প্রতিবেশী
ব্যতিক্রম পশ্চিমবঙ্গেও গেরুয়া উপাখ্যান?
শিভাশিস চট্টোপাধ্যায়
প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ | ১৬:০৭ | আপডেট: ০৪ মে ২০২৬ | ১৬:০৯
সোমবারের ফলে দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টিই (বিজেপি) এগিয়ে থাকছে। তবে বিজেপির বিজয় কোনো একক কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এটি মূলত একাধিক রাজনৈতিক, সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার একটি সমন্বিত ফল। সেগুলো ধীরে ধীরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকে পুনর্গঠিত করেছে। এর মূলে রয়েছে রাজনৈতিক পরিচয়ের এক নাটকীয় রূপান্তর, যেখানে শ্রেণি বা আঞ্চলিকতাবাদের মতো পুরনো বিষয়ের পরিবর্তে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের আবেগ জায়গা করে নিয়েছে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ধর্মীয়ভিত্তিতে রাজনৈতিক মেরুকরণ। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানের পেছনে জাতীয় পর্যায়ের পরিচয়ের বয়ান কাজে লেগেছে। এখানে লক্ষণীয় বিষয় শুধু মেরুকরণই নয়, বরং নির্বাচনের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা। নির্বাচনে কে জিতবে তা কেবল শাসনব্যবস্থা বা নীতির প্রশ্ন নয়, বরং এটি সভ্যতা প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে। এই নতুন কাঠামোতে রাজনৈতিক সংহতির পুরনো মানদণ্ড, তথা শ্রেণি সংহতি, ভাষাগত পরিচয় এবং আঞ্চলিক গৌরব ইত্যাদি সর্বব্যাপী এক বয়ানের মাধ্যমে অপসারিত হয়েছে। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক গোষ্ঠীও সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মাপকাঠিতে সামনে আসছে।
পশ্চিমবঙ্গে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) দীর্ঘকাল ক্ষমতায় রয়েছে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে সঙ্গতকারণেই এক ধরনের ক্লান্তি দেখা যাচ্ছে। তাছাড়া দুর্নীতির অভিযোগ, নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক এবং আমলাতান্ত্রিক স্বেচ্ছাচারিতা সেই নৈতিক ভিত্তিকে ম্লান করেছে, যা একসময় তৃণমূলের ভিত্তি ছিল।
বিজেপি সফলভাবেই এই অসন্তোষ কাজে লাগিয়েছে। দলটির তার প্রচারণায় কেবল নিজেকে বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করেনি, একইসঙ্গে শুদ্ধিকরণ নতুনত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তৃণমূলের মধ্যকার ক্লান্তির সময়ে সংশোধনের প্রতিশ্রুতি ভালো কাজ করেছে।
তবে এই ফল বোঝার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকাও বিবেচনায় নিতে হবে। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনসহ নির্বাচনের সামগ্রিক পরিচালনা রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এ ধরনের প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার নির্বাচনকে সূক্ষ্মভাবে প্রভাবিত করতে পারে। যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। তারপরও এধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমানসে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে এবং রাষ্ট্র ও দলের সীমানা অস্পষ্ট হওয়ার যে বিষয়টি দেখা যাচ্ছে, তা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
পশ্চিমবঙ্গের ফল সেখানকার রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ভালোভাবে তুলে ধরছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয় কেবল একটি দলের পরিবর্তে অন্য দলের ক্ষমতায় আসা নয়; এটি রাজ্যে রাজনীতির মূলনীতি পুনর্গঠিত হওয়ার সংকেত। মেরুকরণ, শাসকবিরোধী মনোভাব, প্রাতিষ্ঠানিক বিতর্ক, উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা এবং পরিচয়ের রূপান্তর, সবকিছু মিলে এক নতুন নির্বাচনী আখ্যানের জন্ম দিয়েছে।
তবে পশ্চিমবঙ্গে এই রূপান্তর কতটা স্থায়ী হবে, তা এখনও বলা যায় না। নির্বাচনী বিজয় যেমন নতুন প্রবণতাকে সুসংহত করতে পারে, তেমনি এর অন্তর্নিহিত উত্তেজনাকেও উন্মোচিত করতে পারে। বিজেপির জন্য চ্যালেঞ্জ হবে তার বিচিত্র এবং কখনো কখনো পরস্পরবিরোধী জনসমর্থনকে সুসংহত শাসন প্রকল্পে রূপান্তরিত করা। আর বিরোধীদের জন্য কাজটি সমানভাবে কঠিন। রাজনৈতিক ভূখণ্ড কোনো উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিশ্বাসের ওপর চলে না। সে কারণেই তাদের কৌশল, ভাষা এবং ভাবনা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
সেই অর্থে, এই রায়ই শেষ নয় বরং একটি সূচনা হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের সামনে নতুন পরীক্ষা, এটি আগে কী ছিল এবং ভবিষ্যতে কী হতে পারে।
শিভাশিস চট্টোপাধ্যায়: ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক; ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক
- বিষয় :
- পশ্চিমবঙ্গ
- নির্বাচন
- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
