কাদামাটির ফলক থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে
বই-এর বিবর্তন
শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:০১ | আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ২০:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
বইয়ের ইতিহাস নিছক কিছু পৃষ্ঠার ইতিহাস নয়; এটি মূলত মানুষের নিজস্ব স্মৃতিকে স্থায়ী রূপ দেওয়া এবং জ্ঞানকে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করার এক নিরন্তর লড়াইয়ের গল্প। মেসোপটেমিয়ার কাদামাটির ফলক থেকে শুরু করে আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত ইন্টারেক্টিভ জগৎ–বইয়ের এই দীর্ঘ বিবর্তন আমাদের জ্ঞান, সমাজব্যবস্থা এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহের আমূল পরিবর্তনের সাক্ষী।
কাদামাটির ফলক থেকে প্যাপিরাস
সভ্যতার শুরুতে মানুষ তাঁর স্মৃতি ও হিসাব-নিকাশ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫০০ থেকে ৩০০০ অব্দের মাঝামাঝি মেসোপটেমিয়ায় (বর্তমান ইরাক) নরম কাদামাটির ওপর নলখাগড়ার কলম দিয়ে খোদাই করে তৈরি হয় ‘কিউনিফর্ম’ লিপি। এ কাদামাটির ফলকগুলোই ছিল তথ্য সংরক্ষণের প্রথম কার্যকরী মাধ্যম। প্রায় একই সময়ে প্রাচীন মিসরীয়রা আবিষ্কার করে ‘প্যাপিরাস’। প্যাপিরাস গাছের কাণ্ড দিয়ে তৈরি এই নমনীয় কাগজ জন্ম দেয় ‘স্ক্রোল’ বা গোটানো কাগজের। তবে এর একটি বড় সীমাবদ্ধতা ছিল–এটি পড়তে হতো ক্রমানুসারে। একটি নির্দিষ্ট তথ্য খুঁজতে গেলে পুরো স্ক্রোলটি এপাশ-ওপাশ করে খুলতে হতো, যা ছিল বেশ সময়সাপেক্ষ।
অন্যদিকে প্রাচ্যে, বিশেষ করে চীনে, বইয়ের বিবর্তনের ধারা ছিল ভিন্ন। সেখানে বাঁশের ফালি রেশম বা চামড়া দিয়ে বেঁধে তৈরি হতো বই। ১০৫ খ্রিষ্টাব্দে চীনে কাগজ আবিষ্কৃত হওয়ার পর এই চিত্র পাল্টে যায়। ৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দে ছাপানো ‘ডায়মন্ড সূত্র’ প্রমাণ করে, ইউরোপীয় রেনেসাঁর অনেক আগেই মানুষ বইয়ের বহুল উৎপাদনের ধারণা পেয়েছিল।
কোডেক্স বিপ্লব
স্ক্রোল থেকে ‘কোডেক্স’ বা বাঁধাই করা পৃষ্ঠার রূপান্তরটি ছিল বইয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে যুগান্তকারী কাঠামোগত পরিবর্তন। প্যাপিরাসের ভঙ্গুরতা এবং এর কেবল একপাশে লেখার সীমাবদ্ধতা কাটাতে প্রাচীন রোমানরা মোম মাখানো কাঠের ফলক ব্যবহার শুরু করে। এ ধারণা থেকেই জন্ম নেয় কোডেক্স। খ্রিষ্টধর্মের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে কোডেক্সের জনপ্রিয়তা তুমুলভাবে বেড়ে যায়। কারণ, স্ক্রোলের মতো প্রথম থেকে না পড়ে, কোডেক্সের যে কোনো পৃষ্ঠা ইচ্ছেমতো উল্টে নির্দিষ্ট কোনো শ্লোক বা আয়াতে সরাসরি চলে যাওয়া যেত। পার্চমেন্ট বা পশুর চামড়ার ব্যবহারের ফলে বইয়ের স্থায়িত্ব বেড়ে যায় এবং দুই পৃষ্ঠায় লেখার সুযোগ তৈরি হয়।
রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর বইয়ের অস্তিত্ব টিকে ছিল মূলত গির্জা ও মঠগুলোয়। হাতে লেখা এসব পাণ্ডুলিপি তৈরি করা ছিল এক দুঃসাধ্য কাজ। একটি বাইবেল তৈরি করতে শত শত পশুর চামড়া এবং কয়েক বছরের পরিশ্রম প্রয়োজন হতো। বইয়ের নাগাল পেত কেবল ধর্মযাজক ও অভিজাত শ্রেণি। কিন্তু ১৪৫৫ সালের দিকে জোহানেস গুটেনবার্গের যান্ত্রিক মুদ্রণযন্ত্র বা ‘প্রিন্টিং প্রেস’ সবকিছু ওলটপালট করে দেয়। গুটেনবার্গ প্রমাণ করলেন, মানুষের হাতের চেয়ে যন্ত্র অনেক দ্রুত ও নিখুঁতভাবে বই ছাপাতে পারে। মুদ্রণযন্ত্রের এই আবিষ্কার তথ্যের গণতান্ত্রিকীকরণ ঘটায়। এর ফলে প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার আন্দোলন বেগবান হয়; বিজ্ঞানীরা নিজেদের মধ্যে নির্ভুল তথ্য আদান-প্রদান শুরু করেন এবং আঞ্চলিক ভাষাগুলোর কদর বাড়তে থাকে। একইসঙ্গে জন্ম নেয় ‘কপিরাইট’ বা মেধাস্বত্বের ধারণা।
শিল্পবিপ্লব থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
উনিশ শতকে বাষ্পীয় ইঞ্জিনচালিত মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের ফলে প্রকাশনা শিল্পে আসে শিল্পায়নের হাওয়া। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বই পৌঁছে যেতে থাকে দূরদূরান্তে। বিশ শতকে এসে বই পরিণত হয় পুরোপুরি এক গণমানুষের পণ্যে। ১৯৩০-এর দশকে ‘পকেট বুকস’ ও ‘পেঙ্গুইন’-এর হাত ধরে আসে সস্তা পেপারব্যাক বই। নজরকাড়া প্রচ্ছদের এসব বই স্টল ও ওষুধের দোকানেও বিক্রি হতে শুরু করে। সস্তায় বই পাওয়ার এ সুযোগ বিশ্বব্যাপী মানুষের সাক্ষরতার হার বাড়িয়ে দেয় অভাবনীয় হারে। একুশ শতকে ই-বুক রিডার, স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেটের কল্যাণে বইয়ের কোনো ভৌত অস্তিত্বের আর প্রয়োজন পড়ল না। স্পটিফাই বা কিন্ডেল আনলিমিটেডের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো পাঠকের অভ্যাস বদলে দিল। নির্দিষ্ট বই কেনার বদলে পাঠক এখন সাবস্ক্রিপশনের মাধ্যমে লাখ লাখ বইয়ের ভান্ডারে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন। পাশাপাশি অডিওবুকের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে, আধুনিক মানুষ এখন মাল্টিটাস্কিং বা একযোগে অনেক কাজের ফাঁকে ‘পড়তে’ নয়, বরং ‘শুনতে’ বেশি ভালোবাসে।
২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে প্রকাশনা শিল্পে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হয়ে উঠেছে জেনারেটিভ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। প্রকাশনার বর্তমান মডেলটি এখন ‘৯০/১০’ নীতিতে চলছে অর্থাৎ একটি বইয়ের ৯০ শতাংশ কাঠামোগত ও প্রাথমিক কাজ করে দিচ্ছে এআই আর লেখক সেখানে যোগ করছেন নিজের ১০ শতাংশ মানবিক আবেগ, অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতা। সম্পাদনা থেকে শুরু করে প্রচ্ছদ তৈরি, এমনকি অডিওবুকের ভয়েসওভার–সবই এআইয়ের কল্যাণে এখন প্রায় বিনামূল্যে এবং অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হচ্ছে।
ভবিষ্যতের বই
ভবিষ্যতে বই কেবল স্থির কোনো বস্তু থাকছে না, বরং এটি একটি মাল্টিমিডিয়া অভিজ্ঞতায় রূপ নিচ্ছে। ‘অগমেন্টেড রিয়্যালিটি’ বা এআর প্রযুক্তির সাহায্যে পাঠকরা এখন বইয়ের পাতায় থ্রিডি অ্যানিমেশন দেখতে পান। বিশেষ করে শিশুদের বই ও শিক্ষামূলক উপাদানগুলোয় এআর প্রযুক্তির ব্যবহার পড়ার অভিজ্ঞতাকে এক জাদুকরী রূপ দিচ্ছে।
- বিষয় :
- বই
- শাহেরীন আরাফাত
