ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

ডাহুকপাঁচালি

ডাহুকপাঁচালি
×

ডাহুকের লড়াই ছবি :: লেখক

সরওয়ার পাঠান

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

শৈশবে ডাহুক পাখিবিষয়ক একটি ঘটনা আমাকে বেশ অবাক করত। বাড়ির পাশেই চরসিন্দুর বাজার। হাট বসত মঙ্গলবার আর শুক্রবারে। প্রায় সময় কিছু মানুষ খাঁচাবন্দি ডাহুক পাখি নিয়ে বাজারে আসত। তারা পাখিটিকে নিয়ে বাজারের বিভিন্ন স্থানে ঘোরাফেরার পাশাপাশি সদাই করে বেড়াত। আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল, আসলে ঘটনা কী? পরে জানতে পারি ওরা ডাহুক শিকারি। কম বয়সী ডাহুক পাখিকে বাজারে আনা হতো মূলত মানুষ সম্পর্কে ভয় কাটানোর জন্য। শিকারিদের এই মনস্তাত্ত্বিক ভাবনায় আমি বেশ আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম, বনের পাখিকে মানব সমাজে মানিয়ে নেওয়ার কী আশ্চর্য কৌশল!
ডাহুকের ইংরেজি নাম White breasted waterhen এবং এর বৈজ্ঞানিক নাম Amauromis phooniurs. এই পাখি আকারে ছোট মুরগির মতো। স্লেট পাথরের মতো পিঠ ও পাখার রং, মুখ-বুক-পেট সাদা। এদের কপালে রয়েছে লাল রঙের সুদৃশ্য তিলকের মতো একটি সুন্দর অংশ। স্ত্রী এবং পুরুষ ডাহুক দেখতে প্রায় একই রকম। তবে পুরুষ ডাহুকটি স্ত্রীর চাইতে আকারে কিছুটা বড়। জলজ উদ্ভিদ বা ঝোপ-ঝাড়ের পাশে যখন ডাহুকেরা ঘুরে বেড়ায় তখন দেখলেই বোঝা যায় এরা সদাকর্ম চঞ্চল পাখি। চলার সময় এদের ছোট্ট লেজটি তালে তালে ওঠানামা করতে থাকে, এটি ওদের প্রজাতির এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
চৈত্র মাসের প্রথম দিক থেকেই এরা বাসা বানানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যেসব জলাভূমিতে তারা বিচরণ করে তার পাশেই ঝোপের ভেতর ছোট গাছের ডালে বা বাঁশঝাড়ে বাসা তৈরি করে থাকে। বাসা তৈরির উপকরণ প্রধানত শুকনো ঘাস, পাটের আঁশ, শ্যাওলা ইত্যাদি। বাসা তৈরির সময় স্ত্রী এবং পুরুষ পাখি একসঙ্গে মিলে কাজ করে থাকে। একটি বাসাকে পরিপূর্ণ রূপ দান করতে একজোড়া ডাহুককে কমপক্ষে সাত দিন কাজ করতে হয়। বাসা তৈরির কাজ শেষ হওয়ার পর স্ত্রী পাখিটি ডিম পাড়তে শুরু করে। ডিমের সংখ্যা সাধারণত ছয় থেকে আটটি পর্যন্ত হয়ে থাকে। ডিমের আকার অনেকটা কবুতরের ডিমের মতো। ডিমগুলো একটু লম্বাটে ধরনের, রং হালকা হলুদ। ডাহুকের ডিমের একটি অংশ জুড়ে থাকে লাল রঙের ফোঁটা ফোঁটা দাগ। ডিম পাড়ার পর থেকে ডাহুক সারারাত ধরে একটানা কো-আ, কো-আ স্বরে ডাকতে থাকে। তাদের তীব্র স্বরের একটানা এই ডাক নিয়ে গ্রামবাংলায় নানা ধরনের গল্পকথা ছড়িয়ে আছে। এখনও গ্রামের অনেক মানুষ এটি বিশ্বাস করে, তীব্র স্বরে ডাকতে ডাকতে একসময় ডাহুকের গলা দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে। সেই রক্ত ডিমের ওপর গিয়ে পড়লে তবেই ডিম ফুটে বাচ্চা বেরিয়ে আসে। 
এসব ভ্রান্ত ধারণা। অনেকে ডিম ফোটার পর পরিত্যক্ত খোসার মধ্যে লাল ছিট দেখে এখনও এসব বিশ্বাস করে। ২৩ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে ডাহুকের ডিম ফোটে। সদ্য ডিম ফোটা বাচ্চাগুলোর দেহের রং কুচকুচে কালো। জন্মের দুই-এক দিনের মধ্যেই বাচ্চারা বাসা ছাড়ে। এরা খুবই চালাক আর চটপটে। শৈশবে কতবার যে ওদের পিছু নিয়েছি! ধরতে পারিনি কোনো বার। আসলে ডাহুকের বাচ্চারা বিপদের আভাস পেলে খুব দ্রুত লুকিয়ে পড়তে পারে। তাই মানুষ কিংবা শিকারিপ্রাণীর পক্ষে ওদের নাগাল পাওয়া কঠিন। নিজেদের রক্ষা করার কৌশল প্রকৃতি ওদের শিখিয়ে দিয়েছে। একসময় বাংলাদেশের এমন কোনো গ্রাম ছিল না যেখানে দু’একজন ডাহুক শিকারি পাওয়া যেত না। কেউ আবার বংশ পরম্পরায় এই কাজে নিয়োজিত ছিল। আমাদের গ্রামে ছিল রাজ্জাক মিয়া আর ভিকচান মেম্বার। শৈশব- কৈশোরে আমি বহুবার তাদের সঙ্গে ডাহুক শিকারে গিয়েছি। এসব শিকারি শিকারের কাজের জন্য প্রথমে ডাহুকের বাসা থেকে ডিম সংগ্রহ করে নিয়ে আনত। তারপর সেই ডিম নিজের পেটে তুলো দিয়ে কাপড়ের সাহায্যে বেঁধে রাখত। একমাত্র গোসল করার সময় বাদে সব সময় পেটে বাঁধা থাকত সেই ডিম। তারপর এক সময় ডিম ফুটে বাচ্চা বেরিয়ে আসত। বাচ্চাটিকে লালন-পালন করে বড় হওয়ার পর ডাক শিখলে তাকে শিকারের কাজে ব্যবহার করা হতো। একথা অনেকেরই অজানা, ডাহুক আসলে খুবই লড়াইপ্রিয় পাখি। বিশেষ করে প্রজনন মৌসুমে একটি পুরুষের সীমানায় কোনো মতে যদি আরেকটি ডাহুক ডেকে ওঠে, তবে শুরু হয়ে যায় দারুণ লড়াই। শিকারিরা এই সুযোগটাই কাজে লাগাত। বুনো ডাহুকের অবস্থানের কাছাকাছি রেখে দেওয়া হতো খাঁচাবন্দি পোষা ডাহুক, তিন পাশে পেতে রাখা হতো ত্রিকোনাকৃতির ফাঁদ। পোষা ডাহুক ডেকে উঠলেই বুনো ডাহুক ছুটে আসত খাঁচা লক্ষ্য করে। কাছাকাছি আসার সঙ্গে সঙ্গেই সে ফাঁদে আটকা পড়ে যেত। কখনও কখনও শিকার করা ডাহুক বাজারে বিক্রি করে দিত এই শিকারিরা।
বুনো ডাহুক জোড়া যখন প্রকৃতির বুকে লড়াইয়ে মেতে ওঠে তখন এক অসাধারণ দৃশ্যের অবতারণা হয়। এই যুদ্ধে ওরা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে থাকে তাদের পায়ের নখ। স্থানীয় ভাষায় তাদের পায়ের নখের এই যুদ্ধকে বলা হয় ‘চঙ্গল’। দুই ডাহুক চঙ্গলে লিপ্ত হলে, টেক-টেক শব্দ করে ওঠে। এদের এই যুদ্ধ এতটাই প্রবল, মাঝেমধ্যে নখ পরস্পরের শরীরে এত শক্তভাবে আটকে যায় যে নিজেরাও খুলতে পারে না। তখন মানুষ ইচ্ছে করলে দৌড়ে গিয়ে ওদের ধরে ফেলতে পারে।
বিগত সময়ে পরিবেশ বিপর্যয় থেকে শুরু করে, অবাধ শিকার, জলাভূমি ভরাট, প্রাকৃতিক জলাশয় পরিষ্কার করে মাছের খামার তৈরি করা ইত্যাদি কারণে ডাহুকের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন ২০১২ প্রণীত হওয়ার পর এবং এয়ার গান নিষিদ্ধ, কিছু বন্যপ্রাণী সুরক্ষা সংগঠনের ব্যাপক প্রচারণা এবং পরিবেশবাদীদের তৎপরতার ফলে ডাহুক আবার প্রকৃতিতে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে শুরু করে। দেশের অনেক স্থানেই এখন তাদের দেখা যায়। বলতে গেলে পাখিদের এই বিপন্ন সময়ে ডাহুক নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে শুরু করেছে। তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, দেশে এমন কিছু জায়গা আছে; যেখানে কখনোই আর ডাহুক পাখির ডাক শোনা যাবে না। 
এখানে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করলেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যাবে। ২০০১ সালে আমার বসবাস ছিল রাজধানীর গুলবাগের ২৮৭ নম্বর বাড়ির চার তলায়। বাড়ির উত্তর-পূর্বকোণে কচুরিপানা আর জলজ উদ্ভিদসমৃদ্ধ একটি ডোবা ছিল। সন্ধ্যার পর আমি যখন লিখতে বসতাম ডাহুকটি ডাকাডাকি শুরু করত। রাতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে যেত তার ডাক। চারপাশে বহুতল ভবন, নানাবিধ শহুরে যান্ত্রিক শব্দ, বিজলী বাতির আলো, পরিবেশটা আমার কাছে খুবই বিকৃত লাগত। খুব কষ্ট হতো ডাহুকের জন্য। দিনের বেলায় ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখি সে নিঃসঙ্গ। অথচ বৈশাখ মাস সমাগত, তার সঙ্গিনী থাকার কথা ছিল। প্রতি রাতে করুণ সুরে ডাকে নিঃসঙ্গ ডাহুক, প্রতিটি আওয়াজ আমার হৃদয়ে এসে আঘাত করে। আমি বুঝতে পারি সে হচ্ছে এই এলাকার সর্বশেষ ডাহুক পাখি। 
একের পর এক অট্টালিকার ধাবমান আগ্রাসনে বিলীন হয়েছে ওদের বসবাসের ঠিকানা, প্রজনন স্থান আর খাদ্যভান্ডার। বহু বছর হয়ে গেছে তবু সেই নিঃসঙ্গ ডাহুকের করুণ কান্না এখনও আমার মরমে গাঁথা আছে।
এক সকালে দেখলাম একের পর এক বালুভর্তি ট্রাক আনলোড করা হচ্ছে সেই ছোট্ট ডোবার বুকে। দেখতে দেখতে গুলবাগের সর্বশেষ ডাহুকটির শেষ ঠিকানা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল মানুষের আগ্রাসনে। 
বহু ডাহুকের ঠিকানা কেড়ে গড়ে উঠেছে আধুনিক শহর। এই ইটের শহর, লোহার পিঞ্জর, ঢালাইয়ের প্রান্তরে হয়তো কোনদিন আর ফিরে আসবে না ডাহুক। 

আরও পড়ুন

×