সাক্ষাৎকার
গণঅভ্যুত্থানের পরও ক্ষমতা জনগণের কাছে যায়নি
ফরহাদ মজহার
ফরহাদ মজহার
প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬ | ১০:২৮ | আপডেট: ০৩ আগস্ট ২০২৬ | ১৪:২৫
কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক ফরহাদ মজহার দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক তাত্ত্বিক। তিনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন বিকল্পের নীতিনির্ধারণী গবেষণা-উবিনীগ এবং নয়াকৃষি আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। সম্পাদনা করছেন ‘সাপ্তাহিক চিন্তা’। ১৯৬৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঔষধশাস্ত্রে স্নাতক এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের দ্য নিউ স্কুল ফর সোশ্যাল রিসার্চ থেকে অর্থশাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘গণঅভ্যুত্থান ও গঠন’, ‘মোকাবিলা’, ‘এবাদতনামা’, ‘সাম্রাজ্যবাদ’, ‘মার্কস, ফুকো ও রুহানিয়াত’, ‘ক্ষমতার বিকার’ ইত্যাদি। ফরহাদ মজহারের জন্ম ১৯৪৭ সালে, নোয়াখালীতে। এই সাক্ষাৎকারের প্রথম অংশ প্রকাশ হয়েছে রোববার; আজ প্রকাশ হলো দ্বিতীয় অংশ। সমকালের পক্ষে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সহসম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম।
সমকাল: অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, গণঅভ্যুত্থানের পরপরই বিএনপি ও জামায়াত মূলত সরকারি বিভিন্ন পদের ভাগ-বাটোয়ারায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
ফরহাদ মজহার: মাহফুজ আলম যে কথাটি বলেছেন, সেটিকে আমি নিছক বিএনপি-জামায়াতবিরোধী অভিযোগ হিসেবে দেখি না। তিনি এমন একটি বাস্তবতা সামনে এনেছেন, যা গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই পরিষ্কার হয়ে উঠছিল। জনগণ জীবন দিয়ে একটি ফ্যাসিস্ট সরকারকে উৎখাত করল, কিন্তু পুরোনো রাজনৈতিক দল, সামারিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী সঙ্গে সঙ্গে হিসাব করতে শুরু করল– নতুন পরিস্থিতিতে কার ভাগে কোন পদ, কোন প্রতিষ্ঠান, কোন ব্যবসা এবং কতখানি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পড়বে। বিএনপি ও জামায়াত অবশ্য মাহফুজের অভিযোগ অস্বীকার করে একে নিজেদের ব্যর্থতার দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা বলেছে। কাজেই তাঁর বক্তব্যকে আদালতে প্রমাণিত সত্য হিসেবে নয়, ক্ষমতার ভেতর থেকে দেখা একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণকারীর রাজনৈতিক সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। তবে তাঁর অভিযোগ সত্য কি মিথ্যা– শুধু এই প্রশ্নে আটকে থাকলে মূল রাজনৈতিক সমস্যা কিছু ধরা পড়বে না। আসল প্রশ্ন হলো, গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চরিত্র বদলেছিল কিনা। উত্তর হলো– না। রাষ্ট্রের ওপর জনগণের কর্তৃত্ব কায়েম হয়নি; বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের পুরোনো চেয়ারগুলোতে কার লোক বসবে, সেই প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। অর্থাৎ জনগণের গাঠনিক ক্ষমতাকে নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ার কাজে ব্যবহার না করে পুরোনো প্রতিষ্ঠান দখলের লড়াইয়ে নামিয়ে আনা হয়েছে।
সমকাল: গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে পুরাতনদের সঙ্গে নতুনদের দ্বন্দ্ব কীভাবে দেখেন?
ফরহাদ মজহার: এখানে ‘পুরোনোদের সঙ্গে নতুনদের দ্বন্দ্ব’ কথাটার মানে পরিষ্কার করা দরকার। এটি শুধু বয়স্ক নেতা বনাম তরুণ নেতার দ্বন্দ্ব না। বয়স এখানে আসল বিষয় নয়। ‘পুরোনো’ বলতে আমি বুঝি সেই রাজনৈতিক চিন্তা ও চর্চা, যেখানে রাষ্ট্রকে জনগণের যৌথ প্রতিষ্ঠান মনে করা হয় না; রাষ্ট্রকে মনে করা হয় বিজয়ীর মাল। যে দল ক্ষমতায় যাবে, প্রশাসন তার; পুলিশ তার; বিশ্ববিদ্যালয় তার; ব্যাংক, টেন্ডার, ব্যবসা তার প্রভাবের মধ্যে থাকবে। আওয়ামী লীগ এই ব্যবস্থাকে চূড়ান্ত ফ্যাসিস্ট রূপ দিয়েছিল। কিন্তু বিএনপি বা জামায়াত যদি একই রাষ্ট্রযন্ত্র দখল করে নিজেদের লোক বসানোকে রাজনৈতিক বিজয় মনে করে, তাহলে তারা হাসিনা ব্যবস্থার বিকল্প নয়; তারা সেই ব্যবস্থার পরবর্তী দাবিদার মাত্র। আর ‘নতুন’ বলতে শুধু নতুন দল বা তরুণ মুখ বোঝালে মারাত্মক ভুল হবে। নতুন হওয়ার অর্থ হলো রাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন ধারণা হাজির করা। নতুন শক্তিকে বলতে হতো– প্রশাসন কোনো দলের সম্পত্তি হবে না; বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়োগ হবে না; পুলিশ ক্ষমতাসীন দলের বাহিনী হবে না; বিচারক, আমলা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের নিয়োগ হবে প্রকাশ্য নিয়ম, যোগ্যতা এবং জনগণের কাছে জবাবদিহির ভিত্তিতে। কিন্তু নতুনদের বড় অংশও পুরোনো দলের মতোই পদ, মন্ত্রণালয়, কমিশন, মনোনয়ন ও প্রভাবের ছোট রুটি ভাগ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। মাহফুজ আলম নিজেও পরে লিখেছেন, নতুন প্রজন্ম নিজেদের হাতের তালুর চেয়েও ছোট রুটি ভাগাভাগিতে ব্যস্ত। অথচ তাদের সামনে আরও বড় ঐতিহাসিক কাজ ছিল।
সমকাল: এই পরিস্থিতি যে হতে পারে, সেটা কি মাহফুজরা বুঝতে পারেননি?
ফরহাদ মজহার: আমি যখন গণঅভ্যুত্থানের এই পরিণতির কথা বারবার বলেছি, মাহফুজরা তাতে কর্ণপাত করেননি। গণঅভ্যুত্থানের তরুণদের সরাসরি দমন না করে কৌশলে তাদের রাষ্ট্রের ভেতরে জায়গা দেওয়া হয়। কাউকে উপদেষ্টা করা হয়, কাউকে কমিটিতে নেওয়া হয়, কাউকে নিরাপত্তা ও মর্যাদা দেওয়া হয়। এরপর তাদের সামনে এমন প্রশাসনিক কাজের পাহাড় দাঁড় করানো হয়, যাতে তারা ধীরে ধীরে নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য হারিয়ে ফেলে। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্র বদলাতে গিয়ে তারা রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যবস্থাপক হয়ে যায়। শেষে পুরোনো রাষ্ট্রই তাদের বদলায়; তারা রাষ্ট্রকে বদলাতে পারে না। তরুণ উপদেষ্টাদের সামনে একদিকে ছিল পুরোনো আমলাতন্ত্র, অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াতসহ প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর চাপ, তার সঙ্গে সামরিক কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও হিসাব, ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থ এবং বিদেশি শক্তির কূটনৈতিক তৎপরতা। সরকারের নিজের স্থায়ী রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল না। ফলে প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তাকে পুরোনো শক্তিগুলোর সঙ্গে আপস করতে হয়েছে। মাহফুজ আলম নিজেও বলেছিলেন, সরকারের মধ্যে সারাক্ষণ পদ হারানোর ভয় কাজ করত এবং আমলারা পরবর্তী সরকারের অপেক্ষায় কাজের গতি কমিয়ে দিয়েছিলেন।
সমকাল: এই পরিস্থিতির জন্য গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বের দায় কতখানি?
ফরহাদ মজহার: মাহফুজ আলমসহ ছাত্রনেতৃত্বের দায় মোটেও এড়ানো যাবে না। শুধু বিএনপি, জামায়াত বা এস্টাবলিশমেন্টকে দোষ দিলে হবে না। গণঅভ্যুত্থানের নেতারা ৫ আগস্টের পর জনগণের স্বাধীন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেননি। পাড়া-মহল্লা, কারখানা, বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্রামে জনগণের পরিষদ গড়ে ওঠেনি। তারা সেটা চিন্তা করতে পারেননি। তারা নির্বাচনবাদী রাজনীতির বাইরে নিজেদের ভাবতে পারেননি। গণঅভ্যুত্থানে জনগণ তাদের নেতৃত্ব মেনে নিয়েছিল। কিন্তু তারা নিজেদের আরেকটি আওয়ামী লীগ বা বিএনপি হওয়ার অধিক কিছু ভাবতে পারেননি। ব্যর্থ হয়েছে। এনসিপি আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও বিএনপির মতোই আরেকটি নির্বাচনবাদী দল। আর মাহফুজ আলম এখন ‘অল্টারনেটিভস’ করছেন। হাসিনাকে নির্বাচন দ্বারা নয়, গণঅভ্যুত্থান দ্বারা হটাতে হয়েছে। তাহলে নতুন রাষ্ট্র গঠন এমনকি নিদেনপক্ষে সংস্কারও যে নির্বাচনের দ্বারা সম্ভব না– সেটা তো এখন পরিষ্কার। তাহলে বর্তমান পরিস্থিতির দায় মাহফুজ আলম এড়াতে পারবেন না। পুরোনো রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের বাইরে ভাবতে শহীদ পরিবার, আহত যোদ্ধা, শ্রমিক, কৃষক, নারী এবং সাধারণ সৈনিকদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে গণঅভ্যুত্থানের কোনো জাতীয় পরিষদ তৈরি করা হয়নি। ফলে ছাত্রনেতাদের শক্তি জনগণের সংগঠিত ক্ষমতা থেকে আসেনি; তাদের শক্তি নির্ভর করেছে উপদেষ্টা পদ, সরকারি স্বীকৃতি ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ওপর। এর দায় ছাত্রনেতাদের নিতে হবে। জনগণ পিংপং খেলার বল না। আমরা যেমন খুশি তেমন খেলতে পারি না।
সমকাল: গণঅভ্যুত্থানে তরুণদের অবদান তো স্বীকার করতে হবে।
ফরহাদ মজহার: তরুণদের অবদান অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। কিন্তু তরুণদের মারাত্মক রাজনৈতিক ভুল তাদের রাজনৈতিক অজ্ঞতা, পেটিবুর্জোয়া অহংকার এবং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার অনীহা থেকে জাত। যার নিজের সংগঠিত জনশক্তি নেই, সে রাষ্ট্রের ভেতরে ঢুকে রাষ্ট্রকে বদলাতে পারে না। বরং পুরোনো রাষ্ট্র তাকে বিচ্ছিন্ন করে, ব্যবহার করে এবং শেষে ফেলে দেয়। তরুণদের ক্ষেত্রে অনেকটা সেটাই ঘটেছে। তারা ভেবেছিল, সরকারের কয়েকটি পদে থাকা মানেই ক্ষমতায় থাকা। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের চেয়ার আর রাজনৈতিক ক্ষমতা এক জিনিস নয়। সচিব যদি কথা না শোনে, পুলিশ যদি অন্য কেন্দ্রের নির্দেশ মানে এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত যদি অন্য জায়গায় হয়, তাহলে উপদেষ্টার পদ কাগুজে ক্ষমতা মাত্র।
সমকাল: বিএনপির ভূমিকা কীভাবে দেখবেন?
ফরহাদ মজহার: বিএনপির ভূমিকা এখানেও আলাদা করে দেখতে হবে। দলটি দীর্ঘদিন ফ্যাসিস্ট দমনপীড়নের শিকার হয়েছে; তার নেতাকর্মীরা জেল, মামলা, গুম ও নির্যাতনের মুখে পড়েছে। তাই আওয়ামী লীগের পতনের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজেদের বঞ্চিত লোকদের জায়গা দেওয়ার দাবি তাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু ন্যায়বিচার আর দলীয় দখল এক কথা নয়। অন্যায়ভাবে বঞ্চিত কোনো যোগ্য ব্যক্তিকে ফিরিয়ে দেওয়া এক জিনিস; প্রশাসনকে দলীয় অনুগতদের মধ্যে ভাগ করা আরেক জিনিস। বিএনপি যদি এই পার্থক্য না বোঝে, তাহলে তারা আওয়ামী লীগের দলীয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে শেষে নিজেদের দলীয় রাষ্ট্র বানাবে।
সমকাল: জামায়াতে ইসলামী?
ফরহাদ মজহার: জামায়াতের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, দমন ও রাজনৈতিক বঞ্চনাকে তারা প্রশাসনিক প্রভাব বাড়ানোর যুক্তি বানাতে পারে না। তারা যদি নিজেদের নৈতিক ও আদর্শিক রাজনীতির দাবিদার মনে করে, তাহলে তাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত ছিল দলনিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান গড়ার পক্ষে দাঁড়ানো। কিন্তু তারাও যদি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশাসন এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নিজেদের অনুসারী বসানোর প্রতিযোগিতায় নামে, তাহলে ‘সৎ লোকের শাসন’ কথাটির আর নৈতিক দাবি থাকে না; তা দলীয় কর্তৃত্বের নতুন মোড়ক হয়ে দাঁড়ায়।
সমকাল: গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপি ও জামায়াতকে পদ ভাগাভাগি করার সুযোগ কে দিয়েছে?
ফরহাদ মজহার: ভাগ-বাটোয়ারার দায় শুধু যারা ভাগ নিয়েছে তাদের নয়। যারা রাষ্ট্রীয় পদকে ভাগ করার সম্পদ হিসেবে রেখে দিয়েছে, তাদেরও দায় আছে। নিয়োগের প্রকাশ্য নিয়ম কেন তৈরি করা হলো না? উপদেষ্টা সরকার কেন দলগুলোর সুপারিশ গ্রহণ করল? কেন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান পদে নিয়োগের জন্য স্বাধীন, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা দাঁড় করানো হলো না? কেন গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের বৃহত্তর জনগণকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আনা হলো না? উপদেষ্টা সরকার যদি সত্যিই পুরোনো রাজনীতির বাইরে নতুন ব্যবস্থা গড়তে চাইত, তাহলে প্রথম দিন থেকেই ঘোষণা করা উচিত ছিল– কোনো রাজনৈতিক দলের সুপারিশে কোনো নিয়োগ হবে না। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের যোগ্যতা, প্রক্রিয়া ও কারণ জনগণের সামনে প্রকাশ করা হবে এবং প্রশাসন দখলের যে কোনো দলীয় চেষ্টা প্রতিহত করা হবে।
সমকাল: অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন পরবর্তী সময়ে বলেছেন, উপদেষ্টা পরিষদের ভেতরে ‘কিচেন কেবিনেট’ ছিল।
ফরহাদ মজহার: ‘কিচেন কেবিনেট’ কথাটা শুনতে নিরীহ মনে হতে পারে। যেন সরকারের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি অনানুষ্ঠানিকভাবে বসে আলাপ করতেন। কিন্তু রাষ্ট্র চালানোর ক্ষেত্রে এর মানে মোটেও নিরীহ নয়। এর মানে হলো, যে সরকারকে আমরা বাইরে থেকে দেখেছি, তার পাশাপাশি ভেতরে আরেকটি অঘোষিত সিদ্ধান্ত-কেন্দ্র কাজ করত। আনুষ্ঠানিক উপদেষ্টা পরিষদ এক জায়গায়, আর গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আসল জায়গা আরেক জায়গায়। এই অভিযোগ সত্য হলে উপদেষ্টা সরকারের বৈধতা, জবাবদিহি ও ক্ষমতার চরিত্র– তিনটিই নতুন করে বিচার করতে হয়।
সমকাল: অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে কিচেন কেবিনেট থাকার রাজনৈতিক বার্তা কী?
ফরহাদ মজহার: এতে উপদেষ্টা সরকারের ব্যাপারে প্রথম যে বার্তা পাওয়া যায়, তা হলো, সরকারটি যৌথভাবে পরিচালিত হচ্ছিল না। প্রধান উপদেষ্টা ও কয়েকজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির চারপাশে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল। উপদেষ্টা পরিষদের সবাই সমানভাবে নীতিনির্ধারণে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাননি। কিছু মানুষ আসল সিদ্ধান্তের কাছে ছিলেন; বাকিরা ছিলেন দূরে। ফলে সরকারের ভেতরেই প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির উপদেষ্টা তৈরি হয়েছিল। দ্বিতীয় বার্তা হলো, সরকারের ঘোষিত কাঠামো আর বাস্তব ক্ষমতার কাঠামো এক ছিল না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে দ্বৈত ক্ষমতা কাঠামো বলা যায়– একটি দৃশ্যমান, অন্যটি অদৃশ্য। দৃশ্যমান কাঠামো জনগণের সামনে বিবৃতি দেয়, সংবাদ সম্মেলন করে এবং দায় বহন করে। অদৃশ্য কাঠামো সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু সিদ্ধান্তের দায় প্রকাশ্যে নেয় না।
সমকাল: সরকারের ভেতরে সরকার থাকার তাৎপর্য কী?
ফরহাদ মজহার: এই ব্যবস্থা বিশেষভাবে বিপজ্জনক। কারণ কোনো সিদ্ধান্ত ব্যর্থ হলে দায় কার, তা বোঝা যায় না। আনুষ্ঠানিক উপদেষ্টা বলতে পারেন, সিদ্ধান্ত তাঁর ছিল না। আবার অনানুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তদাতাদের পরিচয় ও ভূমিকা প্রকাশ্য না হওয়ায় তাদের জবাবদিহির আওতায়ও আনা যায় না। ক্ষমতা থাকে, কিন্তু দায় থাকে না। এটিই কায়েমি ক্ষমতার সবচেয়ে পছন্দের ব্যবস্থা। এর মানে, কয়েকজন তরুণ মুখ সরকারে থাকলেই তরুণদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। তারা যদি জনগণের কাছে জবাবদিহি না করে, বরং প্রধান উপদেষ্টা বা কোনো অঘোষিত গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করে, তাহলে তারা জনগণের প্রতিনিধি থাকে না; ক্ষমতার সাজসজ্জায় পরিণত হয়। তাদের উপস্থিতি দিয়ে সরকার নিজেকে গণঅভ্যুত্থানের সরকার বলে দেখাতে পারে, কিন্তু সিদ্ধান্তের আসল নিয়ন্ত্রণ অন্য জায়গায় রেখে দিতে পারে।
সমকাল: অন্তর্বর্তী সরকার কি তাহলে জনসাধারণের কাছে জবাবদিহিমূলক ছিল না?
ফরহাদ মজহার: আগেই বলেছি, ৫ আগস্ট জনগণ গাঠনিক শক্তি হিসেবে হাজির হয়েছিল। কিন্তু ৮ আগস্ট সেই শক্তিকে পুরোনো সাংবিধানিক ব্যবস্থার মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর যদি একটি অঘোষিত ছোট গোষ্ঠী সরকার পরিচালনার প্রধান সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তাহলে জনগণের গাঠনিক ক্ষমতা শুধু সংবিধানের কাছেই হার মানেনি; তা কয়েকজন অনির্বাচিত ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূতও হয়েছে। অর্থাৎ জনগণের অভ্যুত্থান থেকে জনগণের সরকার তৈরি হয়নি। তৈরি হয়েছে জনগণের নামে পরিচালিত একটি সীমিত উপদেষ্টা শাসন, যার ভেতরে আবার আরও ছোট একটি ক্ষমতাকেন্দ্র কাজ করেছে। এই ব্যবস্থাকে কোনোভাবেই গণঅভ্যুত্থানের স্বাভাবিক পরিণতি বলা যায় না। বরং এটি গণঅভ্যুত্থানকে নিয়ন্ত্রণ, শীতল ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় নামিয়ে আনার একটি কৌশল। এস্টাবলিশমেন্ট সাধারণত এভাবেই কাজ করে। তারা সব সময় সামনে আসে না। তারা এমন একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী তৈরি করে, যাদের সঙ্গে আমলাতন্ত্র, নিরাপত্তা কাঠামো, ব্যবসায়ী স্বার্থ ও বিদেশি শক্তির যোগাযোগ সহজ হয়। বড় উপদেষ্টা পরিষদে মতভেদ, প্রশ্ন ও বিরোধ থাকতে পারে; ছোট গোপন বৃত্তে দ্রুত সমঝোতা করা যায়। এই কারণে কিচেন কেবিনেট গণতান্ত্রিক শাসনের বদলে নিয়ন্ত্রিত শাসনের লক্ষণ। আমার কাছে ‘কিচেন কেবিনেট’ ধারণার সবচেয়ে বড় বার্তা হলো, গণঅভ্যুত্থানের পরও ক্ষমতা জনগণের কাছে যায়নি।
সমকাল: এর শিক্ষা কী?
ফরহাদ মজহার: জুলাই আমাদের শিখিয়েছে– গোপন ক্ষমতা কেন্দ্রের বিরুদ্ধে শুধু মুখ বদল যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কোথায়, কার দ্বারা, কোন নিয়মে এবং কার স্বার্থে নেওয়া হচ্ছে, জনগণের তা জানার ও নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার থাকতে হবে। নইলে ফ্যাসিস্ট শাসক চলে যায়, কিন্তু অস্বচ্ছ রাষ্ট্র থেকে যায়।
সমকাল: আমাদের দীর্ঘ সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
ফরহাদ মজহার: সমকালকেও ধন্যবাদ।
- বিষয় :
- ফরহাদ মজহার
- সাক্ষাৎকার