আন্তর্জাতিক
ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় প্রতীকী পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়
.
মাহা নাসের
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:০১ | আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১১:৩৯
২০২৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের বার্ষিক সাধারণ অধিবেশন শুরু হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির ইস্যুটি প্রাধান্য বিস্তার করবে। জাতিসংঘের মোট সদস্য রাষ্ট্র ১৯৩-এর মধ্যে এখন প্রায় ১৫০টি রাষ্ট্র ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এবারের সম্মেলনের আগে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও যুক্তরাজ্য সর্বশেষ এ স্বীকৃতি দিয়েছে। আগামী দিনে এ সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। কারণ বেশ কয়েকটি দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে একই ধরনের স্বীকৃতি ঘোষণা করতে পারে।
গ্লোবাল সাউথের প্রায় সবকটি দেশ রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ তালিকায় বেশ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ তাদের নাম যুক্ত করল। এটা ফিলিস্তিনিদের একটি স্বাধীন, সার্বভৌম এবং স্বশাসিত জাতি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এক বড় কূটনৈতিক জয়। বিপরীতে এটি ইসরায়েলের জন্য বড় কূটনৈতিক ক্ষতি, বিশেষ করে ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের হামলার পর পশ্চিমারা ইসরায়েলের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মেলানোর মাত্র দুই বছর পর যখন এটি ঘটেছে।
এই কূটনৈতিক মুহূর্তটি কয়েক দশক ধরে তৈরি হয়েছে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ইস্যুতে প্রতীকী কূটনৈতিক অগ্রগতি আগেও ঘটেছে। আবার রাষ্ট্রের সম্ভাবনা এমন ঘটনার মুখেও অর্থহীন প্রমাণিত।
ফিলিস্তিন রাষ্ট্র কায়েমের সংগ্রাম শুরু হয়েছে ১৯৬৭ সাল থেকে। আরব রাষ্ট্রগুলোর একটি জোটের বিরুদ্ধে ছয় দিনের যুদ্ধকালে ইসরায়েল ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের অবশিষ্ট অংশ দখলের মাধ্যমে সেখানে সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, যা পূর্বে ছিল জর্ডান নদী থেকে পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ভূমির একাংশ।
যুদ্ধ শেষে ইসরায়েল পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গাজা উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। ১৯৪৮ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ইসরায়েল নতুন দখল হওয়া অঞ্চলগুলোতে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের নাগরিকত্ব প্রদানে অস্বীকৃতি জানায়। তদুপরি ইসরায়েলি সরকার সামরিক আদেশের মাধ্যমে এসব অঞ্চলে ফিলিস্তিনিদের ওপর জবরদস্তি শুরু করে।
এই আদেশগুলো ফিলিস্তিনিদের জীবনের প্রায় প্রতিটি দিক নিয়ন্ত্রণ করত, যার অনেক আদেশ এখনও বহাল রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো ফিলিস্তিনি কৃষক পশ্চিম তীরে কোনো ইহুদি বসতির আশপাশে জলপাই চাষ করতে চান, তাহলে তাদের অনুমতিপত্রের দরকার হবে। অথবা যদি কোনো গাজার শ্রমিক ইসরায়েলের ভেতরে গিয়ে কাজ করতে চান, তাহলেও তাদের ইসরায়েলি অনুমতিপত্রের প্রয়োজন হয়। এমনকি পূর্ব জেরুজালেমের কোনো মসজিদ বা গির্জায় প্রার্থনা করতে পারাও ইসরায়েলি অনুমতির ওপর নির্ভরশীল।
এই অনুমোদনের শর্ত দখলকৃত অঞ্চলে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের সব সময় মনে করিয়ে দেয়– নিজেদের দৈনন্দিন জীবনের ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ইতোমধ্যে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ফিলিস্তিনি পতাকা প্রকাশ্য প্রদর্শনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
এ ধরনের নীতিমালার মাধ্যমে তারা ফিলিস্তিনি জাতীয়তার ধারণা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেছিল। পতাকা ও দখলকৃত অঞ্চলে ফিলিস্তিনিদের জাতীয় পরিচয়ের অন্য কিছু প্রকাশ পেলে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়ার নিয়ম জারি ছিল। এ ধরনের নীতি ১৯৬৯ সালে তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার দ্বারা প্রকাশিত একটি বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে যায়। তিনি বলেছিলেন, ‘এই অঞ্চলে ফিলিস্তিনি বলে কিছু নেই।’
মেয়ার যখন মন্তব্যটি করেছিলেন, একই সময়ে ফিলিস্তিনিরা নিজস্ব রাষ্ট্র-ধারণা ঘিরে সংগঠিত হতে শুরু করে। যদিও এ ধারণা আগেও উত্থাপিত হয়েছিল। ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিসরে এক প্রস্তাবের মাধ্যমে এটি আনুষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। ফিলিস্তিন জাতীয় কাউন্সিলের একটি অধিবেশনকালে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল, যা প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের আইনসভা। ১৯৬৪ সালে দখলকৃত অঞ্চলগুলোতে ফিলিস্তিনিদের সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে এটি গঠিত হয়। এই প্রস্তাবে ফিলিস্তিনে একটি স্বাধীন, ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ডাক দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে সমগ্র ইসরায়েল রাষ্ট্র অন্তর্ভুক্ত ছিল, যেখানে মুসলিম, খ্রিষ্টান ও ইহুদি সবার সমান অধিকার থাকবে।
সেই মুহূর্ত থেকে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি সংগ্রাম দুটি পথ বেছে নেয়। এক, কূটনৈতিক চাপ; দুই, সশস্ত্র প্রতিরোধ। কিন্তু বাস্তব ঘটনাবলি কায়রো প্রস্তাবের কল্পনা অনুসারে সবার জন্য একক রাষ্ট্রের ধারণা দুর্বল করে দেয়।
অসলো চুক্তির প্রতি মোহভঙ্গ ২০০০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় এবং অনেক বেশি সহিংস ইন্তিফাদার জন্ম দেয়। আরাফাতের পর ফিলিস্তিনি নেতা মাহমুদ আব্বাস রাষ্ট্র কায়েমে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য আবারও জোরালো প্রতিক্রিয়া জানাতে থাকেন। আর ২০১২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ফিলিস্তিনের মর্যাদা উন্নীত করার পক্ষে ভোট দেয়, যা ফিলিস্তিনকে ‘অ-সদস্য পর্যবেক্ষক’ থেকে ‘অ-সদস্য পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র’ হিসেবে উত্তীর্ণ করে।
তত্ত্বগত দিক থেকে এর অর্থ– ফিলিস্তিনিরা এখন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে প্রবেশাধিকার পেয়েছে। যেমন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালত। কিন্তু ফিলিস্তিনি সার্বভৌমত্বের মর্যাদায় যে কোনো অর্থবহ পরিবর্তন করতে হলে তা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে আসতে হবে; জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মাধ্যমে নয়।
অসলো প্রক্রিয়ার বাইরে যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনভাবে রাষ্ট্রত্ব লাভের বিরোধিতা করে আসছে। যতক্ষণ নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো থাকবে, ততক্ষণ সত্যিকার অর্থে সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও আলোচনার টেবিলের বাইরে থাকবে। আর এটিই সত্য, এমনকি ভিন্ন ভিন্ন সদস্য হিসেবে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মতো নিরাপত্তা পরিষদের অন্যরা যা-ই করুক না কেন। প্রকৃতপক্ষে বহু ফিলিস্তিনি ও অন্য সমালোচকরা বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বলছেন, পশ্চিমা দেশগুলো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রত্বের বিষয়টি ব্যবহার করছে ইসরায়েলকে তার কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য করার দায় এড়াতে। এটা তাদের জন্য আরও চ্যালেঞ্জিং কূটনৈতিক কাজ, বিশেষত জাতিসংঘ যখন ইতোমধ্যে ইসরায়েলি ওই কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা বলে চিহ্নিত করেছে।
মাহা নাসের: অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকান স্টাডিজ স্কুলের সহযোগী অধ্যাপক; দ্য কনভারসেশন থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- আন্তর্জাতিক
- ফিলিস্তিন
- জাতিসংঘ
- স্বীকৃতি
