ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রাজনীতি

জাতীয়তাবাদের পরীক্ষা এখনও চলছে

জাতীয়তাবাদের পরীক্ষা এখনও চলছে
×

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪৪ | আপডেট: ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৩:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ


একাত্তরের যুদ্ধটা ছিল রাজনৈতিক। একদিক থেকে তা ছিল জাতীয়তাবাদের পরীক্ষা। বাঙালি জাতীয়তাবাদের শক্তি সে সময়ে বেশ জোরালো ছিল। সে-শক্তি ছিল ঐক্যের। বিপরীত দিকে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদও তখন পরীক্ষা দিয়েছিল। তার দুর্বলতা ছিল অনৈতিকতায় ও অনৈক্যের। পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের কৃত্রিমতাও তখন উন্মোচিত হয়ে যায়। ৫৬ জনের ওপর ৪৪ জন ঝাঁপিয়ে পড়েছিল; আক্রমণের চরিত্রটা ছিল গণহত্যার। পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের রক্ষকেরা পরিণত হয়েছিল হানাদার ঘাতক ও দস্যুতে; তাদের জোর ছিল শুধু অস্ত্রের। ওই যুদ্ধে ভারত যুক্ত হয়েছিল নিজস্ব জাতীয়তাবাদেরই তাগিদ থেকে। আমেরিকা, চীন, রাশিয়া– এদের সংযোগটাও যে ছিল জাতীয় স্বার্থজাত– সে বিষয়েও সন্দেহ নেই।

অনস্বীকার্য, বাংলাদেশের মানুষ ব্রিটিশ শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্তির আশায় পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদকেই আঁকড়ে ধরেছিল। এমনকি একাত্তরের প্রথম দিকেও এর প্রভাব কম ছিল না। ১ মার্চ ঢাকার স্টেডিয়ামে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা চলছিল পাকিস্তানি টিমের সঙ্গে ইংল্যান্ডের এমসিসি টিমের; পরিবেশটা ছিল রীতিমতো উৎসবমুখর। স্টেডিয়ামভর্তি বাঙালি দর্শক সবাই প্রবলভাবে পাকিস্তানি দলকে সমর্থন করছিল। কিন্তু ভরদুপুরে যখন শোনা গেল– গণপরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হয়েছে, অমনি দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে গেল। স্টেডিয়াম মুখরিত হলো ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে। আসন তছনছ করার সঙ্গে আগুন জ্বালানো হলো। পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাহারায় আশ্রয় নিতে হলো এমপি হোস্টেলে; অল্প কিছুদিনের মধ্যেই যে-আবাসটি পরিণত হয়েছিল বাঙালি নির্যাতনের কেন্দ্রে। 

পরিবর্তনটা অবিশ্বাস্য মনে হলেও মোটেই অস্বাভাবিক ছিল না। পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের প্রতি অবিশ্বাস গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছিল এবং আক্রমণের মুখে তা প্রতিরোধে পরিণত হয়েছিল। আক্রমণটা পাকিস্তানিরাই করেছে এবং কাজটা শুরু হয়ে গিয়েছিল সেই ’৪৭ সালেই। পাকিস্তানের জন্মের পর থেকেই। তবু সত্য এটাও– একদা বাঙালি মুসলমানই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল। তারা একই সঙ্গে বাঙালি ও মুসলমান ছিল। বাঙালিত্বটাই ছিল প্রধান; সেটিই ছিল স্বাভাবিক; তবে তারা নিজেদের মুসলমান পরিচয়টি সামনে নিয়ে এসেছিল রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আশায়। কিন্তু নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই দেখা গেল তাদের স্বপ্ন আক্রান্ত হয়েছে। ওই আক্রমণের মুখেই তারা তাদের বাঙালি পরিচয়ের কাছে ফিরে গেছে। ওই পরিচয়কেই প্রধান করে তুলেছে। আক্রমণটি চূড়ান্ত রূপ নিয়েছিল পঁচিশে মার্চ মধ্যরাতে। অখণ্ড পাকিস্তানকে ভেঙে ফেলার কাজটা বাঙালিদের হস্তক্ষেপের জন্য অপেক্ষা করেনি; পাকিস্তানি হানাদাররাই সেটা শুরু ও শেষ করেছে। 

বাঙালি মুসলমান কেন পাকিস্তানপন্থি হয়েছিল, তার ব্যাখ্যা অস্পষ্ট নয়। ড. খান সারওয়ার মুরশিদের পত্রিকা নিউ ভ্যালুজ-এ অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল, তাতেও ব্যাখ্যাটির দেখা পাওয়া যাবে। রাজ্জাক স্যার লেখার চেয়ে বলতেই পছন্দ করতেন বেশি। ওই প্রবন্ধ ড. মুরশিদ যে প্রকাশ করতে পেরেছেন, তাতে সম্পাদক হিসেবে তাঁর অনেক দক্ষতার একটির পরিচয় পাই। ‘দ্য মাইন্ড অব দি এডুকেটেড মিডল ক্লাস ইন দ্য নাইনটিনথ সেঞ্চুরি’ নামে প্রবন্ধটিতে অধ্যাপক রাজ্জাক দেখাচ্ছেন যে, শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত যেভাবে সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠছিল, তাতে বিলম্বে-উত্থিত শিক্ষিত মুসলিম মধ্যবিত্তের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সূত্রপাত ওই ঊনবিংশ শতাব্দীতেই; বিংশ শতাব্দীতে এসে দুই পক্ষের দূরত্ব বেড়েছে এবং মুসলিম মধ্যবিত্ত পাকিস্তানপন্থি হওয়া ছাড়া দৃষ্টিগ্রাহ্য গত্যন্তর দেখেনি। 

যুদ্ধ যখন তুঙ্গে তখন ভুট্টো একটি বই লেখেন দ্য গ্রেট ট্র্যাজেডি নাম দিয়ে; সে-বইতে মহাবিজ্ঞের মতো তিনি বলেন যে তিনি আশা করেন, সেনাবাহিনীর লোকেরা আওয়ামী লীগের শহুরে সদস্যদের নিরস্ত্র করার মধ্যেই নিজেদের কর্মক্ষেত্র সীমাবদ্ধ রেখেছে, গ্রামের মানুষকে ঘাঁটায়নি; কেননা, ঘাঁটালে সত্যিকারের বিপদ ঘটবে। তিনি জানতেন না যে সামরিক বাহিনীর পক্ষে গ্রামের মানুষের ওপর অত্যাচার না করে উপায় ছিল না। কারণ শহর-গ্রাম নির্বিশেষে বাংলাদেশের সব মানুষ তখন হানাদারদের বিরুদ্ধে এক হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। হানাদাররা অবশ্য কোনো তত্ত্বের পরোয়া করেনি। তারা সরাসরি গণহত্যায় নেমে পড়েছিল। 
ঢাকায় ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে প্রহসনের সংলাপ যখন চলছিল তখন ভুট্টোর সঙ্গে মুজিবের একবার দেখা হয়। প্রসিডেন্ট ভবনেই। মুজিব তাঁকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলেছিলেন, ‘এরা কিন্তু আগে আমাকে মারবে, তারপর তোমাকে।’ ভুট্টো নাকি নাটকীয়ভাবে জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমি সেনাবাহিনীর হাতে মরব তবু ইতিহাসের হাতে মরব না।’ এ খবর তিনি জানিয়েছেন আমাদেরকে, তাঁর ওই বইয়ের মারফত। তা ইতিহাসের জন্য অপেক্ষা করার দরকার পড়েনি; সেনাবাহিনীর হাতেই তো প্রাণ দিলেন ভুট্টো। 

এক পর্যায়ে তো ভুট্টো শেখ মুজিবকে বলেছিলেন­­– ‘তুম উধার আম ইধার’। ভাবটা অনেকটা ১৯৪৬-৪৭-এ অখণ্ড বাংলার হিন্দু মহাসভাপন্থিদের মতো; ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কায় যারা বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। ক্ষমতাই যদি না থাকল তাহলে তাতে দেশে থাকলেই বা কী, না-থাকলেই বা কী। মহাসভাপন্থিরাও জাতীয়তাবাদীই ছিলেন– হিন্দু জাতীয়তাবাদী।

সত্য এই যে, জাতীয় মুক্তির জরুরি প্রশ্নকে সবাই সমান গুরুত্ব দিতে পারেননি। পাকিস্তান রাষ্ট্রে বসবাসকারী বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের প্রভাব ছিল; ছিল আচরণগত অভ্যাস, এমনকি ওই জাতীয়তাবাদে আস্থা যে ছিল না, তাও নয়। যে জন্য দেখা যায়, একাত্তরের আগে তো বটেই, পরেও স্থানে স্থানে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের চিহ্ন রয়ে গেছে। বন্যার স্রোত নেমে গেলেও যেমন পানি আটকে থাকে, এখানে-সেখানে। যে কোনো বিশ্বাসের পক্ষেই মানসিক সম্পত্তি ও আশ্রয়ে পরিণত হওয়াটা কোনো অসম্ভব ঘটনা নয়। দক্ষিণপন্থিরা পাকিস্তানি ভ্রান্তিতে পতিত হয়েছেন। বামপন্থিদের একটি অংশকেও দেখা গেছে শ্রেণি প্রশ্নকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে জাতি প্রশ্নকে পেছনে ঠেলে দিয়েছেন। ফলে মুক্তিযুদ্ধে তাদের যেভাবে অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত ছিল, সেভাবে তারা অংশগ্রহণ করতে পারেননি। পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের বলয় থেকে বাঙালিকে যারা বের করে এনেছিলেন তাদের পেছনে ছিল জনমতের অকুণ্ঠ সমর্থন; ইয়াহিয়ার হাতে ছিল আগ্নেয়াস্ত্র। জনমতের জন্য জায়গা করে দেওয়াটা হতো ন্যায়সংগত; সেটা ঘটেনি। অস্ত্র দমন করতে চেয়েছে জনমতকে। শেষমেশ তাই জনমতেরই জয় হয়েছে। 

তবে একাত্তরের যুদ্ধজয়ী জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব জনগণকে দেওয়া কথা রাখতে পারেনি। হতাশ হয়ে মানুষ এদিক-সেদিক ছুটেছে; তাদের কেউ কেউ পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের যে অবশেষ রয়ে গেছে, তার খপ্পরে পড়েছে। পরিত্যক্ত পাকিস্তানি ভাবধারার যে দাপট এখন চলছে, তার উৎসও এখানে। জাতীয়তাবাদের পরীক্ষা তাই এখনও চলছে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×