বৈদ্যুতিক যানের চালচিত্র
টেইলজি বাইক
রফিকুর রহমান প্রিয়াম
প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
২০২৬ সালের মার্চ মাস। ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের জেরে বিশ্বের অন্যতম প্রধান নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি সরবরাহে বড় ধরনের ধস নামে এবং প্রতিদিন প্রায় ২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত হয়। ৯৫ শতাংশ আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য এই সংকট এক অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে একটি প্রশ্নই বারবার সামনে আসছে–তেলচালিত যানের বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) এবং ই-বাইক কি বাংলাদেশের পরিবহন খাতকে বাঁচাতে পারে?
জ্বালানি তেলের এই অভাব এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের আকাশছোঁয়া দামের কারণে দেশের বিদ্যুৎ খাত প্রায় অচল হয়ে পড়ে। ফলে গ্রামাঞ্চলে দৈনিক ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে সাধারণ মানুষ। আমদানির এই বাড়তি খরচের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বার্ষিক প্রায় ৪.৮ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত চাপ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। জ্বালানির এই আকাল সরাসরি আঘাত হানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। পরিবহন খরচ এক ধাক্কায় ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় মার্চ মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯.১৩ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.৩০ শতাংশে গিয়ে ঠেকে।
জ্বালানি তেলের এই অস্থির বাজার ও সংকটের মুহূর্তে বৈদ্যুতিক যান একটি যুগান্তকারী বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিদ্যুতের মাধ্যমে গাড়ি চালালে পরিবহন খরচ বহুগুণ কমে যায়। বিশেষ করে যানজটের শহর ঢাকা বা চট্টগ্রামের সাধারণ যাত্রীদের জন্য ই-বাইক অত্যন্ত সাশ্রয়ী একটি সমাধান। দেশীয় ব্র্যান্ড ওয়ালটনের ‘তাকিওন’ ই-বাইকের প্রতি কিলোমিটারে খরচ মাত্র ০.১০ থেকে ০.১৫ টাকা। পেট্রোলচালিত বাইকের তুলনায় এটি অবিশ্বাস্য রকমের সস্তা। এ ছাড়া বৈদ্যুতিক গাড়িগুলোয় সাধারণ ইঞ্জিনচালিত গাড়ির মতো হাজারো যন্ত্রাংশ থাকে না। ফলে এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ খরচও দীর্ঘ মেয়াদে অনেক কম হয়। বৈদ্যুতিক যান শুধু অর্থনৈতিকভাবেই সাশ্রয়ী নয়, এটি শহরের পরিবেশ বাঁচানোর জন্যও অপরিহার্য। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, তেলচালিত গাড়ির তুলনায় বৈদ্যুতিক যান কিলোমিটারপ্রতি প্রায় ৩০ শতাংশ কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমাতে পারে। জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশীয় বিদ্যুতের মাধ্যমে গাড়ি চালালে পরিবহন খরচ বহুগুণ কমে যায়। এটি শুধু অর্থনৈতিকভাবেই সাশ্রয়ী নয়, শহরের পরিবেশ বাঁচানোর জন্যও অপরিহার্য। বৈদ্যুতিক যান ব্যবহারের ফলে কার্বন নিঃসরণ কমে এবং ঢাকার মতো শহরের বাতাসে ভাসমান ক্ষতিকর কণা উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব হয়।
বায়ুদূষণে জর্জরিত ঢাকা শহরের জন্য এটি একটি সরাসরি সমাধান। ইভি ব্যবহারের ফলে শহরের বাতাসে ভাসমান ক্ষতিকর কণা ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। যেহেতু বৈদ্যুতিক গাড়িতে কোনো সাইলেন্সার বা ইঞ্জিনের শব্দ থাকে না। তাই রাস্তায় ইভির আধিক্য শহরের বিরক্তিকর শব্দদূষণ ৩ থেকে ৫ ডেসিবেল পর্যন্ত কমিয়ে আনতে পারে।
২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বাজারে এখন দুই চাকা এবং চার চাকার বৈদ্যুতিক যানের বেশ বড় সমাহার রয়েছে। ঢাকার ইভিতে বর্তমানে নেতৃত্ব দিচ্ছে শীর্ষস্থানীয় চীনা ব্র্যান্ড বিওয়াইডি, যাদের অটো-৩, সিল, সিলায়ন-৫ এবং সিলায়ন-৬ মডেলগুলো ব্যাপকভাবে সমাদৃত হচ্ছে। বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের মধ্যে মার্সিডিজ-বেঞ্জ এবং বিএমডব্লিউ রয়েছে, যারা শুল্ক ছাড়ের কারণে আগের চেয়ে তুলনামূলক কম দামে গাড়ি সরবরাহ করছে। মাঝারি বাজেটের ক্রেতাদের জন্য বাজারে রয়েছে এমজি, হুন্দাই, নিসান এবং টাটা। অন্যদিকে, দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি সাশ্রয়ী মূল্যের ‘পালকি’ শহরের যানজটে চলাচলের জন্য দারুণ এক বাজেটবান্ধব বিকল্প হয়ে উঠেছে।
দুই চাকার বাজারে ব্র্যান্ডের কোনো অভাব নেই। দেশীয় প্রস্তুতকারকদের মধ্যে আকিজ মোটরস, ওয়ালটন তাকিওন এবং রানার বাজারে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও আমদানীকৃত ব্র্যান্ডের বিশাল তালিকায় রয়েছে–গ্রিন টাইগার, ইয়াদিয়া, হিরো ইলেকট্রিক, এক্সপ্লয়েট, টেইলজি, ওলা, রাইড, বীর মোটরস, রেভো, সানরা, আইমা, হুয়াভেই এবং জিরো।
এবারের জ্বালানি সংকট আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, আমদানীকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা দেশের অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। এই সংকট থেকে পরিত্রাণের একটি টেকসই উপায় হলো দ্রুত বৈদ্যুতিক যানের দিকে অগ্রসর হওয়া। সারাদেশে চার্জিং স্টেশনের দ্রুত সম্প্রসারণ করা গেলে এবং নীতিগত সহায়তা অব্যাহত থাকলে বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং ই-বাইক খুব সহজেই একটি মজবুত বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। এটি যেমন দেশের অর্থনীতিকে বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীলতা থেকে রক্ষা করবে, তেমনি নিশ্চিত করবে একটি দূষণমুক্ত ভবিষ্যৎ।
- বিষয় :
- গাড়ি ক্রয়
