ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জনপ্রশাসন

সব আমলা ঘুমান না, কেউ কেউ জেগে

সব আমলা ঘুমান না, কেউ কেউ জেগে
×

গওহার নঈম ওয়ারা

গওহার নঈম ওয়ারা

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৫৭ | আপডেট: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৫৮

সিলেটের ডিসির ঘটনায় অশোক খেমকার কথা মনে পড়েছিল। ২০০৪ সালের ডিসেম্বরের সুনামির পর পরিচয়। ভারত মহাসাগর তীরবর্তী ১৪টি দেশে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এবং দুই লক্ষাধিক প্রাণহানি ঘটানো ভয়াবহ দুর্যোগের পর তামিলনাড়ুর প্রত্যন্ত অঞ্চলে বেঁচে যাওয়া জেলে পরিবারগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজের সুযোগ হয়েছিল। আইসিএস-আইএএস ক্যাডারের তরুণ অফিসারদের রাতদিন কাজ করতে দেখেছি।

তামিলনাড়ুর সুনামিতে মোট মৃত্যুর তিন-চতুর্থাংশই নাগাপট্টিনাম জেলায়। তার অধিকাংশই জেলে। সুনামির ১০ দিন পর সেখানকার কিচানকুপ্পম জেলেপল্লিতে পৌঁছে বিশ্বাস হচ্ছিল না আগে এখানে মানুষের হই-হুল্লোড় ছিল। আক্কারাইপেট্টাই, ভেলাঙ্কান্নিসহ আশপাশের মৎস্যগ্রাম সবচেয়ে বড় আঘাত সহ্য করে তখনও দাঁড়িয়ে ছিল। 
বিহার আইএএস ক্যাডারের মি. মিশ্র দ্বারভাঙ্গার মানুষ হওয়ায় ভালো বাংলা বলতেন। এক দিন সন্ধ্যায় রুটি-সবজি খেতে খেতে বললেন, ‘কাল আমরা চাউল পাকাব, তুমি আসবে। অশোক স্যার থাকবেন কয়েক দিন।’ অশোক খেমকা মূলত পশ্চিমবঙ্গের লোক; জন্ম ১৯৬৫ সালে কলকাতায়। পরে আইএএস ক্যাডারে যোগ দিয়ে পুরো প্রশাসনিক জীবন মূলত হরিয়ানা রাজ্যেই কাটে।

অশোক খেমকার কর্মজীবন ভারতীয় আমলাতন্ত্রে সততা, সংঘাত এবং ঘন ঘন বদলির বিরল উদাহরণ বিবেচিত হয়। ভাত খেতে খেতে জানিয়েছিলেন, বদলির হাফ সেঞ্চুরি পার হয়ে গেছে। প্রায় ৩৪ বছরের চাকরিজীবনে অনেক দপ্তরে কাজ করেছেন; কোথাও কয়েক মাস থেকে এক-দুই বছরের বেশি থাকতে পারেননি।

খেমকার মন্তব্য এখনও কানে বাজে– ‘সততার পুরস্কার হলো অপমান।’ পরে জেনেছি, বাক্যটি তাঁর কর্মজীবনের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন হিসেবে ভারতে ব্যাপকভাবে উদ্ধৃত হয়। তিনি আরেক আইএএস অফিসার এস.আর. শংকরনকে গুরু মানতেন। অনেকের মতে, শংকরন ভারতের সবচেয়ে সমাজমুখী আইএএস কর্মকর্তা। অশোক খেমকার মতো তাঁকে সুটকেস খোলার আগেই বারংবার বদলির মুখোমুখি হতে না হলেও বেশ কয়েকবার গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে কম প্রভাবসম্পন্ন পদে পাঠানোর 
ঘটনা ঘটে।

প্রশাসন ও রাজনীতির ঠোকাঠুকির মধ্যে শংকরন সবসময় ন্যায্যতা, আইন, অনুশাসনকে প্রাধান্য দিয়েছেন। যখন প্রয়োজন হয়েছে; দলিত, আদিবাসী ও ভূমিহীনদের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। জেলা কালেক্টর থাকাকালে ভূমি সংস্কার, বন্ডেড লেবার মুক্তি এবং দরিদ্রদের জমির অধিকার নিয়ে সক্রিয় ভূমিকা নেন। স্থানীয় জমিদার, প্রভাবশালী গোষ্ঠী, রাজনীতিবিদদের অনুরোধ বা চাপ তিনি সহজে মেনে নিতেন না। তিনি মনে করতেন, নকশাল-প্রভাবিত এলাকায় শুধু পুলিশি অভিযান নয়, সামাজিক ন্যায়বিচার ও উন্নয়নের মাধ্যমেও বিদ্রোহ মোকাবিলা করতে হবে। ভুগেছেন সারাজীবন কিন্তু সত্যকে ছাড়েননি। 

অশোক খেমকাকে প্রশ্ন করেছিলাম, চেয়ারে বসতে না বসতে বদলির মতো হেনস্তা ব্যথিত করে না?

‘দেখো, দুনিয়াটায় কিছুই স্থায়ী নয়; না পদ, না পদবি। শুধু সত্যটাই স্থায়ী। আমার আয়নার কাচ মুছতে হয় না।’ শেষের বাক্যটি ছিল মরমি কবি কবিরের। কবিরের হাত ধরে লালন চলে আসে আলোচনায়। হিন্দি অনুবাদে অশোক গুনগুন করেন– ‘সত্য সুপথ না চিনিলে/ পাবিনে মানুষের দরশন’।

এ দেশেও অশোক খেমকারা আছেন। তরুণ ম্যাজিস্ট্রেট রোকন-উদ-দৌলা ভেজাল খাদ্য, নকল পণ্য, অনিরাপদ খাদ্যের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। পরে তাঁকে ম্যাজিস্ট্রেসি থেকে অপসারণ এবং ওএসডি করা হয়। এই সময় ক্ষুব্ধ হয়ে মন্তব্যের জের ধরে তাঁকে শেষ পর্যন্ত প্রধান বিচারপতি, সরকার এবং সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হয়। 

ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এএইচএম শফিকুজ্জামানকে নিয়েও সরকারের মধ্যে অস্বস্তি ছিল। বাজার সিন্ডিকেট ও কারসাজি নিয়ে প্রকাশ্য অবস্থান নেওয়ায় এক শ্রেণির ব্যবসায়ী তাঁর বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক থাকাকালে তাঁর নেওয়া পদক্ষেপগুলোর মধ্যে ছিল ই-কমার্স খাতে প্রতারণার বিরুদ্ধে অভিযান। এ ছাড়া নীতিনির্ধারক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে দৃশ্যমান ও সক্রিয় করে তুলেছিলেন।

আরেকজন আমলার কথা শোনা যায়; সর্বশেষ জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের মহাপরিচালক হিসেবে অবসর নেওয়া মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী। এর আগে তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের মহাপরিচালক, মিল্ক ভিটার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। তারও আগে পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম বন্দর, ওয়াসা, বিদ্যুৎ, খাদ্য নিরাপত্তা, সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু কোথাও বেশিদিন থাকতে পারেননি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ঊর্ধতন মহলের অন্যায় আবদার না মানায়। 
বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রে সবচেয়ে সাহসী ছিলেন সাদাসিধা মিজানুর রহমান। ম্যাজিস্ট্রেট থেকে শেষমেশ যুগ্ম সচিব হয়েছিলেন। ব্যাচের কারও আগে তো নয়ই, বরং প্রায় সবার পরে পেয়েছিলেন সে পদটা। অথচ তাঁর দাপ্তরিক কাজ, সময়জ্ঞান, জীবনযাত্রা, সততা, নিষ্ঠা– সবই ছিল কিংবদন্তিতুল্য।

এ দেশে দুর্গম জেলা-উপজেলায় বদলি করে অপছন্দের আমলাদের শাস্তি দেওয়ার এক রীতি চালু আছে। সেটাকে আমলাতন্ত্রের ভাষায় বলে ‘পানিশমেন্ট পোস্টিং’। মিজানুর রহমানকে এ রকম বদলি হতেও হয়েছে। শোনা যায়, এক প্রতাপশালী রাষ্ট্রপতির মা তাঁকে ‘দোয়া করতে’ ডেকেছিলেন। তিনি নাকি বলেছিলেন– ‘মা, অবশ্যই আমি আপনার ছেলের মতো। আপনি দোয়া করবেন এ তো খুশির কথা। তবে আপনার বড় ছেলেকে বলে এই ছোট ছেলেকে এখান থেকে বদলির ব্যবস্থা করেন। তাহলে হয়তো আপনার আত্মীয়দের উপকার হতে পারে।’ বলা বাহুল্য, এ রকম আশ্চর্য বেয়াদবির ফল তিনি হাতে হাতে পেয়েছিলেন। 

গণতন্ত্রের জয়যাত্রায় গণেশ উল্টালেও মিজানুর রহমানদের কপালে একই দুর্ভোগ থেকে যায় আঠার মতো লেপ্টে। রাষ্ট্রপতিদের বদলে আসে প্রধানমন্ত্রীদের যুগ। মন্ত্রিসভার এক নম্বর মন্ত্রী তাঁর এক দিলপাহেচানের জামিন চেয়ে কোনো এক জেলা প্রশাসকের কাছে সালাম পাঠালে নিরুপায় জেলা প্রশাসক তাঁকে বিনীতভাবে জানিয়েছিলেন, ‘স্যার, আমি বড় বিপদে আছি। আমার এক পাগল ম্যাজিস্ট্রেট কারও কথা শোনে না। আপনি নিজে বললে ভালো হয়।’ এক নম্বর মন্ত্রী ‘নিজে’ বলেছিলেন। বলা বাহুল্য, তাতেও কাজ হয়নি। এ রকম মিজানদের তুলাদণ্ডে কোনো ফের নেই। তাই তাদের জন্য কোনো পুরস্কার নেই, পদোন্নতিও নেই। এমন নিশ্চয় আরও কেউ কেউ আছেন। বেঁচে থাকুন কারও অন্যায় আবদার না শোনা পাগলাটে দুই-একজন আমলা। তারা উচ্চকণ্ঠে গাইতে থাকুন লালনের গান– ‘খরিদ্দার মহাজন যে জন বাটখারাতে কম/ তারে কসুর করবে যম’।

গওহার নঈম ওয়ারা: লেখক ও গবেষক

[email protected]

আরও পড়ুন

×