রাজনীতি
ছোট দল ভেঙে বড় দলে যাওয়ার ‘মাৎস্যন্যায়’
ইফতেখারুল ইসলাম
ইফতেখারুল ইসলাম
প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:১৯ | আপডেট: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৩২
রাজনীতিতে যেন সপ্তম শতকের ‘মাৎস্যন্যায়’ চলছে। রাজা শশাঙ্কের (৬০০-৬২৫ খ্রিষ্টাব্দ) মৃত্যুর পর থেকে পাল রাজবংশের উত্থানের আগ পর্যন্ত বাংলার রাজনীতিতে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল। তখনকার লিপি, খালিমপুর তাম্রশাসন এবং সন্ধ্যাকর নন্দী রচিত রামচরিতম কাব্যে পাল বংশের অভ্যুদয়ের পূর্ববর্তীকালে বাংলার এই নৈরাজ্যকর অবস্থা ‘মাৎস্যন্যায়ম্’ বলে পরিচিত। সেই যুগে বড় বড় শক্তি ছোট ছোট শক্তিকে ‘খেয়ে’ ফেলছিল; ঠিক যেমন বড় মাছ ছোট মাছকে খেয়ে ফেলে।
বর্তমান রাজনীতিতেও দেখা যাচ্ছে, ছোট ছোট দল নিজেদের অস্তিত্ব বিলীন করে দিয়ে বড় দলে যোগ দিচ্ছে। কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের সভাপতি বা সম্পাদক দল থেকে পদত্যাগ করে যেভাবে ধানের শীষ প্রতীক নিচ্ছেন; এক বা দুই নেতানির্ভর দলগুলোর জন্য সেটা বিলুপ্তিরই নামান্তর।
দল বদলকারীদের প্রায় সবারই গন্তব্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত বিএনপি। এর মধ্যে বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি বিএলডিপির একাংশের চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম তাঁর দল বিলুপ্ত করে নেতাকর্মী নিয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে লক্ষ্মীপুর-১ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন। জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদাও তাঁর দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়ে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন। এই তালিকায় আরও আছেন জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ। তিনি দল বিলুপ্ত করেছেন কিনা স্পষ্ট নয়, তবে ঢাকা-১৩ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন।
এলডিপির মূল অংশের মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদও বিএনপিতে যোগ দিয়ে কুমিল্লা-৭ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের গড়া রাজনৈতিক দল গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ রাশেদ খানও বিএনপিতে যোগ দিয়ে ঝিনাইদহ-৪ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন।
ওদিকে জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার পিরোজপুর-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ায় মহাসচিব আহসান হাবীব লিংকন দলটির সব পদ থেকে পদত্যাগ করে কুষ্টিয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন।
ইতিহাসের পরিহাস বটে; বিএনপি পরিচিত ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক’ বলে। কিন্তু এখন সেই দলটিই ‘বহুদলীয়’ ব্যবস্থা থেকে সরে যাচ্ছে। অথচ গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তীকালে সংস্কার প্রশ্নে গণতন্ত্রকামী ব্যক্তি ও দলগুলো আরও বেশি স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে দেশ নির্মাণে ভূমিকা রাখবেন– এটাই ছিল জনপ্রত্যাশা।
শুধু বিএনপিতে নয়; বর্তমানে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর একটি জামায়াতে ইসলামীরও দেখা যাচ্ছে একই প্রবণতা। ইতোমধ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির ছাত্রনেতাদের একাংশের উদ্যোগে গঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপি এবং কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন এলডিপি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিয়েছে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, একদা বিএনপির প্রভাবশালী নেতা অলি আহমদ দুই দশক আগে দল ত্যাগ করেছিলেন জামায়াতের সঙ্গে জোট করার প্রতিবাদেই! এলডিপির পরিস্থিতি এখনও স্পষ্ট নয়। কিন্তু জামায়াতের সঙ্গে জোট ইস্যুতে ইতোমধ্যে এনসিপির কয়েকজন প্রভাবশালী নেত্রী পদত্যাগ করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে এনসিপি একক নির্বাচনের কথা বলে আসছে। হঠাৎ এভাবে জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়ার ঘটনায় অনেকে বিস্মিত। তাদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কৌশলগত। কয়েকদিন ধরে সংবাদ ও সামাজিক মাধ্যমে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চোখে পড়ছে। তার মানে, জোটে যেতে গিয়ে দল শক্তিশালী হওয়ার বদলে দুর্বল হচ্ছে কিনা– ভেবে দেখার বিষয়।
ছোট দলের বড় নেতাদের আকস্মিকভাবে দলত্যাগ বা জোটগত অবস্থান বদল রাজনৈতিক অঙ্গীকারেও প্রশ্ন। যেমন গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ রাশেদ খান এক দিনে তৈরি হননি। তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গঠনে অসংখ্য নেতাকর্মীর শ্রম ও ঘাম রয়েছে। অন্যান্য ছোট দলের বড় নেতারাও গণঅভ্যুত্থানের পাটাতন তৈরিতে দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকা রেখেছেন। তাদের এভাবে বড় দলের সঙ্গে জোটে যাওয়া রাজনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়েও ভেবে দেখা দরকার।
আমরা অতীতে দেখেছি, বিভিন্ন ছোট দল বড় দলের সঙ্গে জোট করে কার্যত তল্পিবাহক হিসেবে কাজ করেছে। অথচ যে কোনো জোটের ছোট বা বড় শরিকের সমান মর্যাদায় রাজনীতি করার কথা। প্রত্যাশা ছিল, অন্তত গণঅভ্যুত্থানের পর সেই প্রবণতা পাল্টাবে। কিন্তু ছোট দলগুলো যেভাবে সারি বেঁধে নিজেদের অস্তিত্ব বিলোপ করে বড় দলে নাম লিখিয়ে যাচ্ছে, তাতে আগামী দিনের রাজনীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, যেসব দল জোটে যাচ্ছে, তারা বড় দলে বিলীন হয়ে যাবে। এই আশঙ্কা যদি সত্য হয়, তবে রাজনৈতিক সংকট আরও প্রকট হতে পারে। বিশেষত ছোট দলগুলোর নেতারা যদি কর্মীদের স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে কেবল সংসদে যাওয়ার লোভে বড় দলে যোগ দেন, তাতে তৃণমূলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অন্যদিকে নেতৃত্ব বিকশিত করে নেতাকর্মীদের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখতে পারলে এ ধরনের জোটের তেমন অসুবিধা নেই। যারা নিজ দল ভেঙে বড় দলে যোগ দিচ্ছেন, তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও নিশ্চিত নয়। কারণ সংশ্লিষ্ট আসনগুলোতে বড় দলের স্থানীয় নেতাকর্মী তাদের ভালোভাবে নিচ্ছে না।
চাইলে ছোট দলগুলো স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেও জোটে যাওয়ার সুযোগ ছিল। এ ক্ষেত্রে সংস্কার প্রশ্নে তাদের অটল অবস্থান সামগ্রিক রাজনীতির জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলত। আমরা কী দেখলাম? বড় দলের শর্ত একবাক্যে মেনে নিয়ে ছোট দলগুলো দলে বা জোটে ভিড়ছে! এ থেকে স্পষ্ট– সংস্কার নয়, বরং ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে সংসদে যাওয়াই তাদের এখন প্রধান ও একমাত্র লক্ষ্য।
রাজনীতিতে তাৎক্ষণিক সুবিধা লাভ বড় একটা খেলা। সেটি যদি রাষ্ট্রের পরিবর্তন, পুনর্গঠন, জনগণের কল্যাণকে পুরোপুরি এড়িয়ে গিয়ে ঘটে, তাহলে এ রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী?
ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, দৈনিক সমকাল
- বিষয় :
- রাজনীতি
- দলবদল
- রাজনীতিবিদ
