলার প্রতিবেসে প্রতিবেশী হয়ে। আমি লক্ষ্য করে দেখলাম–একজন মানুষ আরেকজন মানুষের প্রতিবেশী ছাড়া কিছু নয়। আমি মন ভরে দেখলাম, একটি গাছ আরেকটি গাছের প্রতিবেশী ছাড়া কিছু নয়। আমি তাকিয়ে দেখলাম, বাগানের একটি পাখিও আরেকটি পাখির প্রতিবেশী ছাড়া কিছু নয়। আমি মন দিয়ে দেখলাম, পৃথিবীর যাবতীয় বিষয় আর সম্পর্ক কোনো না কোনোভাবে এক একজন আর একজনের প্রতিবেশী ছাড়া কিছু নয়। সেখানে হয়তো সম্পর্কের তারতম্য আছে, ছন্দের মত রীতি-পরীমিতি আছে, ছন্দভাঙ্গার ছন্দ আছে, অসীমের কাছে আসার বাসনা আছে, সসীমে মিলিয়ে যাওয়ার বেদনা আছে। চোখের পরিসরে তাকিয়ে দেখা দিগন্তের মত পরিসীমা আছে। যেমন আছে জীবনের, রয়েছে কবিতার।
ফলে, পৃথিবীর সকল অভিনিবেশিই আমাদের প্রতিবেশী–হোক তা জ্ঞানে বা বিজ্ঞানে, হোক তা ছন্দে, দ্বন্দ্বে অথবা উৎপ্রেক্ষায়। কখনও কখনও হতে পারে তা মোটামুটি মূর্খতায়। ছন্দ যেমন কবিতার প্রতিবেশী, দ্বন্দ্ব তেমন চিরকাল জ্ঞানান্বেষী। আবার প্রেম যেমন চিরকাল আগ্রাসী প্রতিবেশী, অপ্রেমও হবে না চরণদাসী।
একটি মধুর জীবন রচনা করেও আমরা ওই পুকুরের নীড়ে কলমীদামের মত পা ধুইয়ে চলে যেতে চাই। আসলে আমাদের কোনো প্রতিবেশী চলে না যাক, এটা কিন্তু আমরা সরলন্তকরণে চাই। সকলে হয়তো মুখ ফুটে বলতে পারে না, তাই হয়তো এখনও কবি সেই অস্ফুট মুখের ভাষার প্রতিবেশী হতে চেয়ে কবিতার জন্ম দেয়। এখনও হয়তো একজন কবি ম্লানমুখের ভাষার জন্য কবিতা হতে চায়। এখনও হয়তো একজন যে পৃথিবীর সকল সীমান্তে হত্যা বন্ধ করতে যায়। এখনও হয়তো একজন কোথাও না কোথাও জন্মায় যে, নো ম্যানস ল্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা দেশহীন একটি শিশুর জন্য, একটি কবিতার জন্য সকল কানুনকে উপেক্ষা শেখায়! এই উপেক্ষা শেখানোর নাম প্রতিবেশী। এই ছন্দ ভাঙ্গার নাম– স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতিবেশী।
মানুষ আসলে আজন্ম প্রেয়সী। একটি দারুণ কবিতার মত; যে অন্ধ চোখে দেখতে পায় না, কিন্তু প্রত্যক্ষ করতে চায়। যে পঙ্গু চলাচল করতে পারে না, অথচ যে চলাফেরা করতে চায়; এমনই ব্যথার কবিতা যে বুকে ধারণ করে– সে উভয়ের প্রতিবেশী! তাবৎ পৃথিবী তাঁর নাম দিয়েছে–কবি।
- বিষয় :
- গল্প
