সবুজের আবাস
নগরজীবনে দুদণ্ড শান্তির খোঁজে অনেকেই এখন নাগরিক সাজে সবুজায়নকে আত্তীকরণ করে নিচ্ছে
সাজিদা ইসলাম পারুল
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৪৬ | আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০২৫ | ২০:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকা শহর এখন কংক্রিটের এক জঙ্গল। প্রতিদিন বেড়ে ওঠা এই নগরে হাঁপিয়ে উঠছে মানুষ। ইট, কাঠ, পাথর, লোহা আর যানজটের মধ্যে বদ্ধ হয়ে পড়ছে শ্বাস-প্রশ্বাস; হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ। দ্রুতবর্ধনশীল এই নগরে একদিকে বহুতল ভবনের চাপ, অন্যদিকে কমতে থাকা খোলা জায়গা– এই বৈপরীত্য আজ বড় সংকট তৈরি করেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে মাথাপিছু খোলা জায়গার পরিমাণ বর্তমানে মাত্র ১.৫ বর্গমিটার, যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ হলো অন্তত ৯ বর্গমিটার। এই ঘাটতি সরাসরি প্রভাব ফেলছে নাগরিকদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে।
পরিবেশবিদ আবু নাছের বলেন, ‘শহরে সবুজ মানে শুধু গাছ নয়, এর সঙ্গে জড়িত মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার। দূষণ কমাতে, বায়ু পরিষ্কার রাখতে, এমনকি নাগরিকদের মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করতে নগরে সবুজায়নের বিকল্প নেই।’
এদিকে, সবুজায়নে সিঙ্গাপুর একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। শহরটি ‘গার্ডেন সিটি’ থেকে এখন ‘সিটি ইন আ গার্ডেন’-এ রূপান্তর হয়েছে। প্রতিটি নতুন বহুতল ভবনের জন্য সবুজ ছাদ বা উল্লম্ব বাগান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে শহরে একদিকে যেমন তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে, অন্যদিকে নাগরিকদের জন্য বিনোদনমূলক খোলা জায়গাও তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে ইতালির মিলানে নির্মিত হয়েছে ‘ভার্টিক্যাল ফরেস্ট’। দুটি আবাসিক টাওয়ার, যার বারান্দায় প্রায় ৯০০ গাছ ও ২০ হাজার ঝোপঝাড় রোপণ করা হয়েছে। এতে শুধু অক্সিজেন উৎপাদনই হচ্ছে না, বরং বায়ুদূষণও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
বাংলাদেশে সরকারি নীতিমালায় নতুন বহুতল ভবনে নির্দিষ্ট পরিমাণ সবুজায়ন বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, নগরের প্রতিটি ওয়ার্ডে ছোট ছোট সবুজ পার্ক, স্কুল-কলেজে বাধ্যতামূলক বাগান, সরকারি ভবনে উল্লম্ব বাগান– এসব উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে জনগণকেও ছাদবাগান বা আশপাশের খোলা জায়গায় সবুজায়নে উৎসাহী করতে হবে। ঢাকার কিছু এলাকায় ছাদবাগান জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তবে তা এখনও ব্যক্তিগত উদ্যোগে সীমাবদ্ধ।
ঢাকার কোলাহল আর ধুলাবালির শহুরে বাস্তবতায় একটু প্রশান্তির স্বপ্ন দেখেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। সেই স্বপ্নের অনেকটা পূরণের দাবি রাখছে রাজধানীর খিলগাঁও রিয়াজবাগের বিডিডিএল গোল্ড প্যালেস। ভবনটির চত্বরজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে নানা জাতের গাছ– কাঁঠাল, জাম, পেয়ারা, লিচু, বেল, আমলকী, কাঠগোলাপ। ফলমূলের সুবাসে মিশে আছে মাটির গন্ধ।
মোহাম্মদপুরে বায়তুল আমান হাউজিং সোসাইটির ৬ নম্বর রোডের ২১ নম্বর বাড়িটিকে বলা চলে নগরের মাঝেই একটি ছোট্ট সবুজ উদ্যান। এখানে নির্মাণকাজের শুরু থেকেই গাছ লাগানো হয়েছিল। আজ সেসব গাছের উচ্চতা ৪০ থেকে ৫০ ফুট। ভবনের সামনে আর ছাদে রয়েছে দেবদারু, আমড়া, অশোক, নিম, শিউলি, জারুল, কড়ইসহ নানা ধরনের বৃক্ষ।
নগরায়ণ মানে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান– এমনটাই উল্লেখ করেন ভবন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিডিডিএল প্রোপার্টিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ বাতেন খান। তিনি বলেন, ‘শিশুদের যদি চার দেয়ালের ভেতরেই আটকে রাখি, তারা কখনও প্রকৃতির সঙ্গে বড় হতে শিখবে না। তাই আমি চেয়েছি, প্রতিটি বাড়ি যেন হয় একটা ছোট্ট বাগান, যেখানে মানুষ নিঃশ্বাস নিতে পারবে মুক্ত আকাশের নিচে।’
পাবনার এক গ্রামে সবুজের ভেতর কাটানো শৈশবের তাড়নাই তাঁকে পরিবেশবান্ধব নগরায়ণের দিকে পথচলায় প্রেরণা জুগিয়েছে। এম এ বাতেন খান জানান, এখন পর্যন্ত তিনটি আবাসিক প্রকল্পে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ গাছ রোপণ করা হয়েছে। সাভার, গাজীপুর বা নারায়ণগঞ্জে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রিন টাউনশিপ গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর।
- বিষয় :
- নগরায়ণ
- সবুজ প্রকল্প
