ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

অভিযুক্তের কন্যার প্রতি অমানবিকতা

অভিযুক্তের কন্যার প্রতি অমানবিকতা
×

সাইফুর রহমান তপন

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:৩৭ | আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২৫ | ১১:৫২

পুলিশি অভিযানে গ্রেপ্তারকালে এক পিতা ও তার শিশুকন্যাকে চড় মারার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। রোববার সমকাল খোঁজ নিয়ে জানিয়েছে, মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পুলিশি অভিযান চলাকালে রুস্তম নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর তার সাত-আট বছরের কন্যা বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে। শিশুটির অনুনয়, তার বাবাকে যেন ছেড়ে দেয় পুলিশ। তখন একজনকে রুস্তমের গালে চড় মারতে দেখা যায়। এতে শিশুটি ‘আব্বা’ বলে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকলে তাকেও চড় মারা হয়। শেষ পর্যন্ত অবশ্য রুস্তমসহ অন্যরা শিশুটিকে বুঝিয়ে সেখান থেকে সরিয়ে দেন। আর রুস্তমের ঠাঁই হয় কারাগারে।

পুলিশ বলছে, রুস্তম মাদক কারবারি। প্রতিবেদন অনুসারে, বৃহস্পতিবার ভোরে জেনেভা ক্যাম্পে মাদক কারবারি দুটি পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের সময় ককটেল বিস্ফোরণে নিহত হয় মো. জাহিদ (২০) নামে এক তরুণ। তার বিরুদ্ধেও মাদক কারবারে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগ ছিল। তার মৃত্যুর পর সেখানে অভিযান চালায় পুলিশ, র‌্যাব ও সেনাবাহিনী। সেই প্রেক্ষিতে রুস্তমের গ্রেপ্তার নিয়ে প্রশ্ন তোলার হয়তো সুযোগ নেই। তবে সামাজিক মাধ্যমে চড় মারার দৃশ্যটি জনমানসে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। অশ্রুসিক্ত কন্যশিশুকে পিতার সামনে কিংবা কন্যাটির সামনে পিতাকে মারধর অমানবিক ও বেআইনি বটে। 

এই অভিযোগও উঠেছে, অভিযানে থাকা পুলিশ সদস্যদেরই কেউ কন্যার সামনে পিতা ও কন্যাকে চড় মেরেছেন; যদিও ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার সমকালকে বলেছেন, অভিযান-সংশ্লিষ্ট কেউ গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে চড় মারেননি। সহকর্মীদের পক্ষে সাফাই গাওয়া– পুলিশ কেন, সব বাহিনীরই পুরোনো অভ্যাস। তাই উপকমিশনার সাহেবের ওই বক্তব্যে বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ নেই। এমনকি কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অপেশাদার আচরণের প্রমাণ পেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাতেও আশ্বস্ত হওয়ার সুযোগ কম।

২০১৩ সালে প্রণীত ‘নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন’-এ ভুক্তভোগীরা নিরাপত্তা হেফাজতে শারীরিক এমনকি মানসিক নির্যাতনেরও বিচার চাইতে পারেন। কিন্তু এর প্রয়োগ নেই বললেই চলে। আইনটি প্রণয়নের সাত বছর পর, ২০২০ সালের ৯ জানুয়ারি প্রকাশিত বিবিসির এক প্রতিবেদন বলেছে, তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, ২০১৯ সাল পর্যন্ত ওই আইনে মাত্র ১৭টি মামলা হয়েছে। অথচ ওই সময়ে হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে শতাধিক; নির্যাতনের তো পরিসংখ্যানই নেই।

কথা ছিল, গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির পর অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতনেরও অবসান ঘটবে। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের মুখপাত্ররা এমন দাবিও করেন, সত্যিই নাকি ওইসব নৃশংস ঘটনা তাদের সময়ে ঘটেনি। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন বলছে, এ বছরের প্রথম ৯ মাসে পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর হেফাজতে ৩৪ জনের অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটেছে। জেলখানাতে এ সময়ে সংঘটিত অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা আরও বেশি; ৬৯টি। রুস্তমকে চড় মারার ঘটনা নিঃসন্দেহে হেফাজতে মৃত্যুর তুলনায় নগণ্য। তবে তা যে বেআইনি এবং ‘বদলে যাওয়া’ পুলিশের সঙ্গে যায় না– সেটা স্বীকার করতে হবে।

এটাও মনে রাখতে হবে, রুস্তমকে নির্যাতন করা হয়েছে তারই শিশুকন্যার সামনে। আবার শিশুটিকেও নির্যাতন করা হয়েছে। এতে তো ওই শিশুকে শুধু শারীরিক নয়, মানসিক নির্যাতনও করা হলো। এই ঘটনা শিশুটিকে যদি ট্রমার মধ্যে ফেলে দেয়, তার দায় কে নেবে?

দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের রাষ্ট্র, সরকার এমনকি সমাজের কাছেও এর কোনো উত্তর আপাতত নেই। প্রায় দেড় বছর ধরে যারা রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমে জাতিকে উদ্ধারে ব্যস্ত, তাদের কাছেও সম্ভবত এর উত্তর নেই। আর পুলিশ নিজেই তো সম্ভাব্য অভিযুক্ত।

সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×