ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আমাজনে আরও ১০ আদিবাসী অঞ্চল

আমাজনে আরও ১০ আদিবাসী অঞ্চল
×

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫৩ | আপডেট: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | ২১:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩০ চলাকালে প্রচণ্ড বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের মুখে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিলেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। সম্মেলনের আয়োজক দেশ হিসেবে ব্রাজিল সরকার ১০টি নতুন আদিবাসী অঞ্চলের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে।

এই স্বীকৃতির ফলে ব্রাজিলের আইন অনুযায়ী, এখন থেকে ওই অঞ্চলগুলোর সংস্কৃতি ও পরিবেশ কঠোর আইনি সুরক্ষার আওতায় আসবে–যদিও অতীতে এ আইনের প্রয়োগ নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল। নতুন ঘোষিত এ অঞ্চলগুলোর একটি অংশ বিশ্বের ফুসফুসখ্যাত আমাজন রেইনফরেস্টের অন্তর্ভুক্ত। প্রেসিডেন্ট লুলা গত বছরও একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তখন তাঁর সরকার ১১টি আদিবাসী অঞ্চলকে আইনি বৈধতা দিয়েছিল।

ব্রাজিল সরকারের এ ঘোষণাকে উষ্ণ স্বাগত জানিয়েছেন ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক’ (সিএএন) এবং স্থানীয় আদিবাসী প্রতিনিধিরা। ‘আর্টিকুলেশন অব ইন্ডেজেনাস পিপলস অব ব্রাজিল’-এর (এপিআইবি) সদস্য দিনামাম টুক্সু কপ-৩০ সম্মেলনে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বলেন, ‘ব্রাজিলের প্রতিটি আদিবাসী অঞ্চলের স্বীকৃতিই আমাদের জন্য আনন্দের এবং উৎসবের উপলক্ষ।’ প্রেসিডেন্টের বিশেষ ডিক্রির মাধ্যমে এ উদ্যোগ শিগগিরই আইনি রূপ পাবে।

তবে টুক্সু জানান, এপিআইবি চায় আরও বেশি জমিকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হোক, যাতে আদিবাসী গোষ্ঠীগুলো তাদের নিজস্ব সীমানার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আদিবাসী জনগণই আজ বিশ্বের ৮২ শতাংশ জীববৈচিত্র্য রক্ষা করছে। যখন আদিবাসী জমির সীমানা নির্ধারণ করা হয়, তখন সেই অঞ্চলের সুরক্ষাও নিশ্চিত হয়। আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী জীবনধারাই প্রকৃতিকে রক্ষা করে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবিলায় ভূমিকা রাখে। দিনশেষে এর সুফল পুরো মানবজাতিই ভোগ করে।’

ভূমি ও বন রক্ষা করতে গিয়ে আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোকে প্রায়ই পশুপালক, খনি শ্রমিক বা অবৈধ কাঠ পাচারকারীদের হামলার শিকার হতে হয়। সম্প্রতি দক্ষিণ ব্রাজিলের গুয়ারানি কাইয়োয়া সম্প্রদায়ের নেতা ভিসেন্তে ফার্নান্দেস ভিলহালভা (৩৬) এক হামলায় নিহত হন বলে জানিয়েছে ‘সারভাইভাল ইন্টারন্যাশনাল’। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, গত ১৬ নভেম্বর (রোববার) বন্দুকধারীরা গ্রামটি ঘিরে ফেলে এবং তাঁকে মাথায় গুলি করে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং ভূমি অধিকারের দাবিতে ঘটনার পরের দিন জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনের বাইরে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেন। তাদের হাতে ছিল ‘এখনই সীমানা নির্ধারণ চাই’ লেখা প্ল্যাকার্ড। এর আগের সপ্তাহে ‘আমাদের বন বিক্রির জন্য নয়’ স্লোগান নিয়ে আদিবাসী বিক্ষোভকারীরা সম্মেলনস্থলে প্রবেশের চেষ্টা করলে নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সম্মেলনের চারপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নজিরবিহীনভাবে জোরদার করা হয়। মোতায়েন করা হয় সেনা ও পুলিশ। তবে অনেক আদিবাসী গোষ্ঠী অভিযোগ করেছে, তাদের ভেতরে প্রবেশের প্রয়োজনীয় অনুমোদন (অ্যাক্রিডিটেশন) দেওয়া হয়নি।

এত সবের পরও এবারের কপ সম্মেলনে আদিবাসী প্রতিনিধিদের সর্বোচ্চ উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। এপিআইবির ক্লেবার কারিপুনা বলেন, ‘এটি অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। দুই বছরের প্রচেষ্টার পর আমাদের অন্তত ৯০০ জন প্রতিনিধি কপ-এর ভেতরে আছেন, যারা তাদের সম্প্রদায়ের হয়ে কথা বলছেন।’ তবে ২০০টিরও বেশি মানবাধিকার গোষ্ঠী এ অতিরিক্ত কড়াকড়ির নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘকে চিঠি দিয়েছে। তারা বলছে, এটি ভিন্নমত দমন এবং পরিবেশ রক্ষাকারীদের কোণঠাসা করার এক বৈশ্বিক প্রবণতারই বহিঃপ্রকাশ।

অতীতে দেখা গেছে, আদিবাসী সংরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি মিললে সেখানে খনি খনন, গাছ কাটা এবং বাণিজ্যিক কৃষিকাজ নিষিদ্ধ করা হয়, যা বন উজাড় রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
বিভিন্ন পরিবেশবাদী ও আদিবাসী সংগঠনের যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, আদিবাসী অঞ্চলের পরিধি বাড়লে ২০৩০ সালের মধ্যে অতিরিক্ত বন উজাড়ের হার ২০ শতাংশ পর্যন্ত রোধ করা সম্ভব এবং কার্বন নিঃসরণ ২৬ শতাংশ কমতে পারে।

নতুন ঘোষিত এ সংরক্ষিত অঞ্চলগুলো কয়েক লাখ হেক্টরজুড়ে বিস্তৃত। এখানে মুরা, টুপিনাম্বা ডি অলিভেন্সা, পাতাখো, গুয়ারানি-কাইয়োয়া, মুন্ডুরুকু, পাঙ্কারা এবং গুয়ারানি-ম্বিয়া সম্প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষ বসবাস করেন। এর মধ্যে একটি অঞ্চল আমাজন ন্যাশনাল পার্কের ৭৮ শতাংশেরও বেশি এলাকাজুড়ে রয়েছে, যা বৈশ্বিক জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাজিল সরকারের এ ঘোষণাটি কপ-৩০ সম্মেলনের ‘আদিবাসী দিবস’-এ দেওয়া হয়।

বামপন্থি নেতা লুলা পুনরায় ক্ষমতায় আসার আগে ২০১৮ সাল থেকে কট্টর ডানপন্থি জাইর বলসোনারোর শাসনামলে নতুন কোনো আদিবাসী জমি ঘোষিত হয়নি। উল্টো বলসোনারো আদিবাসী জমিতে খনি উত্তোলনে উৎসাহ জুগিয়েছিলেন। লুলার সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে অবৈধ খনি শ্রমিকদের উচ্ছেদসহ বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বর্তমানে ব্রাজিলের ১১৭.৪ মিলিয়ন হেক্টর জমি আদিবাসী অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃত; যা কলম্বিয়ার মোট আয়তনের সমান এবং ব্রাজিলের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১৩.৮ শতাংশ।

জীবাশ্ম জ্বালানি এবং বন উজাড়ের ফলে সৃষ্ট কার্বন নিঃসরণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ। কপ-৩০ সম্মেলনে বিশ্বনেতারা একত্র হয়েছেন বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নিয়ে। বিজ্ঞানীদের মতে, তাপমাত্রা ২ সেলসিয়াসের বেশি বাড়লে তা মানবজাতি ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে।

আরও পড়ুন

×