ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬

কবিতার প্রতিবেশী

অনুভূতির মা যে এখন কোথায়

অনুভূতির মা যে এখন কোথায়
×

প্রচ্ছদ :: আনিসুজ্জামান সোহেল

টোকন ঠাকুর

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২০ | আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

হাঁটতে হাঁটতে হরিণাকুণ্ডুর দিকে যাওয়ার রাস্তা ছিল সেইটা, যে-পথে আমি মামাবাড়ি যেতাম। ঠিক হরিণাকুণ্ডু নয়, হরিণাকুণ্ড থানার একটি গ্রাম ভায়না, সেই ভায়নাই আমার মামাবাড়ি। শৈলকূপা থানার গাড়াগঞ্জ বাজারের পাশে, কুমার নদের ধারে, গ্রাম মধুপুর, সেই মধুপুরেই আমার পৈতৃক নিবাস। মাঝেমধ্যেই মধুপুর থেকে ভায়নায় যাওয়া, ভায়না থেকে মধুপুরে আসা– এই আসা–যাওয়ার মাঝে যা যা ছিল, যা যা তখন আমি দেখতে পেতাম, তার সব কি আজ মনে আছে? মাটির রাস্তা, গরুর গাড়ির ধুলো উড়িয়ে যাওয়া, রাস্তার দু’পাশে মাঠের পরে মাঠ। মাঠ পেরুলেই গ্রাম। সে সব গ্রামের কী নাম? সুগ্রীবপুর, মাইলমারি, পিয়ারাপুর বা বাগ-আঁচড়া; রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গেছি, এসেছি। কোনো দিন ঝড়বৃষ্টি নেমে এলে রাস্তার ধারের কোনো বাড়িতে আকস্মিক আশ্রয় নিয়েছি। এ বাদে এসব গ্রামে তো আমার যাওয়া হয়নি, ওসব গ্রামের কারও সঙ্গে কোনো কথাও হয়নি কোনো দিন। কিন্তু এ কথা তো ঠিক, ওসব গ্রামে যারা বাস করত, তারাও মানুষ। তাদের বাড়িতেও আমার বয়সী ছেল বা মেয়েরা ছিল। কারোর বাড়ির উঠানের কোণে একটি ডালিম গাছ বা পেয়ারা গাছ  ছিল, কুয়া ছিল, কারোর বাড়িতে ঢুকতেই পাতাবাহারের বাগান ছিল, গোলাপ বা গাঁদা ফুলের গাছ ছিল, কারও বাড়ির বাইরে বা পেছনে ছিল বিরাট পুকুর, গরু ভরা গোয়াল ছিল, সন্ধের বাঁশবাগানে কিচিরমিচির ছিল, ছিল কিম্বা আজও আছে বা নেই হয়ে গেছে– কিছুই তো জানি না এখন। তখনও জানতাম না। কিন্তু রাজাপুর, ত্রিবেণী, যোগীপাড়া, রামচন্দ্রপুর, পাখিমারা, শেখপাড়া– কত  যে ছিল একেকটি ক্ষেত-ফসলের মাঠের ওপারেই– আমার কিশোরবেলায় দিনে মামাবাড়িতে যেতে যেতে ভাবতাম। ভাবতাম, আমার কোনো দিন  যাওয়া হবে না বা দেখা হবে না বা কথা হবে না তাদের সঙ্গে, সেই না দেখা হওয়া, না কথা হওয়া মানুষের কথা ভেবে, একটা মায়া তৈরি হতো মনে। সেই মায়া বিয়োগান্তক।
এমন কি পরে, ট্রেনে বা বাসে কোথাও যেতে যেতেও রাস্তা বা ট্রেন লাইনের দু’পাশে, দূরে– অনতিদূরে গ্রাম দেখি, ছোট্ট বাজারঘাট দেখি, শহর দেখি, নদী দেখি, নৌকা দেখি, মাঠে চাষাবাদের মানুষ ও গরুগুলোকে দেখি, টেলিগ্রাফের তারে বসে থাকা পাখি দেখি, ওসব পাখির বাড়ি কোথায়? কোন গাছ-বাগান থেকে তারা উড়ে এসে বসে টেলিগ্রাফের তারে বা মাঠে আলপথের ওপর? পানের বরজের পাশ দিয়ে যে শেয়াল দৌড় দিল, সেই শেয়ালের আত্মীয়স্বজন বলে কিছু আছে? দূরে মাঠ-দিগন্তের বিভ্রম, সেও এক মায়া। সেই মায়া বিয়োগান্তক।
লাইনে থাকতেই যে মেয়েটি আত্মহত্যা করে মরে গেল, শেখপাড়া বাজারের কিছু দূরে, কেন সে আত্মহত্যা করেছিল? নিখাদ প্রেমে। সেই আত্মহত্যাকারী মেয়েটির কবরের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল, মেয়েটি তো দশম শ্রেণিতেই উঠবে না আর। এক ধরনের শিরশির অনুভূতিতে আক্রান্ত হলাম। এ কথাও মনে হচ্ছিল, কোনো দিন আমি ওই মেয়েটিকে ভুলতে পারব না। সে আজও ভুলিনি। ভুলিনি বলেই  উঠে এলো লেখার মধ্যে। মেয়েটি, স্রেফ আবেগে বিষ খেয়ে মরে যাওয়া মেয়েটি তো মাস্ট বি বিয়োগান্তক অধ্যায়।
আমার মনে নেই এমন অনেক কিছু তার থেকেও কিছু কিছু অংশ মনের মধ্যে উঁকি দিয়ে যায় হঠাৎ হঠাৎ, হারিয়ে যাওয়া বাল্যবেলার মতো সব কি হারিয়ে গেল? হারিয়ে কোথায় গেল? যাপিতজীবনই মুখ্য তাহলে? সব হারানোই শেষ পর্যন্ত বিয়োগান্তক উপাদান।
বুকের মধ্যে টনটনে ব্যথা নয়। না, এর জন্য ডাক্তারের কাছে যাওয়া হয় না। ওষুধ খাব না। এই ব্যথা তো শারীরিক নয়। কেন ব্যথা হয়? মানুষ চলে গেলে ব্যথা হয়। পাখি উড়ে গেলে ব্যথা। কথা হারিয়ে গেলে ব্যথা লাগে। এমনকি নিজের অপহৃত যৌবনের জন্যেও ব্যথা লাগে। সব ব্যথা, সব প্রবঞ্চনা বিয়োগান্তক পরিণতির দিকে যায়।
এবং সব বিয়োগান্তক বাস্তবতা একটু একটু করে ফিরে, আসতে চায়। কীভাবে তা ফিরতে পারে আর? দেখি যে কবিতার উপাদান হয়ে ফেরে, ব্যথারা কবিতার প্রতিবেশে বসতি গাড়ে। একটি দুটি শব্দের ভেতর দিয়ে হামাগুড়ি দিতে দিতে বাক্য হয়ে ওঠে। সেই বাক্য পৌঁছুতে চায় পাঠকের কাছে। একেকজন পাঠক তার অভিজ্ঞতা দিয়ে তার তার মতো করে অনুভব করে। কেউ তাকে কবিতা বলেত পারে, কেউ না-ও বলেত পারে। কিছু বলায় না-বলায় তেমন কিছু যায় আসে না। শুধু সময় বয়ে যায়, নদী চলে যায়, বছরের পর বছর ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে চলে। আমরা ক্রমাগত হারিয়ে দেখতে থাকি। যা কিছু হারায়, হারিয়ে যায় কোথায়? কোন প্রতিবেশে তা জমা হয়? সব কি জমা হয়? নাকি ব্যথারাও নির্বাচিত হতে থাকে? ব্যথারাও নির্বাচিত হয়ে আসে। কোথায় আসে?
হয়তো কবিতায় আসে। গল্পে আসে। ছবিতে আসে। গানে গানে ফেরে। আসে বা ফেরে– কোথায়?
অনূভূতির সাত মহলজুড়ে তারা অবস্থান নেয়? কী করে জানব? সব জানা তো আমার একার পক্ষে সময় নয়, তাই না?
তো যে কথা হচ্ছিল, কী কথা হচ্ছিল? কথা হচ্ছিল, কীভাবে একেকটি শব্দ ধারণ করে রাখে তাপমাত্রা, যেমন– জ্বর একটি শব্দ। জ্বল বললেই তার একটি তাপমাত্রা আমরা টের পেতে শুরু করি। ঘর বললে বুঝি, ফেরার গল্প বা ফিরে আসার গল্প। বর বললে কী বুঝি? মর বললে কী বুঝি? মর্মর বললে, তাই কি বুঝি? জর্জর বললে? চূড়া বললে যা বুঝি, পাদদেশ বললে চূড়া থেকে একেবারে নিচে নামতে হবে। ব্যথা বললে কী বুঝব তবে? কী বুঝব আমি, কী বুঝবেন আপনি? তো একেকটি শব্দ তার নিজস্ব তাপমাত্রা অনুযায়ী অবস্থান নিয়ে পাশাপাশি বসতে থাকে। 


বাক্য হয়ে ওঠে। একেকটি বাক্য কিছু দূর এগিয়ে যায়, তার পর একটু থামে। বাক্য ফিরে আসে। বাক্য আবার শুরু হয়। কিছু বাক্য সংঘবদ্ধ হয়ে একটি কবিতা হতে চায়। কবিতা কি হয়? হয় কী হয় না, সেই ভাবনা যার যার মতো। চাপিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। কেউ প্রশ্ন করতেই পারে, ‘মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়।’ কোথায় উড়ে যায়? প্রকৃত সারস কি রকম পাখি? কেউ ভাবতেই পারে, এর কোনো মানে নেই। এর কোনো মানে নেই বলতে, এ রকম বাক্যের কোনো মানে নেই। মানে থাকতে পারে, না-ও পারে। এই যে মানুষ জন্মাচ্ছে, শিশুকাল-বাল্যকাল পার হয়ে যৌবনে পৌঁছুচ্ছে। পৌঢ় হচ্ছে। বৃদ্ধ হচ্ছে। মারা যাচ্ছে। মধ্যে সংসার ধর্ম-কর্ম, চাকরি-বাকরি– কৃষিকাজ, লেখালেখি করেও মানুষ মারা যাচ্ছে। এরইবা কী মানে আছে?
মানে হয়তো আছে। নইলে এত মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম এসব করে যাচ্ছে কী করে? মানে হয়তো আছে। মানে হয়তো নেই। এভাবেই চলছে। এভাবে চলা-বলার নাম জীবন। এই পর্যায়ে একটি লোকগীতি বাজানো যেতে পারে, ও জীবন জীবন রে ... একবার ছাড়িয়া গেলে– এ রকম আর কি! 
হ্যাঁ, অনুভূতির মা আমার কবিতায় প্রতিবেশী। তাকে নিয়ে যেমন কবিতা লিখেছি, গদ্যও লিখেছি। লিখিনি ততটা, বলা চলে, লিখতেও পারিনি ততটা, যতটা, লেখার ছিল, যতটা ভেবেছি, তার দশভাগের একভাগ লিখতে পারিনি। পাঁজরে যত বুদ্বুদ জন্মেছে, তার কিছুই তো লিখতে পারিনি। সেই মামাবাড়ি যাওয়ার পথে যত ধুলো উড়তে দেখেছি মাটির রাস্তায়, যত রোদ– ঢিলিমিলি ছিল, সবই তো আমার অভিজ্ঞানের প্রতিবেশ, সেই প্রতিবেশের সবকিছু তো ধরতে পারলাম না। অর্থাৎ, না পারাই বেশি, পারা আর কতটুকু?
শেষ করি একটি কবিতা দিয়ে। কবিতার নাম– পোকা ও প্রজাপতির গল্প। 

এখনও কবিতা পড়ো মানে তুমি মনে মনে ভাবো 
আচমকা এক ফুরফুরে বিকেলে প্রজাপতি সম্মেলন হবে। 
সেই সম্মেলনে তুমি স্বাগতিক, তোমার বাস্তবতা থাকবে
তুমি ফুলদের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে করতে 
ঘাসের বক্তব্য শুনতে শুনতে হয়তোবা ভুলে যাবে 
একজন কবি এসে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে দেখছে– 
পোকা থেকে তুমি প্রজাপতি হয়ে কতটা বদলে গেলে?

এখানে কবিতা শেষ হয় মানে সেই লোকটিই কবি– যে কিনা পোকা হতে পারেনি বলেই প্রজাপতি হতে পারছে না ... 

আরও পড়ুন

×