বাঘ সুরক্ষায় লোকায়ত জ্ঞান
রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার / ছবি:: ভ্লাদিমিরচেক
পাভেল পার্থ
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:০৮ | আপডেট: ২৭ জুলাই ২০২৬ | ২১:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
আমরা বাঘের দেশের মানুষ। ‘বাঘ’ মিশে আছে আমাদের স্মৃতিকথা, আখ্যান, কৃত্য আর ভাষালিপিতে। আমাদের বহুল ব্যবহৃত ম্যাটাফোরে বাঘ আছে। শীতলপাটি, নকশিকাঁথা কিংবা বহু গ্রামীণ নকশায় বাঘ এক গুরুত্ববহ প্রাণ। দুনিয়ার বৃহত্তম বনের রক্ষাকবচ মা বনবিবির বাহন বাঘ। বাঙালি কী আদিবাসী সমাজে বাঘ জীবনের এক অন্যতম রূপক। ‘যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে সন্ধ্যা হয়’ এই প্রাচীন গ্রামীণ প্রবাদ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় কীভাবে আমরা একদা বাঘের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে শিখেছিলাম। কিন্তু নিদারুণভাবে আমরা সেই ব্যাকরণ ভুলে গেছি। নির্দয়ভাবে বাঘের সীমনা, সংসার দখল ও লুট করেছি। কিছু রুগ্ণ বাঘকে চিড়িয়াখানায় খাঁচাবন্দি করে আবার আমরাই ক্রিকেট দলকে বাঘের শক্তির সঙ্গে তুলনা দেই। হায়রে কী নিদারুণ পরিহাস! আমাদের বন কর্মকর্তাদের ঘরের ভেতর সুন্দরবন থেকে ধরে আনা বাঘের বাচ্চা পাওয়া যায়। মা বাঘদের চামড়া হাড্ডি চোরাচালান হয়। বাঘ-গণনার নামে আমরা জামতলার রানীকে হত্যা করেছি। তবে সম্প্রতি আহত বাঘিনিকে আবার বনে ফিরিয়ে দিতে পেরেছি আমরা।
ব্রিটিশ উপনিবেশিক আমলে ফ্রাঙ্ক বি সিমসন শালবন থেকে উপকূল দেশের বিভিন্নপ্রান্তে শিকার করে বেরিয়েছেন। তাঁর সেই নির্মম শিকার কাহিনি লন্ডন থেকে ১৮৮৬ সনে ‘দ্য লেটার্স অন স্পোর্টস ইন ইস্টার্ন বেঙ্গল’ নামে প্রকাশিত হয়। সেই বইয়ে বাঘসহ বন্যপ্রাণী ভরপুর বনবনানীর স্মৃতি আছে। সুনামগঞ্জের যাদুকাটা সীমান্তে বাঘের স্মৃতি নিয়ে লেখা হয়েছে ‘মানিগার নরখাদক’ ও ‘শিমূলতলীর নরখাদক’। আজ সেখানে বাঘ নেই।
প্রবীণদের কাছে ঢাকায় বাঘের বিচরণের কাহিনি জানা যায়। ইতিহাসবিদ যতীন্দ্রমোহন রায় ও কেদারনাথ মজুমদার ১৯১০ সালে ‘বৃহত্তর ঢাকা জেলার বিবরণসহ ঢাকার ইতিহাস’ লিখেছিলেন, যা পরে ‘ঢাকার ইতিহাস’ নামে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়। উক্ত বইতে হরিণ, চিতা, ভালুক, খ্যাঁকশিয়াল, উদ, সজারু, শশক, কাঠবিড়ালী, বানর, উল্লুক, খাটাশ, কচ্ছপ, কুমির এবং বহু জাতের সাপসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীদের কথা আছে। কিন্তু বাঘের কথা নাই। বাঘেদের খুন করেই গড়ে ওঠেছে দমবন্ধ দূষিত ঢাকা শহর।
১৯৪০ সনে ভাওয়াল শালবনে বাঘের সর্বশেষ বিচরণের কাহিনি জানা যায়। শ্রীপুরের তেলিহাটি ইউনিয়নের গুদারচালা রবিদাসপাড়ার পত্তন করেন শুকলাল মুচি, তিনি বাঘের বাচ্চা পালতেন, যাদের তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন রাথুরা বনের ভেতর। বাঘের স্মৃতি নিয়ে এখনও ভাওয়াল শালবনে টিকে আছে বাঘের বাজার, বাঘেরচালা, বাঘেরবাইদ, বাঘাডোবা এলাকাগুলো।
দিনে দিনে বাঘ নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। শুধুমাত্র বৃহত্তম বাদাবন নয়, গোটা দুনিয়া থেকেই। বলা হয়ে থাকে ১৯১৩ সনের দিকে গোটা দুনিয়ায় প্রায় এক লাখ বাঘ ছিল। ২০১৩ সনে এসে দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ২৭৪ এবং ২০১৪ সনে তিন হাজারে। বাংলাদেশে বাঘের সংখ্যা ও সম্পর্ক নিয়ে বনজীবী ও বিভিন্ন এজেন্সিগুলোর ভেতর তথ্যগত ফারাক আছে। ২০০৪ সনে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি ও বনবিভাগ যৌথ জরিপে বাঘের সংখ্যা সুন্দরবনে দেখানো হয় ৪৪০। ২০০৬ সনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও জুওলজিক্যাল সোসাইটি অব লন্ডনের জরিপে দেখা যায় সুন্দরবনে বাঘ আছে ২০০। ২০১৫ সনে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সমাপ্ত জরিপে সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা দেখানো হয়েছে ১০৬। ২০১৮ সালের জরিপে ১১৪টি এবং ২০২৩-২০২৪ সালের জরিপে সুন্দরবনে বাঘ মিলেছে ১২৫টি। বাঘের সংখ্যা বেশি বা কম এটি নিয়ে তর্ক হয়, অথচ বাঘের নিরাপদ বিচরণস্থল যেসব কারণে ছিন্নভিন্ন তা দূর করতে কোনো সক্রিয় রাষ্ট্রীয় তৎপরতা নাই। স্থানীয়, জাতীয় বিভিন্ন দুর্নীতি, লুটতরাজ, বাণিজ্য এবং অন্যায়ের পাশাপাশি বাঘের সংসার ও জীবন আজ জলবায়ু সংকটের কারণেও ঝুঁকিপূর্ণ।
বাঘের এই অস্তিত্ব বছর বছর কমলেও, সুন্দরবন ঘিরে এবং সুন্দরবন জুড়ে করপোরেট-যন্ত্রণাগুলো কিন্তু দশাসই হয়ে ওঠছে। বনবিভাগ, প্রশাসন, রাজনৈতিক খবরদারি সবকিছুর সামনেই চলছে বিচারহীন বাঘ-বাণিজ্য। সুন্দরবনের ঐতিহাসিকতাকে বিবেচনা না করে, একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্প জাপটে ধরছে মুমূর্ষু অরণ্যের কলিজা। সুন্দরবন তড়পাচ্ছে, এমন একটি তড়পানো বনে শুধু বাঘ কেন যে কোনো প্রাণেরই টিকে থাকা মুশকিল।
সুন্দরবনে বাঘের সঙ্গে বনজীবী মানুষের, মানুষের সঙ্গে বাঘের, বাঘের সঙ্গে বনবিবির, বনের সঙ্গে বনবিভাগের তৈরি হয়েছে এক জটিল বহুমাত্রিক ঐতিহাসিক সম্পর্ক। কিন্তু অধিকাংশ উন্নয়ন খবরদারি কি জরিপ প্রকল্প এই সম্পর্ককে বিবেচনা করে না। যেমন– ‘বাংলাদেশ টাইগার একশন প্ল্যান ২০০৯-২০১৭’ বাঘ ও বনজীবীর সম্পর্ককে ‘বাঘ-মানুষ দ্বন্দ্ব বা সংঘর্ষ’ হিসেবেই দেখেছিল। যদিও বাদাবনের বনজীবীরা বাঘের সঙ্গে বা মানুষের সঙ্গে বাঘের এই সম্পর্ককে কখনোই ‘দ্বন্দ্ব বা সংঘর্ষ’ হিসেবে পাঠ করেন না। বনভূমি লুটপাট ও কৃষিজমিকে চিংড়িঘের বানানোর মাধ্যমে বাঘ ও বনজীবীর খাদ্যভান্ডার নিশ্চিহ্ন করে এবং বাস্তুসংস্থান উল্টেপাল্টে দিয়ে সুন্দরবনের খাদ্যহীন বাঘ-বনজীবীর সাম্প্রতিক আচরণকে কোনোভাবেই ‘সংঘর্ষ’ হিসেবে প্রচার করে ঐতিহাসিক সত্যকে ঢেকে ফেলা যাবে না।
সুন্দরবন পশ্চিম বনবিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সূত্র অনুযায়ী, জুলাই ২০০০ থেকে জুন ২০০৯ পর্যন্ত শুধুমাত্র সাতক্ষীরা রেঞ্জেই ১১৬ জন বনজীবী বাঘের হামলায় নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি খাদ্যহীন অসহায় ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত বাঘ যখন বন ছেড়ে গ্রামে চলে আসে তখন বাঘ উদ্ধার করতে না পারা ব্যর্থ বনবিভাগের জন্য অপেক্ষা করতে করতে মানুষও বাধ্য হয়ে পিটিয়ে বাঘ মেরে ফেলে। শ্যামনগরের আবাদ চণ্ডীপুর গ্রামে একটি ঘরের চালার ওপর বাঘকে ঘিরে রেখে ২২ জানুয়ারি ২০১০ তারিখে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন হাজারো গ্রামবাসী। রাষ্ট্র গ্রাম থেকে বাঘটিকে বনে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হলে সরকার ও জনপ্রতিনিধিদের সামনেই গ্রামবাসীদের অনেকে বাঘটিকে পিটিয়ে মারতে বাধ্য হন।
দুঃখজনক হলো, বাঘের হামলায় একের পর এক বনজীবী এবং কখনও মানুষের হামলায় বাঘের মৃত্যু হলেও রাষ্ট্র কখনোই এসব মৃত্যুতে কোনো যন্ত্রণা অনুভব করেনি। বিপন্ন সুন্দরবনের অসহায় ক্ষুধার্ত বাঘ ও সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল বনজীবী কারোরই খাদ্য সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করেনি রাষ্ট্র। ক্ষুধাকাতর মানুষ তো না হয় তার ভিটেমাটি ছেড়ে শহরে এসে পেটেভাতে দিনমজুরি কি চেয়েচিন্তেও বাঁচতে পারে। কিন্তু বন ছেড়ে বাঘের পক্ষে তো আর শহরে এসে দিনমজুরি বা ভিক্ষা করাও সম্ভব না। ক্ষুধাকাতর বাঘ তাহলে যাবে কোথায়? বাঁচবে কী করে? সুন্দরবনের বাঘ ও বনজীবীদের এই নিরাপত্তাহীনতাকে আড়াল করে সুন্দরবনকে প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যের শীর্ষে নেওয়ার এক রাষ্ট্রীয় জবরদস্তিও আমরা দেখেছিলাম।
২০০০ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার ভ্লাদিভস্টকের স্কুল পড়ুয়া ক্ষুদে শিশুদের সঙ্গে নাগরিক সমাজ বাঘের অধিকার রক্ষায় এক বর্ণাঢ্য র্যালি আয়োজন করেন। পরে এর সূত্র ধরে ‘সেভ দ্য টাইগার ফান্ডের’ সহযোগিতায় ফনিক্স নামের এক রাশিয়ান বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাঘ দিবসের সূচনা ঘটে। ডব্লিউ ডব্লিউ এফ এবং বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে রাশিয়াতে বিশ্ব বাঘ সম্মেলনের আয়োজন করে। যেখানে দুনিয়ার ১৩টি দেশ মিলে বাঘ রক্ষায় একটি সম্মিলিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে। এরই অংশ হিসেবে ডব্লিউডব্লিউএফ ২০১০ সালের ২৯ জুলাইকে বাঘ দিবস ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশেও বাঘ দিবস পালনের ধাক্কা লাগে। একক আয়তনে দুনিয়ার সবচে বড় ম্যানগ্রোভ বনভূমি সুন্দরবনের বাঘ রক্ষায় পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় ‘বিপন্ন বাঘ ও সুন্দরবন রক্ষার’ আহ্বান জানিয়ে বিশ্বব্যাংক, সেভ দ্য টাইগার ফান্ড এবং ইউএসএআইডি’ এর বিতর্কিত আইপ্যাক কর্মসূচির সহযোগিতায় খুলনা ও সাতক্ষীরার শ্যামনগরে বাঘ দিবস পালন শুরু করে। কিন্তু এইসব দিবস সুন্দরবনের বাঘ-বনজীবীর ঐতিহাসিক সম্পর্ককে দুম করে ‘সংঘর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। অথচ বনজীবীরা বিশ্বাস করেন মা বনবিবি হলো বাদাবনের রক্ষাকবচ। আর বনবিবির বাহন হলো বাঘ। বাঘের আক্রমণে সুন্দরবনে বনজীবীদের মৃত্যু হলে এখনও বলা হয় না ‘বাঘের আক্রমণে মরেছে’, বলা হয় নিহত লোকটি ‘বাদায় পড়েছে’ মানে বনে মরেছে।
চলতি বছরের বাঘ দিবসের প্রতিপাদ্য করা হয়েছে ‘আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর লোকায়ত বাঘ সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা’। বাঘ সুরক্ষায় আদিবাসী ও স্থানীয় বননির্ভর মানুষের লোকায়ত বিজ্ঞান, লোকবিশ্বাস, নানাবিধ কৃত্যমূলক ব্যবস্থাপনাকে বুঝতে হবে এবং সামগ্রিক বাঘ সুরক্ষায় এসব লোকায়ত দর্শন ও অনুশীলনকে মর্যাদা দিয়ে যুক্ত করতে হবে।
লেখক: গবেষক, প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ
- বিষয় :
- বাঘ
- পাভেল পার্থ
- আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস