তৃতীয় মেরু
নির্বাচন নিয়ে তিনটি বাজি
শেখ রোকন
শেখ রোকন
প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১৩ | আপডেট: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
আমি রাজনীতির লোক নই; এমনকি ‘রাজনৈতিক বিশ্লেষক’ বলতে যা বোঝায়, তাও নই। মূলত পরিবেশ-প্রতিবেশ ও আর্থসামাজিক বিষয়াদি নিয়ে লেখালেখি ও গবেষণা করি মাত্র। তবুও সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তিনটি বাজি ধরতে হয়েছিল ঘটনাচক্রে।
প্রথমত, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জাতীয় সংসদ নির্বাচন কবে হতে যাচ্ছে; দ্বিতীয়ত, জামায়াতে ইসলামী ওই সংসদে কতটা আসন পেতে পারে; তৃতীয়ত, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া গণভোটের ফলাফল কী হতে পারে।
২.
বাংলাদেশের পরিবেশবাদীদের অনেক দিনের দাবি ছিল, আন্তঃসীমান্ত নদী বিষয়ে জাতিসংঘের দুটি সনদ ওয়াটারকোর্স কনভেনশন ১৯৯৭ এবং ওয়াটার কনভেনশন ১৯৯২ অনুস্বাক্ষর ও স্বাক্ষর করা হোক। অন্তর্বর্তী সরকার ১৯৯২ সালের সনদটি বাস্তবায়নে অগ্রসর হয় এবং ২০২৫ সালের মার্চ মাসে এ বিষয়ক ওয়ার্কশপে ঢাকায় আসেন একজন বিদেশি বন্ধু। মধ্যাহ্ন বিরতিতে জানতে চান, নির্বাচন কবে হবে? নির্বাচনের অনিশ্চয়তা নিয়ে তখন ঢাকার বাতাসে অনেক কথা ভাসছিল। আমি বলেছিলাম, ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে নির্বাচন ‘হতে হবে’। তাঁর বক্তব্য, এ সরকার দীর্ঘায়িত হতে যাচ্ছে বলে বিদেশেও খবর রটেছে। এ নিয়ে দ্বিমতের এক পর্যায়ে আমরা বাজিও ধরি।
অনেকের মনে থাকার কথা, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরেই আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ১৮ মাসের মধ্যেই যাতে নির্বাচন হতে পারে সে জন্য তারা অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। পরের সপ্তাহেই এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার মুখরা প্রেস সচিব যদিও সেটাকে ‘ব্যক্তিগত মতামত’ আখ্যা দিয়েছিলন,
জেনারেল ওয়াকার পরবর্তী সময়ে আরও একাধিক অনুষ্ঠানে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন।
বাংলাদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের একটি বীজগাণিতিক সূত্র রয়েছে (এ+বি+সি+ডি=ই); আর্মি, ব্যুরোক্রেট, করপোরেট, ডিপ্লোম্যাট যখন একমত হয়, তখন সরকারের পক্ষে ‘ই’ বা ইলেকশন না দিয়ে আর উপায় থাকে না। বাস্তবে শুধু সেনাপ্রধান নন; ২০২৫ সালের মার্চ মাস নাগাদ ব্যুরোক্রেট, করপোরেট, ডিপ্লোম্যাটিক অক্ষ থেকেও দ্রুত নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান স্পষ্ট হয়। ওই বছর মোটামুটি ডিসেম্বর নাগাদ আমরা বুঝে ফেলি, জনসাধারণও নির্বাচনের জন্য দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে চায় না। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের এক-দুই মাসের বেশি দীর্ঘায়িত করা যে সম্ভব হবে না, সেটা মার্চ মাস নাগাদ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
৩.
স্বীকার্য, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জামায়াতে ইসলামীর সক্রিয় অংশগ্রহণ তো ছিলই, দলটির বিপুল সংখ্যক কর্মীসমর্থক প্রাণ ও রক্ত দিয়েছে। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে, এমনকি কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমেও ‘হাইপ’ তোলা হতে থাকে– পরবর্তী নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে। বিশেষত জামায়াত বিভিন্ন ইসলামী দলের সঙ্গে জোট করতে থাকলে সেটা আরও জোরালো হয়।
আর ‘ইসলামী ভোট এক বাক্সে’ আনতে ২০২৫ সালের মে মাস থেকে এ মাসের জানুয়ারি পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম, জাগপা, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি, এনসিপি, এলডিপি, এবি পার্টি, লেবার পার্টির যোগ ও বিয়োগের মধ্য দিয়ে গঠিত হয় ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’।
এই জোট গঠন হওয়ার পর জামায়াতের ক্ষমতায় যাওয়ার ‘হাইপ’ আরও জোরালো হয়ে ওঠে। প্রবাসী কয়েকজন ইউটিউবার এমনকি জামায়াত সরকার গঠনের পর মন্ত্রিসভার সম্ভাব্য সদস্যদের নামও ছড়িয়ে দিতে থাকেন। শুধু তাই নয়; আমার ব্যক্তিগত পরিচিত কয়েকজন সাংবাদিকও এই বিষয়ে ‘কনফার্ম’ খবর দিতে থাকেন। একজন সহকর্মী ‘বিশেষ’ সংস্থার প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে জানান, জামায়াতে ইসলামী ১৩১, বিএনপি ১০৩, অন্যদের ১২টি আসন নিশ্চিত; বাকি ৫৪টিতে ‘হাড্ডাহাড্ডি লড়াই’। একজন ‘রাজনৈতিক বিশ্লেষক’ আমার দপ্তরে এসে চা খেতে খেতে বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তাঁর ‘সোর্স’ বলছে, জামায়াতের পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। সামান্য বুদ্ধি-বিবেচনা ভরসা করে তাঁর সঙ্গে বাজি ধরলাম; জামায়াতের আসন ৯০টির ওপরে যাবে না।

এটা ঠিক, আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে নানা নিগ্রহ-নির্যাতন সত্ত্বেও জামায়াতে ইসলামী প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে তাদের সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়ে গেছে। এই সময়ে ‘মজলুম’ ভাবমূর্তিও দলটির অতীতের কর্মকাণ্ড জনমানস থেকে মুছতে সহায়ক হয়েছে। তাই বলে সর্বশেষ অবাধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনে চতুর্থ স্থানে থাকা একটি রাজনৈতিক দল প্রথম স্থান দখল করবে?
গত তিনটি নির্বাচন অবাধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক না হওয়ার কারণে পরিস্থিতি প্রাক্কলনের মতো তথ্য-উপাত্ত কারও কাছেই ছিল না। এ ক্ষেত্রে আমি ‘ইকুয়েশন’ বা সমীকরণের আশ্রয় নিয়েছিলাম। প্রথমত, এর আগে ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলটি সর্বনিম্ন ২টি আসন এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সর্বোচ্চ ১৮ আসন পেয়েছিল। যদি সর্বোচ্চ আসনও ধরি, ১৮ বছরে একটি দলের আসন সংখ্যা পাঁচ গুণ ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা নয়; অর্থাৎ সর্বোচ্চ ৯০।
দ্বিতীয়ত, একটি গবেষণায় দেখেছিলাম, জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মী স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ৭২টি আসনে সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান বা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান হিসেবে ধর্তব্য ‘ফুটপ্রিন্ট’ রাখতে পেরেছেন। তার মানে ধরে নেওয়া যায়, সর্বোচ্চ ওই আসনগুলোতে ‘গণজোয়ার’ কাজে লাগতে পারে। কারণ যত জোয়ারই থাকুক, ন্যূনতম নদীরেখা বা নিম্নভূমি ছাড়া সেই জোয়ার
ঢুকবে না।
৪.
গণভোটে ‘না’ জিতে যেতে পারে– এক সহকর্মীর সঙ্গে ধরা এই বাজিটি ছিল ‘টাফ’। কারণ অন্তর্বর্তী সরকার ছাড়াও জামায়াত-এনসিপি জোটের রাজনৈতিক দলগুলো ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছিল। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী বা সমর্থক বিভিন্ন অরাজনৈতিক সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গ। এই প্রবল স্রোতের বিপরীতে বাজি ধরা কঠিনই বটে।
আমার হিসাব ছিল, বিএনপি ঠিক জামায়াত-এনসিপি মাত্রায় ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে নামেনি। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান যদিও শেষ দিকে এসে এক-আধবার মৃদু মাত্রায় ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন; মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা ততদিনে ‘পলিটিক্যাল মেসেজ’ পেয়ে গেছেন। এমনকি কোনো কোনো এলাকায় বিএনপি নেতাকর্মীর ‘না’ ভোট চাওয়ার খবরও মিলেছে।
ওদিকে আওয়ামী লীগের যেসব কর্মী-সমর্থক ভোটকেন্দ্রে যাবেন, তাদের প্রায় শতভাগ যে অবধারিতভাবেই ‘না’ ভোট দেবেন– সেটা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে মব সহিংসতা, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে জনসাধারণের যে অংশ ক্ষুব্ধ, তারাও সরকারের ওপরের ক্ষোভ গণভোটে ঝেড়ে দিতে পারেন। কারণ, ব্যালটে তো সেই ক্ষোভ ঝাড়ার কোনো ব্যবস্থা নেই!
৫.
বলা বাহুল্য, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ইতোমধ্যে তিনটি প্রশ্নেরই ‘দুধ কা দুধ, পানি কা পানি’ ঘটে গেছে। যদিও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েছে, বিপরীতে ‘না’ ভোটের হারও বিস্ময়কর। প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা বেড়ে গেলে কী ঘটত, বলা যায় না। তবুও ভবিষ্যতের রাজনীতির জন্য এতে রয়েছে তিনটি শিক্ষণীয় বিষয়। প্রথমত, যত সংস্কারের কথাই বলা হোক, বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন অনির্বাচিত সরকার দেখতে চায় না। ‘ওয়ান ইলেভেন’ সরকারের ক্ষেত্রেও সেটা ঘটিছিল। দ্বিতীয়ত, সামাজিক মাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে ‘হাইপ’ দিয়ে মাঠের চিত্র পাল্টানো যায় না। তৃতীয়ত, কোনো বিষয় গণভোটে দেওয়ার আগে যেমন জাতীয় ঐকমত্য, তেমনই ভোটারের কাছে স্পষ্টীকরণও জরুরি। অন্তর্ভুক্তিমূলক না হলে যত ভালো সংস্কারই হোক, পরিস্থিতির পরিবর্তনে টেকসই হওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া কঠিন।
শেখ রোকন: লেখক ও নদী-গবেষক
[email protected]
- বিষয় :
- শেখ রোকন
