ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অস্তিত্ব সংকটে বিশ্বের একমাত্র ভাসমান জাতীয় উদ্যান ‘কীবুল লামজাও’

অস্তিত্ব সংকটে বিশ্বের একমাত্র ভাসমান জাতীয় উদ্যান ‘কীবুল লামজাও’
×

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ | ১৪:২১ | আপডেট: ০৫ মে ২০২৬ | ১৪:৪৩

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরের কীবুল লামজাও জাতীয় উদ্যান আক্ষরিক অর্থেই এক প্রাকৃতিক বিস্ময়। শুরুতেই এর চমৎকার ভৌগোলিক অবস্থানের কথা বলা যাক। উত্তর-পূর্ব ভারতের বৃহত্তম স্বাদু পানির হ্রদ ‘লোকটাক’-এর বুকেই গড়ে উঠেছে এই উদ্যান। আর এর চারপাশ ঘিরে রয়েছে নিচু, সবুজে মোড়ানো স্নিগ্ধ পাহাড়ের সারি।

তবে মজার ব্যাপার হলো, এই উদ্যানের সুনির্দিষ্ট কোনো অবস্থানের কথা বলা বেশ কঠিন। কারণ, এর ভূমি কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় স্থির থাকে না—বরং তা পানির বুকে ভেসে বেড়ায়। আর ঠিক এই অবিশ্বাস্য বৈশিষ্ট্যের কারণেই কীবুল লামজাও বিশ্বের একমাত্র ‘ভাসমান জাতীয় উদ্যান’ হিসেবে নিজের জায়গা করে নিয়েছে।

উদ্যানের মূল কাঠামো তৈরি হয়েছে এক বিশেষ ধরনের ভাসমান দ্বীপের সমন্বয়ে, স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয় ‘ফুমদি’। পচনশীল লতাপাতা, মাটি এবং জীবন্ত উদ্ভিদের এক অপূর্ব মিশ্রণে তৈরি এই ফুমদি পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না; কেবল লোকটাক হ্রদেই এদের বাস। মাটি ও উদ্ভিদের এই ভাসমান আস্তরণগুলো কয়েক ইঞ্চি থেকে শুরু করে সাড়ে ছয় ফুট পর্যন্ত পুরু হতে পারে। হ্রদের দক্ষিণ-পূর্ব অংশেই এদের বেশি দেখা যায়। সেখানে অসংখ্য ছোট-বড় ফুমদি একত্রে যুক্ত হয়ে এক বিশাল ফুমদির জন্ম দিয়েছে– যাকে একটি সুবিশাল ভাসমান তৃণভূমি বললেও ভুল হবে না।

কিছু কিছু ফুমদি আবার মানুষের হাতেও আকার পায়। স্থানীয় অধিবাসীরা বাঁশ ও দড়ি ব্যবহার করে এগুলোকে বৃত্তাকার রূপ দেয়, যা মূলত মাছ চাষের জন্য ব্যবহৃত হয়। এই ভাসমান দ্বীপগুলোর বুকেই ছোট ছোট কুঁড়েঘর তুলে বসবাস করেন স্থানীয়রা, আর এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম হলো নৌকা।

প্রাকৃতিকভাবে ফুমদিগুলো কেবল বর্ষাকালেই পানিতে ভেসে থাকে, যখন হ্রদের পানির স্তর কানায় কানায় পূর্ণ থাকে। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে গেলে উদ্ভিদের এই আস্তরণগুলো হ্রদের তলদেশে গিয়ে আশ্রয় নেয়। সেখানে তারা নিচের মাটি থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান শোষণ করে নিজেদের টিকিয়ে রাখে।

কীবুল লামজাও-কে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট বা বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত করার আবেদনে বলা হয়েছে, ‘সব মিলিয়ে হ্রদের বাস্তুতন্ত্রের পরিবেশগত প্রক্রিয়া ও কার্যকলাপে ফুমদি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এগুলো হ্রদের প্রধান পুষ্টি উপাদানগুলোর একটি জৈবিক আধার হিসেবে কাজ করে এবং হ্রদের পানি ও পুষ্টির গতিশীলতা নিয়ন্ত্রণ করে।’

ফুমদি বা ভাসমান জমি ভেঙে যাওয়া, এর ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল সাঙ্গাই হরিণকে অস্তিত্ব সংকটে ফেলেছে

ভাসমান অভয়ারণ্য ও বিপন্ন সাঙ্গাই হরিণ
অসংখ্য প্রাণীর এক গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল এই কীবুল লামজাও। তবে এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত প্রাণীটি হলো ‘সাঙ্গাই’– যা এল্ডস হরিণের একটি উপপ্রজাতি। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন)-এর মতে, এটি চরম বিপন্ন একটি প্রাণী। সাঙ্গাই হরিণ কেবল মণিপুর রাজ্যেই পাওয়া যায়। এই প্রজাতি সংরক্ষণের ওপর নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র থেকে জানা যায়, একসময় এই হরিণগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলেই ধরে নেওয়া হয়েছিল।

সাঙ্গাই হরিণের অস্তিত্ব সম্পূর্ণভাবে ফুমদির এই অনন্য বাস্তুতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল। ভাসমান এই ভূমিতে চলাফেরা করার জন্য তারা নিজেদের চমৎকারভাবে মানিয়ে নিয়েছে এবং এখানেই জন্মানো গাছপালা খেয়ে তারা বেঁচে থাকে। বর্তমানে পৃথিবীতে এই উপপ্রজাতির হরিণের সংখ্যা মাত্র কয়েকশ'তে এসে দাঁড়িয়েছে।

এই ভাসমান তৃণভূমির ওপরে ও নিচে বাস করে নানা প্রজাতির পাখি, প্রজাপতি ও মাছ। কিন্তু আশি দশকের দিকে ‘ইথাই ব্যারেজ’ ও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ফলে যে পরিবেশগত পরিবর্তন ঘটে, তা এই প্রাণীকুলকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

লোকটাক হ্রদের পানি আটকে রেখে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এই ব্যারেজটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এর ফলে হ্রদের পানির স্তর স্থায়ীভাবে বৃদ্ধি পায়। ওয়ার্ল্ড অ্যাটলাসের তথ্যমতে, পানির স্তর বেড়ে যাওয়ার কারণে শুষ্ক মৌসুমেও পানি আর আগের মতো কমে না। ফলে ফুমদিগুলো আর হ্রদের তলদেশে গিয়ে বিশ্রাম নিতে এবং পুষ্টি সংগ্রহ করতে পারে না। পুষ্টির অভাবে এই ভাসমান দ্বীপগুলোর অনেকগুলোই এখন ভেঙে পড়তে শুরু করেছে।

পরিবেশবিজ্ঞানী আর এস খইয়ানবাম ২০২১ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব লেকস অ্যান্ড রিভার্স’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় লিখেছেন, ‘হ্রদে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কার্যক্রম এখানকার প্রাকৃতিক আবাসস্থলকে ধ্বংস করেছে এবং কীবুল লামজাওয়ের বন্যপ্রাণীদের টিকে থাকার বিষয়টি হুমকির মুখে ফেলেছে।’ এই ব্যারেজটি মিয়ানমারের হ্রদটির ভাটিতে থাকা চিন্দউইন ও ইরাবতী নদী ব্যবস্থা থেকে উজানে উঠে আসা জলজ প্রাণীদের চলাচলের পথও অবরুদ্ধ করে দিয়েছে। খইয়ানবামের মতে, লোকটাক হ্রদের জীববৈচিত্র্য হ্রাসের সবচেয়ে জ্বলন্ত উদাহরণ হলো পরিযায়ী মাছের বিলুপ্তি, যারা একসময় এই হ্রদের পানিতে অবাধে বিচরণ করত।

হ্রদের চারপাশে বসবাসকারী মানুষের জীবনজীবিকাকে প্রভাবিত করছে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি

ভাসমান জীবনযাত্রা ও ঘনিয়ে আসা বিপর্যয়
জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি যে কেবল এই অঞ্চলের বন্যপ্রাণীদের ওপর প্রভাব ফেলেছে তা নয়, হ্রদের চারপাশে বসবাসকারী মানুষের জীবনজীবিকাকেও বিপন্ন করেছে। খইয়ানবাম লিখেছেন, যখন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ফলে এলাকাটি প্লাবিত হয়, তখন বাধ্য হয়ে আরও বেশি মানুষ সরাসরি হ্রদের ওপর বসবাস শুরু করে।

উদ্যানের ভেতরে স্থানীয়রা বেশ কয়েক ধরনের জলজ উদ্ভিদের চাষ করেন, যার মধ্যে রয়েছে এক বিশেষ ধরনের আদা, ওয়াটার সেলারি এবং কলমি শাক—যেগুলো এশিয়ার বিভিন্ন অংশে বেশ জনপ্রিয় খাবার। অনেকেই আবার ফুমদিতে তৈরি মাছের খামার থেকে জীবিকা নির্বাহ করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, এখানকার অনেক গ্রাম প্রায় সম্পূর্ণভাবে এই ভাসমান উদ্যানের সম্পদের ওপর নির্ভরশীল।

ফুমদিগুলোর ভেঙে যাওয়া বা হারিয়ে যাওয়া ঠেকাতে বাঁশ বা কাঠের খুঁটি পুঁতে সেগুলোকে আটকে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে খুঁটিগুলো হ্রদের তলদেশ থেকে পুষ্টি সংগ্রহ করে ফুমদিতে সরবরাহ করতে পারে এবং বড় ভাসমান তৃণভূমির সাথে সেগুলোকে যুক্ত রাখতে সাহায্য করে। এই অনন্য বাস্তুতন্ত্রকে আরও সুরক্ষিত করতে উদ্যানটিকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত করার আবেদন করা হয়েছে।

এত কিছুর পরও খইয়ানবাম এই এলাকার ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব একটা আশাবাদী হতে পারছেন না। তিনি সতর্ক করে লিখেছেন, ‘লোকটাক হ্রদ বর্তমানে এক গভীর পরিবেশগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এবং জলাশয়গুলো প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংসের লক্ষণ দেখাচ্ছে। যদি এখনই কার্যকর কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়, তবে এই পুরো বাস্তুতন্ত্র এক বিশাল বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাবে।’ তিনি মনে করেন, প্রকৃতির এই অপার বিস্ময়কে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী ও টেকসই পদক্ষেপ।

আরও পড়ুন

×