ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শিক্ষাঙ্গন

বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় রাজনীতি

বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় রাজনীতি
×

আমরা দেখেছি শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক তৎপরতায় বিগত সরকারের মৌন সম্মতি কিভাবে শিক্ষাখাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে

শাফায়াত স্বচ্ছ 

প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৬ | ১৪:৪৩ | আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২৬ | ১৫:৫০

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্ররাজনীতি জারি থাকবে কীনা, এ প্রশ্নের উত্তর মিলেছে আগেই। রাখ-ঢাক রেখে সে চর্চাও চলছে ছাত্রসংসদ নির্বাচনগুলো হয়ে যাবার পর। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে যে নিরপেক্ষতার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিলো, তার স্থায়ীত্ব নিয়ে এখন প্রশ্ন তোলা যায়। 

শহর তো বটেই, গ্রামাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় রাজনৈতিক প্রভাব দেখা মিলছে আবারো। স্কুল কমিটি থেকে ছাত্ররাজনীতি সবই দৃশ্এযমান হতে শুরু করেছে৷ এই যেমন, দিনাজপুরের একটি স্কুলে দেখেছি এই ব্যানার। স্থানীয় সংসদ সদস্য সরকারি দলের হুইপ নির্বাচিত হয়েছেন বলে বিএনপির স্লোগান-নেতৃত্বের ছবি দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন স্কুলটির শিক্ষক, কর্মচারী এবং শিক্ষার্থীবৃন্দ। ঘটনাটি অস্বাভাবিক নয়, স্থানীয়রাও একে সহজাতভাবেই দেখছেন। দেশের শিক্ষাঙ্গন রাজনীতিকরণের যে সংস্কৃতি চলে এসেছে দীর্ঘদিন ধরে, তাতে একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে রাজনৈতিক প্রভাব থাকবে, এটি মেনে না নেয়াই বরং বোকামি। 

যদিও পরিবর্তনের প্রত্যাশা ছিলো ভিন্ন। ইতোপূর্বে আওয়ামী সরকারের একচ্ছত্র সময়ে হাইস্কুলে ছাত্রলীগের কমিটি দেয়া নিয়ে দেশব্যাপী সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। সমালোচনার মুখে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সেসব কমিটি প্রত্যাহার করেছিলেন। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর ভিন্ন রাজনৈতিক আবহে শিক্ষাখাতে যে সংস্কারপ্রচেষ্টা চলেছিলো, তাতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটিগুলোকে নিরপেক্ষ রাখার চেষ্টা চালিয়েছিলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সম্প্রতি গুঞ্জন ওঠে, নতুন শিক্ষামন্ত্রীর সভায় বিদ্যালয় কমিটিগুলোয় বিদ্যোৎসাহী, জমিদাতাদের পদে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আনার সিদ্ধান্ত এসেছে। সদস্য হতে শিক্ষাগত যোগ্যতার সীমাও তুলে দেয়ার আলোচনা ওঠে। যদিও পরবর্তীতে শিক্ষামন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী দুজনই পৃথকভাবে পরিষ্কার করেন, শিক্ষাগত যোগ্যতা তুলে দেয়ার 'প্রশ্নই ওঠে না' এবং সেটি উল্টো 'ধাপে ধাপে বৃদ্ধি করা হবে।'

নয়া সরকারের শিক্ষানীতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাব থাকবে কীনা, সেটি স্পষ্ট নয়। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বলে, কাগজে কলমে নিরপেক্ষতার চেষ্টা চললেও সেটি মাঠ পর্যায়ে এতো সহজে কায়েম হবে না। এর প্রধান কারণ, রাজনৈতিক দলগুলোর তৃণমূল পর্যায়ে যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও সংঘাত, তার একটি বড়ো ক্ষেত্র স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। দলীয় প্রভাব ধরে রাখতে এগুলোয় পছন্দসই ব্যক্তিদের বসানো হয়। এরপর তাদের হাত ধরেই ধীরে ধীরে স্থানীয় এলাকায় প্রতিপত্তি বিস্তার, স্কুল কমিটি নিয়ন্ত্রণ, অনেকসময় অর্থ নয়-ছয় এবং জবরদখলের প্রচেষ্টা চলে। সরকারি বেতনভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী এমনকি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ধারণা নেই এমন শিশু শিক্ষার্থীরাও রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিণত হয় রাজনৈতিক কার্যালয়ে এবং এর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর মাঠপর্যায়ের নেতৃবৃন্দের কাছে। এই সংস্কৃতি বাংলাদেশে অতি-প্রাচীন এবং এর শেকড়ও অনেক গভীরে প্রোথিত। 

একটি আধুনিক ও মানসম্মত শিক্ষাকাঠামো গড়তে যে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন, তাতে এই সংস্কৃতি ভাঙা অতীব জরুরি, বিকল্পহীন বললেও ভুল হবে না। তবে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও প্রশাসনের পক্ষে এই সংস্কার হবে একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ। ইতোপূর্বে আমরা দেখেছি শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক তৎপরতায় বিগত সরকারের মৌন সম্মতি কিভাবে শিক্ষাখাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নবাগত বিএনপি সরকারের সামনের পথ খুব বেশি মসৃণ নয় বলেই ধারণা করা হচ্ছে। অনেক বাঁধার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা সংস্কারে দলীয় প্রভাব ও অতি-উৎসাহী তৃণমূল নেতৃত্বও তাদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। সরকারের সৎ উদ্দেশ্য ও কঠোরতম পদক্ষেপেই আশু-সংস্কার সম্ভব৷ ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে জাতির কাছে সরকারের যে দায়বদ্ধতা তৈরি হয়েছে, তা থেকে ফিরে আসার আর সুযোগ নেই। যে করেই হোক, নতুন সরকারকে একটি কার্যকরী, মানসম্মত, যুগোপযোগী ও দলীয় প্রভাবমুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতেই হবে। 

শাফায়াত স্বচ্ছ : শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×