ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চাঁদে মানুষের পদচারণা কি মুছে দেবে প্রাণের আদি ইতিহাস?

চাঁদে মানুষের পদচারণা কি মুছে দেবে প্রাণের আদি ইতিহাস?
×

চাঁদে অভিযান চালানো নিয়ে এখন কার্যত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এক নতুন প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়েছে

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:০৬ | আপডেট: ২৭ জুলাই ২০২৬ | ২১:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর আবারও চাঁদের বুকে মানুষের পদচিহ্ন আঁকার রোমাঞ্চকর প্রস্তুতি চলছে। ষাটের দশকের সেই স্নায়ুযুদ্ধের উত্তাপ হয়তো আজ নেই, কিন্তু শুরু হয়েছে একুশ শতকের এক নতুন মহাকাশ দৌড়। এই প্রতিযোগিতায় এবার প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী–মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। তবে এবারের লক্ষ্য শুধু চাঁদের মাটিতে পতাকা ওড়ানো বা কয়েক কদম হাঁটা নয়; বরং চাঁদের বুকে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী বসতি স্থাপন করা। নাসার ‘আর্টেমিস’ এবং চীনের ‘চ্যাং-ই’ কর্মসূচির মূল গন্তব্য এখন চাঁদের দক্ষিণ মেরু। কিন্তু মহাকাশজয়ের এই অভাবনীয় উন্মাদনার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর শঙ্কা। বিজ্ঞানীদের মতে, চাঁদে মানুষের এই অবিরাম আনাগোনা হয়তো চিরতরে মুছে দিতে পারে পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তির অমূল্য ইতিহাস।

প্রশ্ন জাগতে পারে, পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভবের সঙ্গে চাঁদের কী সম্পর্ক? এর উত্তর লুকিয়ে আছে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর চির-অন্ধকার খাদগুলোতে। এই গহ্বরগুলোতে সূর্যের আলো পৌঁছায় না বললেই চলে। ফলে সেখানে শত শত কোটি বছর ধরে জমে আছে প্রাচীন বরফ। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই বরফের স্তরে আটকে আছে কোটি কোটি বছর আগে চাঁদের বুকে আছড়ে পড়া গ্রহাণু ও ধূমকেতুর ধ্বংসাবশেষ। সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, এই প্রাচীন বরফে ‘প্রিবায়োটিক অরগানিক মলিকিউল’ বা প্রাণের উদ্ভবের পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচিত জৈব অণুর অস্তিত্ব থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। পৃথিবীতে সময়ের আবর্তনে, বিবর্তন ও প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ফলে প্রাণের এই আদি ইতিহাস সম্পূর্ণ মুছে গেছে। কিন্তু চাঁদের পরিবেশ প্রায় অপরিবর্তিত থাকায়, সেখানকার বরফের স্তরগুলো যেন এক একটি প্রাকৃতিক টাইম-ক্যাপসুল। এই অণুগুলো কীভাবে একত্র হয়ে জীবন্ত কোষে পরিণত হয়েছিল, তার নিখোঁজ সূত্রগুলো চাঁদের বুকেই সংরক্ষিত আছে বলে বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস।

নাসার পরিকল্পনা অনুযায়ী, আর্টেমিস-৩ অভিযান ২০২৭ সাল নাগাদ চারজন নভোচারী নিয়ে চাঁদে অবতরণ করবে এবং এরপর ২০২৮ সালে আর্টেমিস-৪ এর মাধ্যমে দক্ষিণ মেরুতে আরও বিস্তৃত গবেষণা শুরু হবে। অন্যদিকে, চীনও ২০৩০ সালের আগেই তাদের নভোচারীদের চাঁদে পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। এখানেই দেখা দিয়েছে বিপত্তি। ‘ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি’ (ইএসএ) এবং পর্তুগালের ‘ইনস্টিটিউটো সুপিরিয়র টেকনিকো’-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। মহাকাশযানগুলো চাঁদে অবতরণের সময় যে জ্বালানি পোড়ায়, তার অবশিষ্টাংশ হিসেবে প্রচুর পরিমাণ মিথেন গ্যাস নির্গত হয়। চাঁদে পৃথিবীর মতো কোনো বায়ুমণ্ডল নেই। ফলে এই মিথেন গ্যাস মহাকাশযানের ইঞ্জিন থেকে বেরিয়ে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে চাঁদের পৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে।

কম্পিউটার সিমুলেশনে দেখা গেছে, সৌর বায়ু ও বিকিরণের প্রভাবে এই গ্যাস মাত্র দুই চন্দ্র-দিনের মধ্যেই চাঁদের উত্তর মেরু পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। আরও ভয়ের কথা হলো, মাত্র এক চন্দ্র-সপ্তাহের (পৃথিবীর হিসাবে প্রায় সাত মাস) মধ্যে নির্গত মিথেনের প্রায় ৪২ শতাংশই চাঁদের দক্ষিণ মেরুর সেই অতি-শীতল বরফের খাদগুলোতে গিয়ে জমা হতে পারে। এই মিথেন গ্যাস চির-অন্ধকারে থাকা প্রাচীন বরফের ইকোসিস্টেমকে দূষিত করে তুলবে এবং কোটি কোটি বছর ধরে সংরক্ষিত থাকা প্রাণের আদি অণুগুলো চিরতরে ধ্বংস করে দিতে পারে।

নাসার এই ছবিতে চাঁদের দক্ষিণ মেরু (বামে) এবং উত্তর মেরুর (ডানে) পৃষ্ঠে বরফের বিস্তৃতি তুলে ধরা হয়েছে। ছবিটিতে নীল রঙের মাধ্যমে বরফের অবস্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যদিকে, ধূসর রঙের বিভিন্ন মাত্রা দিয়ে চাঁদের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বোঝানো হয়েছে; যেখানে গাঢ় ধূসর অংশ অপেক্ষাকৃত শীতল এবং হালকা ধূসর অংশ তুলনামূলক উষ্ণ এলাকা নির্দেশ করে

ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির প্ল্যানেটারি প্রোটেকশন অফিসার সিলভিও সিনিবাল্ডির মতে, ‘আমরা মহাকাশ গবেষণার যে বিনিয়োগ করছি, আমাদের নিজেদের কার্যক্রমই তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আমরা যদি এখনই সতর্ক না হই, তবে হয়তো চাঁদে বসতি গড়ার আগেই আমরা প্রাণের উৎপত্তির সেই মহামূল্যবান রহস্য চিরতরে হারিয়ে ফেলব।’

পৃথিবীতে অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ বা বিভিন্ন জাতীয় উদ্যান সংরক্ষণের জন্য যেমন কঠোর আইন রয়েছে, চাঁদের ক্ষেত্রেও তেমন কিছু ভাবার সময় এসেছে। গবেষণা দলের প্রধান পদার্থবিদ ফ্রান্সিসকা পাইভা জোর দিয়ে বলেছেন, চাঁদের পরিবেশও অ্যান্টার্কটিকার মতোই মূল্যবান ও স্পর্শকাতর।

মহাকাশ বিজয়ের পথে মানুষের এই যাত্রা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই যাত্রায় আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, যেন ভবিষ্যৎ নির্মাণের নেশায় আমরা আমাদের অতীত উদ্ভবের ইতিহাস ধ্বংস করে না ফেলি। চাঁদের বুকে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং মহাজাগতিক ইতিহাসের সংরক্ষণের মধ্যে একটি সুষ্ঠু ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন মহাকাশ বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। 

তথ্যসূত্র: স্পেস ডট কম

আরও পড়ুন

×