কেন জানুয়ারিতেই আসে নতুন বছর
শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:২১ | আপডেট: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৮:৫০
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঘড়ির কাঁটা যখন রাত ১২টার ঘর ছোঁয়, তখন সারা পৃথিবী মেতে ওঠে আতশবাজি আর উল্লাসে। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে আমরা পদার্পণ করি একটি নতুন বছরে। এই যে ১ জানুয়ারিকে বছরের প্রথম দিন হিসেবে আমরা উদযাপন করি, তা কি সবসময় এমনই ছিল? এর পেছনে কার অবদান সব থেকে বেশি? প্রাচীনকাল থেকেই কি মানুষ এই দিনে নতুন বছর উদযাপন করত?
ইতিহাসের প্রেক্ষাপট: রোমানদের অবদান
নতুন বছর ১ জানুয়ারি শুরু করার কৃতিত্ব মূলত প্রাচীন রোমানদের। আজ থেকে প্রায় ২০০০ বছর আগে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার লক্ষ্য করেন, তৎকালীন রোমান ক্যালেন্ডারটি ত্রুটিপূর্ণ এবং ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে এর মিল নেই। এই বিশৃঙ্খলা দূর করার জন্য তিনি বিজ্ঞানীদের পরামর্শ নেন এবং ৪৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে চালু করেন ‘জুলিয়ান ক্যালেন্ডার’।
জুলিয়াস সিজারই প্রথম সিদ্ধান্ত নেন–বছর শুরু হবে জানুয়ারি মাস থেকে। এ মাসটির নামকরণ করা হয়েছিল রোমান দেবতা ‘জানুস’-এর নামানুসারে। জানুস ছিলেন দুই মুখবিশিষ্ট এক দেবতা। তাঁর একটি মুখ অতীতের দিকে তাকানো আর অন্যটি ভবিষ্যতের দিকে। বছরের শুরুতে মানুষ যেভাবে পেছনের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে তাকাতে চায়, জানুস ছিলেন ঠিক তারই প্রতীক।
পরে ১৫৮২ সালে পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি জুলিয়ান ক্যালেন্ডারকে আরও পরিমার্জন করেন এবং ‘গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডার’ প্রবর্তন করেন। এ ক্যালেন্ডারেই ১ জানুয়ারিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বছরের প্রথম দিন হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা বর্তমানে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত।
কেন অন্য কোনো মাস নয়?
জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিচারে জানুয়ারির শুরুর এ সময়টি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। পৃথিবী এ সময় সূর্যের সব থেকে কাছাকাছি অবস্থানে থাকে। এ ছাড়া উত্তর গোলার্ধে শীতের তীব্রতা কাটিয়ে যখন দিনের দৈর্ঘ্য বাড়তে শুরু করে, তখন থেকেই নতুন শুরুর একটি প্রাকৃতিক সংকেত পাওয়া যায়। প্রাচীন কৃষিপ্রধান সমাজে ফসলের চক্র অনুযায়ী বছরের হিসাব করা হতো, কিন্তু সিজারের সংস্কার এটিকে একটি সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক ও ধর্মীয় রূপ দেয়।
শুনলে অবাক হতে হয়, একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ইংল্যান্ড এবং তার উপনিবেশগুলোয় (এমনকি আমেরিকার একাংশেও) নতুন বছর শুরু হতো ২৫ মার্চ থেকে। একে বলা হতো ‘লেডি ডে’। খ্রিষ্টধর্মীয় বিশ্বাস মতে, এই দিনে দেবদূত গ্যাব্রিয়েল মেরিকে যিশুর আগমনের বার্তা দিয়েছিলেন। ১৭৫১ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এক আইন পাসের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত ১ জানুয়ারিকে বছরের প্রথম দিন হিসেবে গ্রহণ করে।
সৌর বনাম চান্দ্রপঞ্জিকা
আমরা বর্তমানে যে ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকা ব্যবহার করি, তা মূলত সূর্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। কিন্তু অনেক সংস্কৃতি এখনও চান্দ্র ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে। যেমন চীনা নববর্ষ বা লুনার নিউ ইয়ার। এটি প্রতিবছর সাধারণত জানুয়ারির শেষ বা ফেব্রুয়ারির শুরুতে অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৬ সালে চীনা নববর্ষ শুরু হবে ১৭ ফেব্রুয়ারি। এই বৈচিত্র্য প্রমাণ করে মহাবিশ্বের ঘূর্ণনের ওপর ভিত্তি করেই আমাদের সময়ের ধারণা গড়ে উঠেছে।
বিশ্বজুড়ে বিচিত্র সব উৎসব আর ঐতিহ্য
পৃথিবীর একেক প্রান্তে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার পদ্ধতি একেক রকম। কোথাও আছে মজার সব নিয়ম, আবার কোথাও অদ্ভুত সব বিশ্বাস। স্প্যানিশদের একটি মজার ঐতিহ্য হলো, রাত ১২টার ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি ঘণ্টার ধ্বনিতে একটি করে মোট ১২টি আঙুর খাওয়া। যদি কেউ ১২ সেকেন্ডের মধ্যে ১২টি আঙুর খেতে পারেন, তবে মনে করা হয় সামনের ১২টি মাস তাঁর দারুণ কাটবে।
সুইজারল্যান্ডের মানুষ মেঝেতে একদলা হুইপড ক্রিম বা ফেনা ফেলে রাখে। তাদের বিশ্বাস, এতে ঘরে সমৃদ্ধি এবং ধন-সম্পদ বৃদ্ধি পাবে।
স্কটল্যান্ডে নববর্ষের সকালে ‘ফার্স্ট ফুটার’ বা বাড়ির আঙিনায় প্রথম কে পা রাখলেন তাঁর গুরুত্ব অপরিসীম। ঐতিহ্যগতভাবে বিশ্বাস করা হয়, লম্বা এবং কালো চুলের কোনো পুরুষ যদি প্রথম বাড়িতে প্রবেশ করেন, তবে সেই বছরটি খুব সৌভাগ্যের হবে।
কলম্বিয়া, বলিভিয়া এবং ইতালিতে অন্তর্বাসের রঙের ওপর ভিত্তি করে ভাগ্য নির্ধারণ করা হয়। কলম্বিয়ানরা বিশ্বাস করেন, নতুন বছরের শুরুতে হলুদ রঙের অন্তর্বাস পরলে সারাবছর প্রেম এবং সুখে থাকা যায়। অন্যদিকে ইতালীয়রা লাল এবং আর্জেন্টাইনরা গোলাপি রঙের প্রতি ঝোঁকেন।
জাপানের বৌদ্ধ মন্দিরগুলোয় নতুন বছরের শুরুতে ১০৮ বার ঘণ্টা বাজানো হয়। এটি মানুষের ১০৮টি মানবিক পাপ বা কামনার প্রতীক, যা ঘণ্টা ধ্বনির মাধ্যমে মুছে ফেলে নতুন করে শুদ্ধ হওয়ার সংকল্প করা হয়।
সাইবেরিয়া বা রাশিয়ার কিছু অংশে প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যেও হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রায় বরফ শীতল পানিতে ঝাঁপ দিয়ে নতুন বছর শুরু করা হয়। এটি নতুন জীবনের বা নতুন করে জন্ম নেওয়ার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
আমেরিকায় টাইমস স্কোয়ারে ‘বল ড্রপ’ দেখা এবং ঠিক ১২টার সময় একে অপরকে চুম্বন করার পাশাপাশি ‘আউল্ড ল্যাং সাইন’ নামক একটি ঐতিহ্যবাহী স্কটিশ গান গাওয়ার প্রচলন রয়েছে; যার মূল কথা হলো, পুরোনো সব স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া।
১ জানুয়ারি কেবল একটি তারিখ নয়, এটি একটি মানসিক পরিবর্তনের লগ্ন। অতীতের গ্লানি ভুলে নতুন উদ্দীপনায় জেগে ওঠার একটি বিশ্বজনীন মুহূর্ত। সেই সম্রাট জুলিয়াস সিজার থেকে শুরু করে আজকের ডিজিটাল যুগ পর্যন্ত– মানুষ সবসময়ই চেয়ে এসেছে একটি ফ্রেশ স্টার্ট বা নতুন সূচনা। এ জানুয়ারি মাসই আমাদের সেই সুযোগ করে দেয়।
তাই আগামী নববর্ষে যখন আপনি রেজল্যুশন তৈরি করবেন বা পার্টিতে যোগ দেবেন, মনে রাখবেন ১ জানুয়ারির পেছনে লুকিয়ে আছে কয়েক হাজার বছরের লড়াই, জ্যোতির্বিজ্ঞান আর মানুষের সুন্দর আগামীর স্বপ্ন।
রিডার্স ডাইজেস্ট অবলম্বনে
- বিষয় :
- জানুয়ারি
- শাহেরীন আরাফাত
- নতুন বছর
