আন্তর্জাতিক
ডিল মেকার ট্রাম্প কি পারবেন গাজায় শান্তি আনতে?
মঞ্জুরে খোদা
মঞ্জুরে খোদা
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:২৩ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৫ | ১১:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
ফিলিস্তিন-ইসরায়েল দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে জটিল ও বিপুল আলোচিত বিষয়গুলোর একটি। দুই বছর আগে শুরু হওয়া গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন তাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বিপুল রক্তক্ষয় ও ধ্বংসযজ্ঞ এদিকে ইসরায়েলের বর্বর চরিত্রকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, অন্যদিকে গাজাবাসীর প্রতি বিশ্ব জনমত যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি পোক্ত হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা হাজির করেন। সেই পরিকল্পনার আওতায় ইতোমধ্যে বন্দিবিনিময় ও যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ কার্যকর হলে বিশ্বব্যাপী একদিকে স্বস্তি, আরেকদিকে সংশয় তৈরি হয়েছে।
গাজার খান ইউনিস, রাফাহ ও নুসেইরাতের রাস্তায় নেমে আনন্দ-উৎসব করা হচ্ছে। তারা শান্তি প্রক্রিয়ার এই পদক্ষেপকে ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ ও ‘শান্তির সূচনা’ বলে অভিহিত করছে। তবে হামাসের একটি অংশ ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে গাজায় সরাসরি মার্কিন প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা বলে অভিহিত করছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি জনগণের মধ্যে এ বিষয়ে মতভিন্নতা আছে। তারা একদিকে জিম্মিদের ফিরে পাওয়ায় আনন্দিত, অন্যদিকে হামাসের সঙ্গে এ ধরনের সমঝোতার জন্য সরকারের ওপর চাপ তৈরি করছে। ইসরায়েলের রক্ষণশীল নেতারা মনে করছেন, এ চুক্তির মাধ্যমে হামাসকে রাজনৈতিকভাবে বৈধতা দেওয়া হবে।
গাজা যুদ্ধের একটি ভয়াবহ ও অমানবিক বিষয় ছিল উভয় পক্ষের জিম্মি ও বন্দিদের দুরবস্থা। ট্রাম্পের পরিকল্পনার প্রথম ধাপের পদক্ষেপ হিসেবে হামাস এর মধ্যে ইসরায়েলি সেনা ও বেসামরিক জিম্মিদের মধ্যে কয়েকজনকে মুক্তি দিয়েছে। তার পাল্টা হিসেবে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি নারী ও কিশোর বন্দিদের মুক্তি দিয়েছে। এর মাধ্যমে এ দুই পক্ষের মধ্যকার আপাত গভীর ক্ষত ও অবিশ্বাসের মেঘ কিছুটা কেটেছে।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ ফাওয়াজ জারজেসের মতে, এ পরিকল্পনাকে একটি শান্তি প্রক্রিয়া বললে ভুল হবে। কারণ এটি মূলত হামাসকে ‘আত্মসমর্পণ’ বা ধ্বংসের শর্ত সৃষ্টি করছে। প্রকৃতপক্ষে এটি কোনো শান্তির প্রক্রিয়া নয়; বরং একপক্ষীয় দাবির অর্জন বলা যায়।
বিখ্যাত ফিলিস্তিনি ইতিহাসবিদ অঁতোয়ান রাফুল সংশয় প্রকাশ করে বলেছেন, ‘এই ২০ দফা পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত বহু অধিকার আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।’ এর মধ্যে গাজাকে একটি ‘বৃহত্তর বন্দিশালা’য় পরিণত করার একটা প্রবণতা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, ‘এতে তাদের নিজ ভূখণ্ডের সীমান্তে চলাফেরা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ থাকবে, যা ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও স্বাধীনতার জন্য হুমকি।’
অন্যদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান এ পরিকল্পনাকে ‘সুদূরপ্রসারী শান্তি প্রচেষ্টা’ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তিনি বলছেন, এটি একটি সুযোগ খুলে দিচ্ছে, যদি সব পক্ষ আন্তরিকভাবে অংশগ্রহণ করে, মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা যায় এবং গাজার ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তগুলো স্থানীয় জনগণ ও আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে হয়। ট্রাম্প প্রশাসন এ চুক্তিকে নিজেদের কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে অভিহিত করছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তাদের এ পদক্ষেপকে মধ্যপ্রাচ্যে ‘টেকসই শান্তির প্রথম ধাপ’ হিসেবে বর্ণনা করছেন।
জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা এ প্রচেষ্টাকে সতর্কতার সঙ্গে স্বাগত জানিয়েছেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সেখানকার মানবাধিকার নিয়ে যেমন সোচ্চার আছেন, তেমনি এ চুক্তিকে মানবিক সংকট লাঘবে সহায়ক, তবে দীর্ঘমেয়াদি ন্যায়বিচার, গাজার পুনর্গঠনে পশ্চিমা শক্তির দায়িত্বশীলতা দাবি করেছেন।
কী আছে ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনায়?
তিনি তাঁর পরিকল্পনাকে মূলত তিনটি স্তরে ভাগ করেছেন। প্রথমত, তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি ও মানবিক পদক্ষেপ; দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক সমঝোতা ও বন্দিবিনিময়; তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী শান্তির কাঠামো নির্মাণ। এই ২০ দফার মূল দাবি বা উল্লেখযোগ্য দিকগুলো– (১) গাজা ও ইসরায়েলে অস্ত্রবিরতি ও আন্তর্জাতিক তদারকি। (২) বন্দি ও জিম্মি বিনিময় (উভয় পক্ষের নারী, শিশু, অসুস্থ ও বেসামরিক ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার)। (৩) গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশ নিশ্চিত করা। (৪) ‘একটি অস্থায়ী প্রশাসনিক অঞ্চল গঠন, যেখানে জাতিসংঘ ও আঞ্চলিক শক্তিগুলো (মিসর, কাতার, জর্ডান) ভূমিকা রাখবে। (৫) ভবিষ্যতে স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের জন্য পর্যায়ক্রমিক আলোচনা। (৬) ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে মার্কিন প্রতিশ্রুতি। (৭) হামাসের রাজনৈতিক পুনর্গঠন ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ।
ডোনাল্ড ট্রাম্প মূলত ‘ডিল মেকিং কূটনীতিক’ ধারা অনুসরণ করে এই চুক্তির পর্যায়ে উপনীত হয়েছেন। এ ধরনের কূটনৈতিক কৌশল আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বা সংঘাতের সমাধান করতে আলোচনার বদলে পারস্পরিক সুবিধাজনক চুক্তি বা ‘ডিল’-এর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কেননা, প্রথাগত কূটনীতি অনেকটা দীর্ঘমেয়াদি ও সময়সাপেক্ষ হয়ে থাকে। এটিকে অনেকে একটি বাস্তববাদী উদ্যোগ বলে অভিহিত করছেন। কেননা, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের কারণে উভয় পক্ষই ক্লান্ত এবং যুদ্ধবিরতি ছাড়া কোনো আলোচনাও সম্ভব হচ্ছিল না।
সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। তিনি এ পরিকল্পনাকে ‘দৃঢ় ও বুদ্ধিবৃত্তিক’ অবস্থান বলে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি মনে করেন, এ যুদ্ধ শেষ করার অর্থ গাজার জনগণের তাৎক্ষণিক মুক্তি, আর্থিক ও মানবিক সংকট মোকাবিলার একটি সুযোগ। একই সঙ্গে ইসরায়েলও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। তবে তা নির্ভর করছে চুক্তির শর্তগুলো বাস্তবায়নের ওপর।
মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস বলে, এ অঞ্চলের কোনো শান্তি টেকসই হয় না। শুধু কূটনৈতিক ঘোষণা নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পারস্পরিক আস্থা ও বাস্তবিক সমঝোতা। যদি ইসরায়েল ও হামাস উভয়ই এ প্রক্রিয়ায় আন্তরিক থাকে, তবে হয়তো বহু দশকের সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা সম্ভব হবে। বিশেষত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন, হামাসের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, গণহত্যার বিচার, বিবদমান পক্ষগুলোর দায়বদ্ধতা ও গাজা পুনর্গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করা না গেলে এ শান্তির প্রচেষ্টা হবে ভঙ্গুর ও ক্ষণস্থায়ী।
অনেকে মনে করেন, ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে এটি ট্রাম্পের এক প্রকার ‘কূটনৈতিক প্রদর্শনী’র আয়োজন। যাতে তিনি প্রমাণ করতে পারেন– বাইডেনের মধ্যপ্রাচ্যনীতি ছিল ভুল। এতে তিনি ইসরায়েলপন্থি মার্কিন ভোটারদের সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হবেন।
ড. মঞ্জুরে খোদা: লেখক-গবেষক
ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
