সমকালীন প্রসঙ্গ
প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসম্পন্ন বিকল্প ধারা
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ: ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪৫ | আপডেট: ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১১:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলো ভোট ভোট করে বটে, তবে ভোটের মূল কারিগর জনগণের ওপর তারা নির্ভর করে না। কখনও কখনও জনসমর্থন তাদের দরকার হলেও প্রশাসনিক আনুকূল্যের সঙ্গে অর্থ ও পেশি বল তাদের চূড়ান্ত ভরসা হয়ে ওঠে। ক্ষমতায় থাকার জন্য তারা সাম্রাজ্যবাদের ওপর নির্ভর করে।
বিগত সময়ে জামায়াত ও হেফাজত দুই সাম্প্রদায়িক দলের সঙ্গে প্রধান দুই দলের দহরম-মহরম আমরা দেখেছি। এতে স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলুণ্ঠিত হলেও তাদের কোনো পরোয়া ছিল না। ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি নৃশংস গণহত্যা ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আমাদের দেশে সর্বজনীন হয়নি। বামপন্থিরা ইসরায়েলি গণহত্যা ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তবু দৃষ্টিগ্রাহ্য প্রতিবাদ করেছে; বুর্জোয়া এবং দক্ষিণপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ তাতে ছিল না। এতেই বোঝা যায় তারা কত বেশি সাম্রাজ্যবাদনির্ভর।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আদর্শবাদিতা নিম্নস্তরে নেমে গেছে, স্বার্থবাদিতা প্রবল হয়েছে। আগে ছাত্ররা রাজনীতি করত জনগণের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। এখন করে অর্থনৈতিক মুনাফা ও লুণ্ঠনের অভিপ্রায়ে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশজুড়ে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মস্তানি, মব ভায়োলেন্স ব্যাপকভাবে বেড়েছে। জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের দণ্ড মওকুফসহ নানাভাবে ছাড় দেওয়া হয়েছে। দেশজুড়ে মৌলবাদীদের ঘৃণ্য তৎপরতা এতে চরম আকার ধারণ করেছে।
বাংলাদেশ জাতি রাষ্ট্র নয়, মুসলিম রাষ্ট্রও নয়। এখানে বিভিন্ন জাতিসত্তা রয়েছে। অন্তত সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। শাসকশ্রেণির দলগুলো নিজেদের জাতীয়তাবাদী বলে বড়াই করে। অথচ অন্য জাতিসত্তার কোনো স্বীকৃতি দিতে চায় না।
প্রয়োজন হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসম্পন্ন একটি বিকল্প ধারা, যার সামনে লক্ষ্য হিসেবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা থাকবে। যে গণতন্ত্রে সমাজতন্ত্রের উপাদান আছে, যে ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তি হলো ইহজাগতিকতা এবং যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদমুক্ত অঙ্গীকার আছে; সেই ধরনের অঙ্গীকার নিয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের জন্য গণভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠন করা প্রয়োজন।
আমাদের দুর্ভাগ্য, বাম দলগুলো বড় দুই দলের ব্যর্থতাজনিত সুযোগ কাজে না লাগিয়ে এদিক-সেদিক ঘোরাফেরা করেছে। দশকের পর দশক সময়োচিত কর্মসূচি দিয়ে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম গড়ে তুলতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। তবে বামপন্থিদের ব্যর্থতার পরেও তাদের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি; গণচেতনার সংগ্রামের জন্য এখনও তাদের প্রয়োজন আছে।
জনগুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও স্থানীয় ইস্যু নিয়ে রাজনীতি করা দরকার; অথচ শাসকশ্রেণির রাজনৈতিক দলগুলো তা করে না। স্থানীয় পর্যায়ে সন্ত্রাস দমন, দুর্বল ও সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা বাড়ানো, যুব উন্নয়নে পাঠাগার স্থাপন, প্রশিক্ষণ দান ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, দুর্যোগে-বিপদে সাহায্য-সহযোগিতা করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নেই, শ্রমিকের কর্মসংস্থান নেই; বরং চালু কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, সাম্রাজ্যবাদ, দুর্নীতি, অগণতান্ত্রিকতা প্রভৃতি জাতীয় পর্যায়ের প্রধান ইস্যু এখন। এসব জাতীয় ইস্যু নিয়ে আন্দোলনের বিকল্প কিছু নেই।
আন্দোলনের মাধ্যমে শক্তি বাড়ানো যায়। সকল পর্যায়ে আন্দোলন প্রয়োজন। গণসচেতনতা বাড়ানোর জন্য সংস্কৃতিকর্মী ও ছাত্ররা কাজ করবেন। এ ব্যাপারে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সভা-সমাবেশ করা প্রয়োজন। নেতৃত্ব ওপর থেকে আসবে না, স্থানীয় পর্যায় থেকে তা গঠন করতে হবে। ছাত্র ও সংস্কৃতিকর্মীদের আমরা গুরুত্ব দেব। শ্রেণিচ্যুতরা গরিবদের পাশে দাঁড়াতে পারে কিন্তু আদর্শচ্যুতরা তা পারবে না। স্থানীয়, জাতীয় পর্যায়ে পেশাগতদের আন্দোলনে দরকার। স্থানীয় সরকার গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু করা দরকার স্থানীয় সরকারকে।
সিভিল সোসাইটিকে আমি তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না। তারা নিজেদের অরাজনৈতিক বলে ঘোষণা দেয়, কিন্তু কাজটা করে রাজনৈতিক। সিভিল সোসাইটি নতুন ধারণা, এটি আগে ছিল না। তারা দারিদ্র্য বিমোচনের কথা বলে অথচ ক্ষুদ্রঋণের ফাঁদে ফেলে অসহায় গরিবকে দারিদ্র্যের উচ্চসীমায় পৌঁছে দিচ্ছে। কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ মানুষেরা কেউ বাস্তুচ্যুত হয়ে পালিয়ে যায়, আবার আত্মহত্যারও অজস্র ঘটনা ঘটেছে এনজিও ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে।

দেশে এখন যে সরকার বিদ্যমান, তাদের প্রধানেরা এনজিও সংস্থার লোকজন। দাতার বেশে সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের স্বার্থে এনজিওগুলো দিয়ে কাজ করায়। এনজিওগুলোকে টাকা দেয়, তৎপরতা বাড়িয়ে দেয়। সরকারের সমান্তরাল এনজিওর প্রতিনিধিদের বিদেশ ভ্রমণ করানো, তাদের প্রশংসা করা, পুরস্কৃত করার ব্যবস্থা করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের মতো এনজিওর এত তৎপরতা নেই। সেখানে আছে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা। এনজিওর কর্মকর্তাদের জীবনের সঙ্গে গরিবদের জীবনের কেনো মিল নেই। সরকারি আমলার সমান্তরালে তাই এনজিও প্রতিনিধিদের দাঁড় করানো হচ্ছে। সিভিল সোসাইটির লোকেরা এনজিওর প্রতিনিধি, তারা রাজনীতিক নন। তবে রাজনীতির বাইরে যে নন, সেটা তো প্রমাণিত হয়ে গেছে।
আমাদের দাঁড়াবার জায়গা হচ্ছে সংস্কৃতি। সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রে মাতৃভাষার গুরুত্ব বেড়েছে। আমরা গণতান্ত্রিক বিশ্ব চাই কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী, পুঁজিবাদী ও আধিপত্যবাদী বিশ্ব চাই না। আমরা এমন গণতান্ত্রিক বিশ্ব চাই, যেখানে সমঅধিকার ও সহমর্মিতা হবে সম্পর্কের ভিত্তি। রাষ্ট্রের অধীনে নাগরিকদের অধিকার সংহত থাকবে।
বাংলাদেশে যারা উদারনীতির চর্চা করেছেন এবং যারা ভেবেছেন উদারনীতির মাধ্যমে একটা ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তন আসবে, আজ তারাও বুঝতে পেরেছেন সাম্রাজ্যবাদ কত নৃশংস ও আক্রমণাত্মক হতে পারে। আমাদের দেশের ভূমি, বন্দরেও সাম্রাজ্যবাদের চোখ পড়েছে। সরকার ওগুলো তাদের হাতে তুলে দেবার তালে আছে। আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার কোনো মূল্য নেই তাদের কাছে। এই উপলব্ধি সর্বজনীন হয়েছে।
আমাদের স্থানীয়ভাবে কাজ করতে হবে, আন্দোলন করতে হবে মুক্তির জন্য। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বড় আন্দোলন প্রয়োজন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। গণমুক্তির লক্ষ্যে এ উপলব্ধিকে কাজে লাগাতে হবে। নয়তো বছরান্তে একাত্তরের বিজয় দিবস আসা-যাওয়া করবে। আমাদের সমষ্টিগত বিজয় নিশ্চিত হবে না।
সচেতন আদর্শবাদী মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে সকল জাতিসত্তার সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার ভিত্তিতে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে হবে। ঘরে-বাইরে নৃশংসতা ও ভোগবাদিতা প্রবল হচ্ছে। সমাজ রূপান্তরের জন্য সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী স্থানীয় ও জাতীয় আন্দোলন গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
