ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক

ইসরায়েল-আমিরাতের সঙ্গে ভারতের আধা মিত্রতার পরিণতি

ইসরায়েল-আমিরাতের সঙ্গে ভারতের আধা মিত্রতার পরিণতি
×

এম. কে. ভদ্রকুমার

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬ | ০৭:৪০

| প্রিন্ট সংস্করণ

গণমাধ্যম জগতের অন্য যে কোনো প্রতিভাবানের মতোই টোকার কার্লসনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তিনি এমন সব সাধারণ মানুষ খুঁজে বের করেন, যাদের এক অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে এবং তাদের ‘মৌলিক’ কিছু অবদান রাখার সুযোগ আছে। ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎকারটি ছিল এমনই এক আকর্ষণীয় প্রাপ্তি। হাকাবি সাবেক ব্যাপটিস্ট ধর্মযাজক এবং রিপাবলিকান পার্টির নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুগত।

রাষ্ট্রদূত হাকাবিকে ‘যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের দূত’ হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি অকপটে ও নির্বিকারভাবে স্বীকার করেছেন, গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি শিশু সত্যিই নিহত হয়েছে– ‘তাতে কী?’ আর ওল্ড টেস্টামেন্টে ভবিষ্যদ্বাণীকৃত রেখা বরাবর আরব উপদ্বীপের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে ইহুদিরা যদি একটি বৃহত্তর ইসরায়েল গঠন করতে যায়, তবে তা একটি ‘ন্যায্য’ কাজ। কার্লসনের সাক্ষাৎকারটি রাজনৈতিক ঝড় তুলেছিল।

সুতরাং সোমবার ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পারস্পরিক সহযোগিতার নেপথ্য কারণ নিয়ে হাকাবি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধকালে পারস্য উপসাগরীয় রাজতন্ত্র রক্ষা করার জন্য ইসরায়েল গোপনে সংযুক্ত আরব আমিরাতে আয়রন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং তা পরিচালনার জন্য উচ্চ প্রশিক্ষিত বিশেষ বাহিনী মোতায়েন করেছে। এ থেকে বেশ নিশ্চিতভাবেই বলা যাচ্ছিল, এটি সংবাদমাধ্যমের ভাষায় একটি ‘চলমান ঘটনা’। প্রকৃতপক্ষে ঘটনাটি তা-ই ছিল।
বুধবার প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় এক বিবৃতিতে অদম্য হাকাবির কথাটি নিশ্চিত করেছে। এতে আরও বলা হয়, ইসরায়েলি সেনা মোতায়েনের পাশাপাশি নেতানিয়াহুও সংযুক্ত আরব আমিরাতে একটি গোপন সফর করেন এবং প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ইসরায়েলি বিবৃতিতে দাবি করা হয়, নেতানিয়াহুর এই সফর ‘ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার সম্পর্কে একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি এনেছে’।

কিন্তু আরব আমিরাত ‘গ্লাসনস্ত’-এর এত বড়সড় উপস্থাপনায় অভ্যস্ত নয় এবং সঙ্গে সঙ্গেই বিষয়টি এড়িয়ে গেল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেবল এই দাবি করে মূল প্রসঙ্গ থেকে সরে গেল যে, ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্ক ‘গোপনীয়তা বা গোপন চুক্তির ওপর ভিত্তি করে নয়’।
এদিকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাদের খবরে বলা হয়েছে, যুদ্ধকালে সংযুক্ত আরব আমিরাত গোপনে ইরানের অবকাঠামো ও সামরিক স্থাপনাগুলোতে একাধিক হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে এপ্রিলের শুরুতে ইরানের লাভান দ্বীপের একটি তেল শোধনাগারে হামলাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। হামলাগুলো ঘটেছিল প্রায় সেই সময়ে, যখন ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার ঘোষণা দিচ্ছিলেন। জানা গেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের হামলাটি ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করে চালানো হয়েছিল এবং এটি মোসাদের পরিচালক ডেভিড বারনিয়ার সংযুক্ত আরব আমিরাতে একের পর এক গোপন সফরের পরেই সংঘটিত হয়।

নিশ্চিতভাবে বলা যায়, সংযুক্ত আরব আমিরাত এখনও ইরানের ওপর তাদের হামলার দায় স্বীকার করেনি; বারনিয়া ও নেতানিয়াহুর গোপন সফরের কথা বাদই দিলাম। দিল্লির দৃষ্টিকোণ থেকে ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নিয়ে গঠিত ত্রয়ী জোটে তার অংশীদারিত্ব, যা ট্রাম্পের শাসনামলে ‘আইটুইউটু’ (ভারত, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) জোটের আকস্মিক বিলুপ্তির পর তার আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতা কিছুটা কমিয়ে আনে। এই জোট সাধারণত ‘পশ্চিম এশীয় কোয়াড’ বা ‘ইন্দো-আব্রাহামিক জোট’ নামে পরিচিত ছিল। ভারত এতদিন এক নীরব অংশীদার ছিল, তবে তা ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো নয়। কিন্তু আঞ্চলিক সংঘাত যদি তীব্রতর হয়, তবে কি ভারত এমনই থাকবে? বিভেদের রেখা এখন নিশ্চিতভাবেই ফুটে উঠছে।

এম কে ভদ্রকুমার: ভারতের সাবেক কূটনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক; ইন্ডিয়ান পাঞ্চলাইন থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম

আরও পড়ুন

×