শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা
শিল্পশিক্ষায় মঞ্চের আলো বনাম অন্তরালের অন্ধকার
মোশাররফ তানসেন
প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ | ০৭:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু দেশজুড়ে শোক, ক্ষোভ ও গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ঘটনার পর বর্তমান ও সাবেক অনেক শিক্ষার্থী সামাজিক মাধ্যম ও বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে বিভাগীয় শিক্ষকদের দ্বারা শিক্ষার্থীদের প্রতি মৌখিক অপমান, মানসিক নির্যাতন, ক্ষমতার অপব্যবহার, শারীরিক অসদাচরণ, পক্ষপাতিত্ব, যৌন হয়রানি এবং অনৈতিক আচরণের অভিযোগ। প্রতিটি অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হবে কিনা, তা অবশ্যই যথাযথ প্রক্রিয়ার বিষয়। কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর একই ধরনের অভিজ্ঞতা একটি বড় বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে– অনেকেই নিজেদের অবহেলিত, অনিরাপদ ও প্রতারিত মনে করেছেন।
থিয়েটার শিক্ষা অন্যান্য বিষয়ের চেয়ে আলাদা। এখানে আবেগের প্রকাশ, শারীরিক অনুশীলন, দলগত কাজ, দীর্ঘ মহড়া ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর নিবিড় সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের বাইরে মহড়া কক্ষ, প্রযোজনা, উৎসব ও সফরে শিক্ষকদের সঙ্গে কাজ করেন। ফলে এই সম্পর্ক অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। এ কারণেই নৈতিক দায়িত্বও এখানে বেশি। একটি থিয়েটার বিভাগ এমন জায়গা হওয়া উচিত, যেখানে আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে; কণ্ঠস্বর শক্তিশালী ও প্রতিভা বিকশিত হয়। এটি কখনও এমন জায়গা হতে পারে না, যেখানে অপমানকে শিক্ষা, ভয়কে শৃঙ্খলা এবং নীরবতাকে সাফল্যের শর্ত বানানো হয়।
অনেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন, কিছু ক্ষতিকর আচরণকে বছরের পর বছর ‘প্রশিক্ষণের অংশ’ বলে চালানো হয়েছে। যদি তা সত্য হয়, তবে তা গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে। শিল্পে উৎকর্ষ অর্জনে নিষ্ঠুরতার প্রয়োজন নেই। কঠোর সমালোচনা হতে পারে, কিন্তু তা শিক্ষার্থীর মর্যাদায় আঘাত না করেও সম্ভব। দুর্বল প্রস্তুতি বা শিল্পচর্চার সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করা যায়, কিন্তু কাউকে হেয় করা যায় না। প্রকাশ্যে অপমান হয়তো সাময়িক আনুগত্য আনে, কিন্তু তা প্রকৃত শিক্ষা আনে না। বরং শিক্ষার্থীরা সৃজনশীলভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ে; আত্মবিশ্বাস হারায়; উদ্বেগ তৈরি করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা নম্বর, সুপারিশপত্র, বৃত্তি, কাস্টিং, গবেষণার সুযোগ ও ভবিষ্যৎ যোগাযোগের ওপর প্রভাব রাখেন। পারফরম্যান্সভিত্তিক বিভাগে এই ক্ষমতা আরও বেশি। ক্ষমতা ন্যায্যভাবে ব্যবহৃত হলে তা অনুপ্রেরণা দেয়; অপব্যবহার হলে ভয় সৃষ্টি করে। একজন শিক্ষার্থী ভাবতে পারেন– শিক্ষকের সঙ্গে দ্বিমত করলে; অনৈতিক দাবি প্রত্যাখ্যান করলে বা অভিযোগ করলে তাঁর ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সরাসরি হুমকি না থাকলেও ক্ষমতার অসম সম্পর্কই প্রতিবাদকে স্তব্ধ করে দেয়।
যেখানে ক্ষমতার অসমতা আছে, সেখানে যৌন অসদাচরণের ঝুঁকিও বেশি। এটি হতে পারে অশোভন মন্তব্য, ইঙ্গিতপূর্ণ আচরণ, অনৈতিক সম্পর্কের চাপ বা মেন্টরশিপের নামে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়া। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কে শুধু ‘সম্মতি’ শব্দটি যথেষ্ট নয়। যদি একজনের হাতে নম্বর, সুযোগ বা সুপারিশের ক্ষমতা থাকে, তবে অন্যজন কতটা স্বাধীনভাবে ‘সিদ্ধান্ত’ নিতে পারেন– সেটিই বড় প্রশ্ন। একইভাবে পারফরম্যান্স শিক্ষায় শারীরিক অনুশীলন থাকলেও ধাক্কা দেওয়া, ধরে টানা, জোরপূর্বক স্পর্শ বা বিপজ্জনক অনুশীলন চাপিয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
অনেকে প্রশ্ন করেন, আগে অভিযোগ করা হলো না কেন? উত্তরটি কাঠামোগত। শিক্ষার্থীরা ভয় পান প্রতিশোধ, অবিশ্বাস, অপবাদ ও ভবিষ্যৎ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায়। তারা শিল্পশিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে আসেন কণ্ঠস্বর, কল্পনা ও সাহস খুঁজতে; মর্যাদা বিসর্জন দিতে নয়। যদি বিশ্ববিদ্যালয় সেই ন্যূনতম নিরাপত্তা দিতে না পারে, তবে তারা নিজেদের উদ্দেশ্যকেই বিশ্বাসঘাতকতা করে। এটি শুধু একটি বিভাগের গল্প নয়; বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা কোন পথে যাবে– সেই প্রশ্ন।
মোশাররফ তানসেন: পিএইচডি গবেষক; মালালা ফান্ডের সাবেক কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ
- বিষয় :
- আত্মহত্যা
