ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দাবানলের গ্রাস থেকে বাঁচতে ‘বাড়ি পোড়ানোর’ বিজ্ঞান

দাবানলের গ্রাস থেকে বাঁচতে ‘বাড়ি পোড়ানোর’ বিজ্ঞান
×

আইবিএইচএস নামক একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান দাবানলের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে গবেষণা চালাচ্ছে

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৬:৫৮ | আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:৫৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

মাত্র তিন মিনিট! প্রমত্ত বাতাসের তোড়ে ধেয়ে আসা আগুনের লেলিহান শিখা একটি বাড়ির বাইরের দেয়াল ছুঁতে না ছুঁতেই জানালার কাচ চূর্ণবিচূর্ণ করে দিল। এরপর ছাদের কার্নিশের নিচ দিয়ে ঢুকে মুহূর্তের মধ্যে বাড়ির ভেতরের সবকিছু পুড়িয়ে ছাই করে দিল। অথচ কয়েক সপ্তাহ পর, ঠিক একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা আরেকটি বাড়ি পোড়ানোর চেষ্টা করা হলেও সেটি পুড়ল অনেক ধীরগতিতে। না, এটি কোনো দুর্ঘটনা বা হলিউডি সিনেমার দৃশ্য নয়। এটি বিজ্ঞানীদের এক অভিনব পরীক্ষা। যে দাবানল মানুষের ঘরবাড়ি কেড়ে নেয়, সেই দাবানলের হাত থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে বিজ্ঞানীরা নিজেরাই একের পর এক বাড়ি পুড়িয়ে চলেছেন!

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবী যত উত্তপ্ত হচ্ছে, দাবানলের ভয়াবহতা ততই বাড়ছে। এই ধ্বংসলীলা থেকে বাঁচার উপায় খুঁজতে দক্ষিণ ক্যারোলাইনার এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিজ্ঞানীরা নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন। ‘ইন্স্যুরেন্স ইনস্টিটিউট ফর বিজনেস অ্যান্ড হোম সেফটি’ (আইবিএইচএস) নামক একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান এই গবেষণার নেতৃত্ব দিচ্ছে। বীমা কোম্পানিগুলোর উদ্যোগে গঠিত এই প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য হলো– বাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিপরীতে আরও বেশি টেকসই করে তোলা। দক্ষিণ ক্যারোলাইনার রিচবার্গে তাদের ১০০ একরের বিশাল গবেষণা কেন্দ্রে একসময় মূলত হারিকেন ও প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব নিয়ে গবেষণা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দাবানলের ঝুঁকি আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায়, তারা গবেষণার মোড় ঘুরিয়েছেন।

বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত ১৩টি আস্ত বাড়ি পুড়িয়েছেন। কারণ, তাদের ভাষায়–‘শিখতে হলে পোড়াতে হবে’ (বার্ন টু লার্ন)। পরীক্ষামূলক এই বাড়িগুলো সাধারণ বাড়ির মতোই নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয় (তবে বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ থাকে না)। বাড়ির ভেতরে বসানো থাকে দামি সেন্সর ও ক্যামেরা। সেন্টারের ম্যানেজারের ভাষায়, এই যন্ত্রগুলো ‘বিজ্ঞানের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে।’ আর বাইরে, ফায়ারপ্রুফ বা অগ্নিরোধী ভবনে এবং চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে প্রায় ১০ লাখ ডলার মূল্যের অত্যাধুনিক ক্যামেরা ও বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম।

দাবানলের পরিস্থিতি কৃত্রিমভাবে তৈরি করতে বিজ্ঞানীরা ১০৫টি অতিকায় ফ্যানের সমন্বয়ে গঠিত ছয়তলা সমান উঁচু একটি দেয়াল ব্যবহার করেন। উইন্ড টানেলের বিশাল দরজা দিয়ে যখন এই ফ্যানগুলো চালু করা হয়, তখন তা সত্যিকারের দাবানলের মতো প্রলয়ংকরী বেগে আগুন ছড়িয়ে দেয়।

বিজ্ঞানীদের এই ‘বাড়ি পোড়ানো’ থেকে ইতোমধ্যে বেশ কিছু যুগান্তকারী তথ্য বেরিয়ে এসেছে, যা ক্যালিফোর্নিয়ার ফায়ার কোড বা অগ্নিনির্বাপণ বিধিমালাকে শক্তিশালী করেছে।

১. উন্নত নির্মাণসামগ্রী: প্রথম যে বাড়িটি তিন মিনিটে পুড়েছিল, দ্বিতীয় বাড়িটি তার চেয়ে অনেক বেশি সময় টিকে ছিল উন্নত নির্মাণসামগ্রীর কারণে। নতুন নিয়মে বাড়ির দেয়াল হতে হবে দহন-প্রতিরোধী। জানালায় ব্যবহার করতে হবে টেম্পারড বা ডাবল-প্যানড (দ্বিস্তর বিশিষ্ট) কাচ। আর ভেন্টিলেটর বা বাতাসের চলাচলের পথে এমন জাল বা মেশ ব্যবহার করতে হবে, যাতে জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গ বাড়ির ভেতরে ঢুকতে না পারে।

২. পাঁচ ফুটের ‘বাফার জোন’: বাড়ির বাইরের অংশের যত্ন নেওয়া বাড়ির ভেতরের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, বাড়ির চারপাশে অন্তত ৫ ফুটের (১.৫ মিটার) একটি ‘বাফার জোন’ বা নিরাপদ বলয় তৈরি করতে হবে। এই ৫ ফুটের মধ্যে এমন কিছু রাখা যাবে না যা সহজে আগুন ধরে যায়। যেমন–শুকনা পাতা, পাইন খড়, কাঠের বেড়া, এমনকি হট টাব (যার ইনসুলেশন অত্যন্ত দাহ্য)। পরীক্ষাগারে দেখা গেছে, প্রচণ্ড বাতাসে যখন আগুনের স্ফুলিঙ্গ উড়ে আসে, তখন বাড়ির খুব কাছের এই দাহ্য পদার্থগুলোই মূল আগুনকে বাড়ির দেয়াল পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়। জানালার কাচ বা দেয়াল একবার ভেদ করতে পারলেই হলো। ভেতরে দ্রুত আগুন ধরে যায় এবং সেখান থেকে নতুন স্ফুলিঙ্গ উড়ে গিয়ে এক-দুই ব্লক দূরের বাড়িগুলোতেও আগুন ধরিয়ে দেয়।
তবে বিজ্ঞানীদের মতে, ফায়ার স্ট্যান্ডার্ড বা অগ্নিনির্বাপণ মানদণ্ডেরও একটা সীমাবদ্ধতা আছে। সিরাকিউস ইউনিভার্সিটির ফায়ার রিসার্চার জ্যাকব বেন্ডিক্স মনে করেন, ‘অত্যন্ত তীব্র দাবানল এবং প্রচণ্ড ঝোড়ো হাওয়ার ক্ষেত্রে এই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলোর কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়তে পারে।’

২০১৮ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় উলসি ফায়ারের ভয়াবহতা নিজ চোখে দেখার পর নিকোলাই অ্যালেন নামের এক ব্যক্তি নিজেই ফায়ারফাইটার বা দমকলকর্মী হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন। তিনি বুঝতে পারেন, বাড়ির অ্যাটিক বা চিলেকোঠায় জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গ ঢোকা ঠেকাতে পারাই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। 

তথ্যসূত্র: এপি
 

আরও পড়ুন

×