বন্ধুত্বের বয়স বাড়ে না...
৪৩ বছর পর পেলাম শান্তিনিকেতনের বন্ধুকে
শান্তিনিকেতনে দোল উৎসবে কৃষ্ণা দেবীর সঙ্গে রোকেয়া সুলতানা
রোকেয়া সুলতানা
প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০৫ | আপডেট: ০১ আগস্ট ২০২৬ | ২০:২৩
পৃথিবীতে মাঝেমধ্যে এমন কিছু অলৌকিক বিস্ময় ঘটে, যা কল্পনাকেও হার মানায়। জীবন আর শিল্পচর্চার দীর্ঘ পথচলায় কত শত অভিজ্ঞতা জমা হয় কিন্তু কিছু সম্পর্ক সময়ের সুদীর্ঘ ব্যবধান, ভৌগোলিক দূরত্ব আর চার দশকের জমে থাকা ঝাপসা ধোঁয়াশাকে উপেক্ষা করে হৃদয়ে থেকে যায় চিরভাস্বর। আশির দশকের শুরুতে শান্তিনিকেতনের লাল মাটির আঙিনায় গড়ে ওঠা এমনই এক নিবিড় আত্মিক সখ্যের গল্প আজ চার দশক পর সামাজিক মাধ্যমের ভার্চুয়াল সূত্র ধরে নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
১৯৮১ সালের আগস্টের শেষভাগ। বিয়ের বয়স তখন মাত্র আট মাস; আমার বয়স মোটে একুশ পেরিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে, চেনা পরিমণ্ডল ও স্বজনদের মায়া কাটিয়ে মাস্টার্স করতে পৌঁছাই বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে। গুরু শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদের অশেষ উৎসাহ বুকে ছিল। ছিল ক্যানভাসে নিজেকে চেনার অদম্য স্বপ্ন। কিন্তু আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ পেয়ে বিশ্বভারতীর ‘আনন্দ সদন’ হোস্টেলে পৌঁছে অচেনা-অজানা পরিবেশের একাকিত্ব আর ভীতিতে মন উদাস হয়ে পড়ে। সুটকেস পাশে রেখে হোস্টেলের সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ের সিমেন্টের চত্বরে বসে একা একা মন খারাপ করে বসেছিলাম চোখে অশ্রু নিয়ে। ঠিক সেই মুহূর্তে দেবদূতের মতো এগিয়ে এসেছিল মণিপুরের মেয়ে কৃষ্ণা দেবী।
সংস্কৃতি ও ভাষার বৈচিত্র্য থাকলেও কৃষ্ণা মুহূর্তের মধ্যে মমতার চাদরে আপন করে নেয় আমাকে। চোখের জল মুছিয়ে চা খাওয়ানো, পরম নির্ভরতার আশ্বাসে ভরিয়ে দেওয়া আর অচেনা পরিবেশের ভীতি কাটাতে নিজের দুই শয্যার ঘরের একটি শয্যা ছেড়ে দিয়ে আমাকে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া–কৃষ্ণার সেই দেবদূতসম মিষ্টি হাসি, বুদ্ধিমত্তা, গভীর সংবেদনশীলতা আর নিঃস্বার্থ পরোপকারী মনোভাব আমার হৃদয়ে চিরতরে অম্লান হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে পারমিতা নামের আরেক জ্যেষ্ঠ সহপাঠীর সঙ্গেও গড়ে উঠেছিল আমাদের এক চমৎকার সখ্য।

বিশ্বভারতীতে কাটানো ১৯৮১ থেকে ১৯৮৩–এই দুটি বছর ছিল আমার আত্মিক ও শিল্পভাবনার প্রকৃত উন্মেষকাল। কলা ভবনের গাছতলায় প্রকৃতির পাঠ, মাটির গন্ধ আর কোপাই নদীর পারে ঘুরে বেড়ানো–সবকিছুতেই কৃষ্ণা ছিল পরম সহযাত্রী। কখনও ভোরে উঠে তালের রস খাওয়া, কখনও বা আমাদের বিশ্বস্ত রিকশাচালক রাজুর রিকশায় চড়ে বোলপুরের সেই ছোট্ট এক ফোঁটা শহরের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত ঘুরে বেড়ানো। আশ্বিন-কার্তিকে কাশবনের মধ্য দিয়ে হেঁটে রেলস্টেশনের দিকে যাওয়ার দিনগুলো ছিল যেন জীবনানন্দীয় কবিতার মতো। শহর থেকে যাওয়া মেয়েটিকে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে বিনয়, সরলতা আর নিজের ভেতরের ‘আমি’কে চেনার যে পাঠ শান্তিনিকেতন দিয়েছিল, আর এর পেছনে কৃষ্ণার অকৃত্রিম সহযাত্রিতার ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
১৯৮৩ সালের শেষের দিকে পড়াশোনা শেষ করে বাংলাদেশে ফিরে আসি। সেই যুগে ট্রাঙ্ক কল বুক করা কিংবা চিঠিপত্রের আদান-প্রদান ছিল বেশ দুরূহ। ধীরে ধীরে যোগাযোগের সুতোটি ছিঁড়ে যায়। এরপর যতবারই শান্তিনিকেতনে পা রেখেছি, পুরোনো বন্ধুদের কাছে ব্যাকুল হয়ে কৃষ্ণাকে খুঁজেছি। কেউ তাঁর কোনো সন্ধান দিতে পারেনি। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে কৃষ্ণাকে খুঁজে পাওয়ার এই তীব্র আকুলতা বুকে জমা ছিল এক নীরব বেদনার মতো।
দীর্ঘ ৪৩ বছর পর অবশেষে ঘটল সেই কাঙ্ক্ষিত বিস্ময়। সম্প্রতি হঠাৎ একদিন ফেসবুক মেসেঞ্জারে ফুটে ওঠে একটি বার্তা– ‘রোকেয়া, তুমি কি আমাকে চিনতে পারছ? আমি কৃষ্ণা...।’ নিজের চোখকে বিশ্বাস করা কঠিন ছিল! যে বন্ধুকে চার দশক ধরে মনে মনে খুঁজে চলেছি, সে নিজেই প্রযুক্তির ভেলা চড়ে খুঁজে বের করেছে আমাকে! ৪৩ বছরের স্তব্ধতা ভেঙে দুটি হৃদয় আবার এক হয়ে গেল এক নিমেষে।
এখন প্রতিদিনই সকালে আমাদের বার্তা বিনিময় হয়। কৃষ্ণা পাঠায় দিল্লিতে থাকা তাঁর কন্যার ছবি আর আমি শেয়ার করি আমার জীবনের দীর্ঘ পথচলার স্মৃতি। চার দশকের জমানো গল্পগুলো আমরা ধীরে ধীরে উন্মোচন করছি পরম মায়ায়। আজ জীবনের এতটা পথ পাড়ি দিয়ে আমার বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে–মানুষ যদি সৎ মনে ও হৃদয়ের গভীর থেকে কাউকে চায়, তবে সময় ও দূরত্ব হার মানতে বাধ্য। ৪৩ বছর পর কৃষ্ণা দেবীকে ফিরে পাওয়া যেন সেই জীবন সত্যেরই এক অনন্য ও সুন্দর আখ্যান।
লেখক: চিত্রশিল্পী
- বিষয় :
- বন্ধুত্ব
- রোকেয়া সুলতানা
- বিশ্বভারতী