ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপন ঠিকানা

আপন ঠিকানা
×

অলংকরণ :: শাফায়েত সাগর

দ্রোহী তারা

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০২ | আপডেট: ০১ আগস্ট ২০২৬ | ২০:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

বন্ধুত্বেরও কি বয়স হয়? হয়তো হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিবর্তিত হয় তার ভাষা, বদলে যায় যোগাযোগের ব্যাকরণ; এমনকি বদলে যায় একসঙ্গে থাকার সংজ্ঞাও। একসময় বন্ধুত্ব মানেই ছিল বিকেল নামলে পাড়ার গলির আড্ডা, চিঠির অপেক্ষায় থাকা কিংবা একজনের বাড়ির ল্যান্ডফোনে অন্যজনের ফোন আসার প্রতীক্ষা। আজ সেই জায়গাটি দখল করেছে মেসেঞ্জারের টুংটাং নোটিফিকেশন, রিলস শেয়ার আর একগুচ্ছ ইমোজির নীরব ভাষা। তবু মনের গহিনে একটি প্রশ্ন উঁকি দেয়– যোগাযোগের এই অভাবনীয় সহজতার যুগে আমরা কি সত্যিই বন্ধুর আরও কাছে পৌঁছেছি, নাকি অসংখ্য ভার্চুয়াল সংযোগের আড়ালে মানুষ দিন দিন আরও একা হয়ে পড়ছে?

আগস্টের প্রথম রোববার কিংবা জাতিসংঘের নির্ধারিত ৩০ জুলাই– তারিখ যা-ই হোক না কেন, বন্ধু দিবস এলেই সামাজিক মাধ্যমে পুরোনো ছবির অ্যালবামের ধুলো ওড়ে। বন্ধুর নামে লেখা হয় আবেগঘন স্ট্যাটাস, ইনবক্সে চালাচালি হয় ডিজিটাল শুভেচ্ছা। উৎসবের এই চাকচিক্যের আড়ালে সেই পুরোনো প্রশ্নটিই ফিরে আসে– বন্ধুত্বের আসল শক্তি কি প্রযুক্তির দ্রুততায়, নাকি সেই মানুষটির উপস্থিতিতে, যার সামনে কোনো ভণিতা ছাড়াই অকপটে বলা যায়, ‘বন্ধু, আমি ভালো নেই’?

নব্বইয়ের দশকের দৃশ্যপট ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তখন বন্ধুত্বের ভিত গড়ে উঠত শারীরিক উপস্থিতির উষ্ণতায়। দূরে থাকা বন্ধুর জন্য চিঠি লিখে ডাকপিয়নের অপেক্ষায় থাকার প্রহরগুলোতে মিশে থাকত এক অদ্ভুত মায়া। বন্ধু দিবসের আগের রাতে সুতো পেঁচিয়ে হাতে বানানো ‘ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ড’ কিংবা নিজের হাতে লেখা ছোট্ট চিরকুটের দাম যেকোনো বহুমূল্য উপহারের চেয়েও বেশি ছিল। কারণ, সেখানে সময়, অপেক্ষা ও অনুভূতির বিনিয়োগ ছিল। তখন কথায় কথায় ‘ব্লক’, ‘আনফলো’ বা ‘রেস্ট্রিক্ট’ করে সম্পর্কের দরজা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ ছিল না। অভিমান জমা হলে তা ভাঙাতে মুখোমুখি বসতে হতো। ফলে সেই বন্ধুত্বে যেমন উচ্ছ্বাস ছিল, তেমনি ছিল ধৈর্য, সহনশীলতা ও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার দায়বদ্ধতা।

কিন্তু প্রযুক্তির বিস্ফোরণে সেই বাস্তবতা আজ আমূল বদলে গেছে। এখন সামাজিক মাধ্যমের বন্ধু-তালিকায় কয়েক হাজার মানুষের বাস। এক ক্লিকেই দূরদেশের বন্ধুর সঙ্গে ভিডিওকলে কথা বলা যাচ্ছে, পুরোনো বন্ধুকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে বন্ধুত্বের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

তবে মুদ্রার উল্টোপিঠের চিত্রটি বেশ ভীতিকর। মানুষ ইতিহাসের যেকোনো সময়ের তুলনায় আজ সবচেয়ে বেশি ‘কানেক্টেড’, অথচ একই সময়ে ‘একাকীত্ব’ রূপ নিয়েছে এক নীরব বৈশ্বিক মহামারিতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সম্প্রতি একাকীত্বকে একক বৃহৎ জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পরিসংখ্যান বলছে, আধুনিক বিশ্বে প্রতি চারজন প্রাপ্তবয়স্কের একজন এবং তরুণদের একটি বড় অংশ তীব্র একাকীত্বে ভুগছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি একাকীত্ব দিনে ১৫টি সিগারেট খাওয়ার সমতুল্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে, যা হৃদরোগ, বিষণ্নতা ও অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

এই রূঢ় বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, ভার্চুয়াল জগতে ‘হাজার বন্ধু’ থাকা আর বাস্তবে একজন নির্ভরযোগ্য কাঁধ পাওয়া এক বিষয় নয়। একজন মানুষ প্রতিদিন অসংখ্য পোস্টে ‘রিঅ্যাক্ট’ দিতে পারেন, গ্রুপ চ্যাটে সরব থাকতে পারেন; কিন্তু দিন শেষে ব্যক্তিগত সংকটের মুহূর্তে নিজের মনের কথা বলার মতো কাউকে না-ও পেতে পারেন। কারণ, ডিজিটাল ‘কানেকটিভিটি’ আর আত্মিক ‘কানেকশন’ এক জিনিস নয়।

এর ওপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দৌরাত্ম্য এই সমীকরণকে আরও জটিল করেছে। এখন জন্মদিনের শুভেচ্ছা বা আবেগঘন বার্তাও এআইয়ের প্রম্পট দিয়ে লিখিয়ে নেওয়া যায়। এতে সময় বাঁচে ঠিকই, কিন্তু অনুভূতির জায়গাটি হয়ে পড়ে যান্ত্রিক। বন্ধুর দীর্ঘ নীরবতার পেছনের কারণ বুঝতে পারা, কোনো সমাধান না দিয়ে শুধু মন দিয়ে তার কথা শোনা কিংবা বিপদের সময় নীরবে পাশে বসা–এই কাজগুলো কোনো অ্যালগরিদম বা চ্যাটবট দিয়ে সম্ভব নয়।

তবে প্রযুক্তিকে বন্ধুত্বের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোটাও অবিচার হবে। প্রশ্নটা হলো, আমরা প্রযুক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করছি। দূরদেশে থাকা প্রিয়জনের হাসিটা স্ক্রিনে দেখতে পাওয়া কিংবা বিপদের মুহূর্তে দ্রুত খবর পৌঁছানোর ক্ষেত্রে প্রযুক্তি আশীর্বাদই বটে।

তাই বন্ধুত্বের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো নতুন কোনো অ্যাপ বা অভিনব উপহার নয়। বরং ডিজিটাল কোলাহলের মাঝেও সম্পর্কের জন্য একটু সময় বের করা। শত শত অনুসারীর ভিড় থেকে সেই বন্ধুটিকে খুঁজে নেওয়া। অনেক দিন কথা না হওয়া বন্ধুকে হঠাৎ কল করে জিজ্ঞেস করা–‘কিরে, কেমন আছিস?’

প্রশ্নটি খুব সাধারণ। কিন্তু এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে বন্ধুত্বের সবচেয়ে পুরোনো, সবচেয়ে শাশ্বত ভাষা। কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নয়, কোনো ভার্চুয়াল রিয়েলিটিও নয়– একজন মানুষের আরেকজন মানুষের প্রতি অকৃত্রিম খোঁজই বন্ধুত্বের আসল প্রাণ। প্রযুক্তির এই অসীম সংযোগের যুগেও বন্ধুত্বের সবচেয়ে নিরাপদ ঠিকানা তাই আজও মানুষের হৃদয়।

আরও পড়ুন

×