প্রতিবেশী
'এক' চীনের বহু জাতি
মোহাম্মদ গোলাম নবী
প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২০ | ১৩:৪৩
এই মুহূর্তে চীন করোনাভাইরাসের কারণে ব্যাপকভাবে আলোচনায়। তবে আমার এই লেখাতে আমি চীনের উইগুরসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতি নিয়ে পাঠককে কিছু জানাতে চাই। অনেকেই বলেন, ইন্টারনেটের এই যুগে গুগল করে দরকারি সব জানা যায়। কিন্তু তারাও স্বীকার করবেন, গুগল করে চীনের সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা সম্ভব নয় ইংরেজি ভাষায় পর্যাপ্ত কনটেন্ট না থাকার কারণে। বাংলা ভাষায় চীন সম্পর্কে জানার সুযোগ আরও কম।
এ রকম একটি পরিস্থিতিতে চীন আন্তর্জাতিক বেতারে কর্মরত বাংলাদেশি লেখক ও সাংবাদিক আলিমুল হক এবং তার চীনা সহকর্মী ছাও ইয়ান হুয়া লিখিত দুটি বই 'চিন্ময় চীন' এবং 'চীনের সংখ্যালঘু জাতি' বাংলা ভাষায় পাঠককে চীন সম্পর্কে জানার অপূর্ব সুযোগ করে দিয়েছে। বইমেলায় বই দুটি পাওয়া যাচ্ছে। আর আমার সুযোগ হয়েছে দুটি বই পড়ার। প্রতিটি বইয়ে লেখার সঙ্গে মিলিয়ে ছবি থাকায় বর্ণনাগুলো আরও জীবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছে। মনোগ্রাহী বর্ণনা বই দুটি পাঠের আনন্দ বহুগুণে বাড়িয়েছে। প্রতিটি বই ২০০ পৃষ্ঠার এবং বইগুলো একবার পড়তে শুরু করলে শেষ না করে ওঠার উপায় নেই।
চীনের সংখ্যালঘু জাতি বইটি পড়ে জানতে পেরেছি যে, চীনে মোট জাতির সংখ্যা ৫৬। এর মধ্যে একটি বাদে বাকি ৫৫টিই সংখ্যালঘু জাতি। আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৩টি এবং সমতলে আরও বেশ কয়েকটি সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী থাকার কারণে দেশের মানুষের মনে যে কোনো দেশের সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী সম্পর্কে জানার একটি স্বাভাবিক কৌতূহল কাজ করে। বাংলাদেশে পত্রপত্রিকার সুবাদে যদিও আমরা ইসলাম ধর্মাবলম্বী চীনের উইগুর জাতির কথা জানি; কিন্তু চীনে আরও কয়েকটি সংখ্যালঘু জাতি আছে, যারা ইসলাম ধর্মাবলম্বী। মিডিয়াতে সেভাবে প্রচার না থাকায় তাদের কথা আমরা সেভাবে জানতে পারি না। এই লেখায় তাদের সম্পর্কেও কিছুটা আলোকপাত করা হয়েছে।
চীনকে চীনা ভাষায় বলা হয় চোং কুও। আর চোং কুওয়ের সমার্থক শব্দ হচ্ছে হুয়া সিয়া। হুয়া মানে সুন্দর আর সিয়া মানে বিশাল। অর্থাৎ চীন সুন্দর ও বিশাল দেশ। আয়তনে বাংলাদেশের চেয়ে ৬৫ গুণ বড়। আর লোকসংখ্যা বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ৭ গুণ বেশি। একক দেশ হিসেবে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মানুষ বাস করে চীনে।
চীনে ২০১০ সালে সর্বশেষ আদমশুমারি করা হয়। তাতে দেখা যায়, চীনের সংখ্যাগরিষ্ঠ হান জাতির লোকসংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯২ শতাংশ। বাকি ৮ শতাংশ হলো ৫৫টি সংখ্যালঘু জাতি। ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর ১৯৫৩ সালে প্রথম আদমশুমারি করা হয়। তাতে নিবন্ধিত জাতির সংখ্যা ছিল ৪০০-এরও বেশি। এর মধ্যে কোনো কোনো জাতির একাধিক নাম, কোনো কোনো জাতির একাধিক নামের ভিন্ন উচ্চারণ এবং কারও কারও বেলায় একটি জাতির ভিন্ন শাখা ছিল। এ নিয়ে পরবর্তীকালে আরও গবেষণা করা হয়। প্রায় ৩০ বছর ধরে নানা ধরনের গবেষণা শেষে আশির দশকে চীন সরকারের পক্ষ থেকে চীনে মোট ৫৬টি জাতি আছে বলে ঘোষণা করা হয়। তবে তখনও প্রায় সাড়ে ছয় লাখ মানুষকে 'অনির্ধারিত জাতিগত গ্রুপ'-এর অন্তর্ভুক্ত মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এসব মানুষ কোন জাতির, তা নির্ধারণ করা কঠিন। তবে এ কথা ঠিক যে, তারা হয় কোনো না কোনো জাতির সঙ্গে মিশে গেছেন কিংবা আলাদাই বসবাস করছে। কিন্তু তারা আলাদা জাতির সরকারি স্বীকৃতি পায়নি। চীনে সংখ্যালঘু জাতির মানুষেরা যে দলবদ্ধ হয়ে কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে বসবাস করে, সেটা বলা যাবে না। কারণ ৫৫টি সংখ্যালঘু জাতির মানুষ চীনের মোট আয়তনের প্রায় ৬০ ভাগ অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে মিলেমিশে বসবাস করছে। চীনের মূল ভূভাগে ২৩টি প্রদেশ, পাঁচটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ও চারটি কেন্দ্রশাসিত মহানগর রয়েছে। চীনের ইয়ুনান প্রদেশে সবচেয়ে বেশি জাতির মানুষ বাস করে। এখানে ৫৬টি জাতির মধ্যে ৫২টি জাতির মানুষ বাস করে। এর মধ্যে ২৫টি সংখ্যালঘু জাতির প্রতিটির লোকসংখ্যা পাঁচ হাজার বা এর চেয়ে বেশি।
চীনের ইতিহাস ও সংস্কৃতি পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো। ধর্মের দিক থেকে চীনের ধর্ম তাও। পরে চীনে দক্ষিণ এশিয়া থেকে বৌদ্ধ ধর্ম এবং প্রায় এক হাজার বছর আগে ইসলাম ধর্মের বিস্তার ঘটেছে। চীনের বিভিন্ন সংখ্যালঘু জাতির মধ্যে ইসলাম ধর্মাবলম্বী সংখ্যালঘু জাতি রয়েছে ১০টি। এগুলো হুই, উইগুর, কাজাখ, তুংসিয়াং, কিরগিজ, সালার, তাজিক, উজবেক, পাওআন ও তাতার। এর মধ্যে জনসংখ্যার দিক থেকে বেশি হলো হুই জাতি। তারা মূলত চীনের উত্তর-পশ্চিমাংশের নিংসিয়া হুই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে বাস করলেও চীনের অন্যান্য অঞ্চলেও বসবাস করে। সংখ্যালঘু জাতিগুলোর মধ্যে হুই জাতির মানুষ চীনের সবচেয়ে বেশি এলাকায় দেখা যায়। তারা মূলত হান ভাষা ব্যবহার করে। তবে কেউ কেউ আরবি ও ফার্সি জানে।
চীনের সবচেয়ে পরিচিত ইসলাম ধর্মাবলম্বী উইগুর জাতির জনসংখ্যা এক কোটির কিছু বেশি। জনসংখ্যার বিচারে উইগুর চতুর্থ বৃহত্তম সংখ্যালঘু জাতি। চীনা শব্দ উইগুর অর্থ 'একতা'। উইগুরদের পূর্বপুরুষরা যাযাবর ছিলেন। একসময় উইগুররা শামানিজম, মানিকাইজম, বৌদ্ধধর্ম ইত্যাদিতে বিশ্বাস করত। তবে এখন উইগুর জাতির মানুষ মূলত ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করে। উইগুরদের সাহিত্য ও সংস্কৃতি খুবই সমৃদ্ধ। তাদের সাহিত্য মূলত তিন ধরনের :লোক সাহিত্য, ধ্রুপদি সাহিত্য ও আধুনিক সাহিত্য। তারা গান গাইতে ও নাচতে পছন্দ করে। তারা ডোম্বেরা নামের একধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজায়। কোথাও ডোম্বেরা বাজানো হলে, যন্ত্রের সুর শুনে উইগুর নারী-পুরুষ, ছেলে-বুড়ো সবাই গোল হয়ে নাচতে শুরু করে। তাদের বিখ্যাত লোকসংগীতের নাম 'বারো মুকাম'। এই গান পুরোটা পরিবেশন করতে সারাদিন লাগে। এতে উইগুরদের সংগীত ও নাচে দক্ষতা ফুটে ওঠে। উইগুররা বারো মুকামকে ডাকে জাদুর মদ নামে। বারো মুকাম ছাড়া উইগুরদের বিয়ে সম্পূর্ণ হয় না। বারো মুকামকে ইউনেস্কো মানব জাতির অবস্তুগত ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। উইগুররা ফুলতোলা টুপি পরতে পছন্দ করে। নারী, পুরুষ, ছেলে ও বুড়ো সবাই এই টুপি পরতে পছন্দ করে। এই টুপির নাম তুও ফা। এই টুপি তাদেরকে অন্যদের থেকে আলাদা করে চিনতে সাহায্য করে। উইগুরদের খাবারও চীনে খুব জনপ্রিয়। বিশেষ করে তাদের তৈরি প্রায় এক মিটার লম্বা ভেড়ার মাংসের শিক কাবাব ও আটার তৈরি নান রুটি। তাদের তৈরি নান এখন সারা চীনেই পাওয়া যায়। উইগুররা খাওয়ার সময় অতিথিকে সবচেয়ে সম্মানের জায়গায় বসতে দেয়। খাবার গ্রহণের পর পরিবারের সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তি মোনাজাত পরিচালনা করেন। মোনাজাতে আলল্গাহর শুকরিয়া আদায় করা হয়। খাবারের সব এঁটো বাসন তুলে না নেওয়া পর্যন্ত অতিথিকে বসে থাকতে হয়। অতিথির আগে উঠে যাওয়াকে অশোভন বলে গণ্য করা হয়।
চীনের সংখ্যালঘু জাতিগুলোর প্রতিটি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত একটা বর্ণনা চীনের সংখ্যালঘু জাতি বইতে আছে। সেখানে মজার মজার গল্প এবং তথ্য আছে, যা জেনে অবাক হতে হয়। যেমন- হ্যচে জাতির মানুষের জীবনে মাছের গুরুত্ব অপরিসীম। পানি ও মাছ ছাড়া হ্যচে জাতির মানুষের জীবন কল্পনাও করা যায় না। তারা সারাবছর মাছ শিকার করে। এমনকি শীতকালে যখন নদীর ওপরিভাগ বরফে ঢেকে যায়, তখনও তারা মাছ শিকার করে। তারা মাছের চামড়া দিয়ে তৈরি পোশাক ও জুতা পরে। অতিথি আপ্যায়নে তাদের ঐতিহ্যবাহী রীতি হলো- ছুরি দিয়ে কাঁচা মাছ তুলে অতিথির মুখের সামনে ধরা। যদি অতিথি সেটা নির্দি্বধায় তা খেয়ে নেয়, তবে তাকে সত্যিকারের বন্ধুর মর্যাদা দেওয়া হয় ও সাদরে আপ্যায়ন করা হয়। আর যদি কেউ সেই মাছ খেতে না চায়, তাহলে তাকে বাড়িতেই ঢুকতে দেওয়া হয় না।
চীনের সংখ্যালঘু জাতির মধ্যে ৫৩টি জাতির নিজস্ব ভাষা আছে। এদের মধ্যে আবার ২১টি জাতির লিখিত ভাষা আছে। চীনের সংখ্যালঘু জাতিগুলোর মধ্যে চুয়াং জাতির লোকসংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এর পরেই আছে মান, হুই, মিয়াও, ই ও মঙ্গোলীয় জাতি। ধর্মপ্রাণ হুই জাতির মুসলমানরা চীনের সংখ্যালঘু জাতির মধ্যে তৃতীয় বৃহত্তম। তাদের সংখ্যা এক কোটিরও বেশি। হুই মুসলমানদের মসজিদগুলো ইসলামী সংস্কৃতির প্রতীক। চীনা ভাষায় মসজিদকে বলে 'ছিং চেন সি'। চীনা ভাষায় 'ছিং চেন' মানে 'অনাড়ম্বর ও নিরাভরণ'। হুই মসজিদগুলোতে নিয়মিত পঁাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের পাশাপাশি ইসলামী শিক্ষা দেওয়া হয়। হুইদের মসজিদের স্থাপত্য দুই ধরনের। একটি হলো, আরবীয় স্টাইলে গম্বুজওয়ালা মসজিদ। অন্যটি হলো, সনাতন চীনা স্টাইলের মসজিদ। পাহাড়ি
এলাকায় বসবাসকারী হুইরা নিজেদের বাসভবনে একটি অতিরিক্ত তলা নির্মাণ করেন। এই তলা তারা সাধারণত ধর্ম পালনের কাজে ব্যবহার করেন।
মহাপ্রাচীরের দেশ চীন এখন অর্থনীতির বড় শক্তি এবং পৃথিবীর অনেক দেশেই চীনাদের নিজস্ব ব্যবসা-বাণিজ্য এলাকা চায়না টাউন আছে। সাম্প্রতিক করোনাভাইরাস আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, চীন কীভাবে সারাবিশ্বে তাদের নেটওয়ার্ক ছড়িয়েছে এবং কীভাবে সারাবিশ্ব চীনের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। অনেকেই এখন চীন সম্পর্কে আরও জানতে চাচ্ছেন। এটাই আমাদের সুযোগ চীনের ৯২ ভাগ জনসংখ্যার বৃহত্তম হান জাতির পাশাপাশি ৮ ভাগ জনসংখ্যার সংখ্যালঘু জাতিগুলো সম্পর্কে জানার।
লেখক ও উন্নয়নকর্মী
- বিষয় :
- চীনের বহু জাতি
