ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

বিশেষজ্ঞের চোখে

ভেজাল পণ্যের দৌরাত্ম্য কমাতে সমন্বিত উদ্যোগ

ভেজাল পণ্যের দৌরাত্ম্য কমাতে সমন্বিত উদ্যোগ
×

প্রতীকী ছবি

এস ও এম রাশেদুল কাইউম

প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৫৬ | আপডেট: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৬:৫০

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের ভোগ্যপণ্য বাজার গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি, আধুনিক খুচরা বাজারের সম্প্রসারণ ও ই-কমার্সের প্রসার এ খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তবুও এই ইতিবাচক অগ্রগতির পাশাপাশি একটি বড় হুমকি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে–ভেজাল, নকল ও অবৈধ পণ্যের বিস্তার। দ্য অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন’স ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অফিসের (ইইউআইপিও) ২০১৬ সালের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বৈশ্বিকভাবে প্রায় অর্ধ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের আমদানিকৃত ভেজাল ও নকল পণ্যের বাজার রয়েছে। ২০২১ সালের ওইসিডির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, নকল পণ্যের বৈশ্বিক ব্যবসার আকার প্রায় ৪৬৭ বিলিয়ন ইউএস ডলার। পরে বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ও ট্রেডমার্ক সুরক্ষাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান কোরসার্চ ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এই বাজারের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াতে পারে প্রায় ১.৭৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সমস্যাটি আরও গভীর। এফএমসিজি বা দ্রুতগতির ভোগ্যপণ্য খাতের বাজারমূল্য আনুমানিক ৫০ হাজার কোটি টাকা; যার মধ্যে প্রায় দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকার পণ্য ভেজাল বা অবৈধভাবে বাজারে প্রবেশ করছে। এর ফলে সরকার প্রতিবছর ৩৭৫ থেকে ৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে এবং ভোক্তার আস্থা ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়ছে। 

অবৈধ পণ্যের প্রকৃতি বহুমাত্রিক। এর মধ্যে রয়েছে কাউন্টারফিট বা হুবহু নকল, লুক-এ-লাইক বা আসলের মতো দেখতে প্রতারণামূলক পণ্য, রিফিল বা আসল কনটেইনারে ভরা নিম্নমানের পণ্য এবং গ্রে প্রোডাক্ট বা অবৈধ আমদানি ও কিছু ক্ষেত্রে চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করা পণ্য। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিদেশ থেকে লেবেলবিহীন বোতল এনে দেশে নকল পণ্য তৈরি করে বোতলজাত করা হয়। সাধারণ ভোক্তার জন্য তা চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব। কখনও সামান্য বানান ভুল, প্যাকেটের সূক্ষ্ম পার্থক্য কিংবা রঙের ভিন্নতাই হয় একমাত্র ইঙ্গিত। অথচ ভোক্তা অজান্তেই এসব নিম্নমানের ও ক্ষতিকর পণ্য ব্যবহার করছেন, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে।

বাংলাদেশে আইনগত কাঠামো যথেষ্ট শক্তিশালী। আমাদের হাতে রয়েছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯, ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন ২০০৯, কাস্টমস আইন ২০২৩, মেধাস্বত্ব বলবৎকরণ (আমদানি ও রপ্তানি) বিধিমালা ২০১৯, আমদানি নীতি আদেশ ২০২১-২৪ এবং পেনাল কোড ১৮৯৮-এর মতো কার্যকর আইন ও নীতিমালা। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস ও টেস্টিং ইনস্টিটিউট, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তর, শুল্ক ও ভ্যাট কর্তৃপক্ষ, পুলিশ, র‍্যাব এবং বিজিবির সহযোগিতায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের ফলে অনেক কারখানা বন্ধ হয়েছে। তবে বাস্তব চ্যালেঞ্জ হলো–আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তির অভাব।

অবৈধ ও নকল পণ্য রোধে আমদানি পর্যায় থেকেই সতর্কতা প্রয়োজন। কাস্টমস পর্যায়ে প্রযুক্তিনির্ভর স্ক্রিনিং ব্যবস্থা চালু করা হলে এবং ব্র্যান্ড ঘোষণাবিহীন মিশ্র পণ্য চালান পরিপূর্ণ স্ক্রিনিং করা হলে সন্দেহজনক চালান দ্রুত শনাক্ত করা যাবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

প্রযুক্তিই হতে পারে এই যুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর গেম চেঞ্জার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত ইমেজ রিকগনিশন প্রযুক্তি আসল ও নকল পণ্যের সূক্ষ্ম পার্থক্যও নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম। শক্তিশালী ডকুমেন্টেশন ও ট্রেসেবিলিটি সিস্টেম পণ্যের উৎস থেকে বাজার পর্যন্ত পুরো যাত্রাপথ পর্যবেক্ষণ করে, যা তদন্ত প্রক্রিয়াকে সহজ করে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে সহায়ক হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কাস্টমস নেটওয়ার্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতাও অপরিহার্য, যাতে বৈশ্বিকভাবে বিস্তৃত অপরাধচক্রকে কার্যকরভাবে ভেঙে দেওয়া যায়। 

বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মালিকদেরও এই বিষয়ে ভোক্তার জন্য প্রয়োজনীয় সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো প্রয়োজন; যার মাধ্যমে ভোক্তা আসল ও নকল পণ্যের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারে এবং নকল পণ্যের গ্রাস থেকে নিজেকে ও নিজের পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে শিল্প খাতের দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউনিলিভার বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে নকল ও অবৈধ পণ্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার রয়েছে। তাদের কিছু জনপ্রিয় ব্র্যান্ড অবৈধভাবে আমদানির চেষ্টা হলে কোম্পানিটি হাইকোর্টেও রিট দায়ের করেছিল। বর্তমানে ইউনিলিভার দেশে ৯০ শতাংশের বেশি পণ্য আধুনিক ও টেকসই প্রক্রিয়ায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করে। এতে শুধু মানসম্মত ও নিরাপদ পণ্য নিশ্চিত হয় না, বরং নকল ও অবৈধ পণ্যের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। ভোক্তার আস্থা বজায় রাখতে নিরাপদ ও টেকসই উৎপাদনের এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের শিল্প খাতের জন্য একটি কার্যকর উদাহরণ।

বাংলাদেশের বাজারে গ্রে মার্কেট বা অনানুষ্ঠানিক আমদানির প্রবণতা ভেজাল ও অবৈধ পণ্যের বিস্তারকে আরও ত্বরান্বিত করছে। এসব পণ্য নিয়মিত আমদানি প্রক্রিয়া ও মাননিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে বাজারে প্রবেশ করে। ফলে সরকার রাজস্ব হারায় আর বৈধ ব্যবসাগুলো প্রতিযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভোক্তাও নিম্নমানের বা ক্ষতিকর পণ্য কিনে ফেলেন অজান্তে। এর প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও ভোক্তা আস্থার ওপর। ভেজাল ও অবৈধ পণ্যের বিস্তার রোধ করার মাধ্যমে ভোক্তার আস্থা পুনর্গঠন এবং বাংলাদেশের বাজারকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব। 

লেখক: ব্যারিস্টার, লিগ্যাল ডিরেক্টর ও কোম্পানি

আরও পড়ুন

×