সাক্ষাৎকার : আবু জামিল ফয়সাল
হামের টিকার কথা বলে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে
আবু জামিল ফয়সাল
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬ | ০৭:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিশিষ্ট চিকিৎসক ও জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল বাংলাদেশ পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন। তিনি স্বাস্থ্যবিষয়ক বেসরকারি সংস্থা ‘এনজেন্ডার হেলথ’ বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে কাজ করেছেন। এ ছাড়াও স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নীতি ও নির্দেশনায় বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টা হিসেবে অবদান রেখেছেন। তিনি অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি (খণ্ডকালীন শিক্ষক) হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটি এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনির্ভাসিটির সঙ্গে যুক্ত। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সমকালের সহকারী সম্পাদক সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম।
সমকাল: সংক্রামক রোগ হলেই কি এত শিশুর মৃত্যু হয়? চারশর বেশি শিশুর মৃত্যুর জন্য শুধু টিকা না পাওয়াই কারণ?
আবু জামিল ফয়সাল: শুধু টিকা দেওয়া যায়নি বলে শিশুদের হামে মৃত্যু হয়েছে– এ ধারণা ঠিক নয়। আসল সমস্যা আড়ালে থেকে যাচ্ছে। এত এত শিশু মারা যাওয়ার বড় কারণ আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ত্রুটি। সময়মতো স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে অনীহা থেকে শুরু করে কাজের সমন্বয়ের অভাব, শিশুর অপুষ্টি– সব কটি কারণই গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে কয়েকজন আমলা অন্তর্বর্তী সরকারকে টিকা ক্রয়ের পরামর্শ দিয়ে দেরি করালেন। টিকা যে শূন্যের কোঠায় ছিল, এমন না। বড় সংকট হয়েছে পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায়। টিকার পাশাপাশি সরকারের আরও অনেক কিছু করার আছে, যা হচ্ছে না।
সমকাল: ব্যবস্থাপনার ঘাটতিটা কেমন?
আবু জামিল ফয়সাল: দেরিতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া, তার আগে ফার্মেসি ঘুরে টোটকা ওষুধে কাজ সারার চেষ্টা করা হয়। এতে শিশুর অবস্থা আরও জটিল হয়ে যায়। বড় ডাক্তারের কাছে যেতে হবে– এই মানসিকতা চিকিৎসা গ্রহণকে আরও দীর্ঘায়িত করে। রোগের লক্ষণ দেখে জরুরি পরিস্থিতি বুঝতে না পারার অজ্ঞতা আমাদের অনেক বেশি। এসব কারণের পেছনে কাজ করে অসচেতনতা। আর জনগণকে সচেতন করার দায়িত্ব সরকারের। সেখানে যেমন ঘাটতি রয়েছে, তেমনি রয়েছে এমন মহামারি পরিস্থিতিতে সরকারের জনবল ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ প্রদান, সচেতনতা তৈরিতে ব্যাপক দুর্বলতা। আরও বড় সমস্যা হলো, সরকার নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন ছোটখাটো দুর্বলতাকে স্বীকার করছে না। জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এসব বিষয়কে গুরুত্ব না দিলে শুধু টিকা দিয়ে সংক্রমণ পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব নয়।
সমকাল: টিকা দেওয়া ছাড়া সরকারের কী কী করার ছিল বা এখনও করা দরকার?
আবু জামিল ফয়সাল: এখন শুধু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মীদের দিয়ে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের অধীনে অন্তত ১২শ চিকিৎসক আছেন। তারা এই জরুরি পরিস্থিতিতে কী করছেন? হামের প্রকোপ বেশি এমন এলাকায় জেনারেল প্র্যাকটিশনার চিকিৎসকদেরও এই সেবায় সম্পৃক্ত করা উচিত ছিল। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসক-নার্সদের জন্য প্রশিক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাদের কাছে হামের রোগী গেলেই তারা ভয়ে উপজেলা থেকে জেলা, জেলা থেকে ঢাকায় পাঠিয়ে দিচ্ছেন। অসুস্থ শিশুটি পথের ধকলে আরও বেশি অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। প্রশিক্ষণ পেলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের চিকিৎসক ও নার্সদের আত্মবিশ্বাস তৈরি হতো; রোগীও সেবা পেত। শিশুর শ্বাসকষ্ট হলেই আইসিইউ লাগে না। লাগে অক্সিজেন এবং এই ব্যবস্থা উপজেলা পর্যন্ত রয়েছে। যে শিশুটিরই মুখে অক্সিজেন দেওয়া ছবি দেখবেন; জানবেন, তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনেক।
সমকাল: সরকার কেন হামের সংক্রমণকে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করছে না বা মহামারি বলছে না?
আবু জামিল ফয়সাল: জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলে আতঙ্ক সৃষ্টি হবে ও সরকার সে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। তাদের ব্যর্থতা প্রমাণ হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) তখন প্রশ্ন তুলবে, তোমাদের প্রস্তুতিতে এত ঘাটতি ছিল কেন? তবে জরুরি অবস্থা জারি হলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্য সব মন্ত্রণালয়কে সম্পৃক্ত করা যেত। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, সমজকল্যাণ, নারী ও শিশুসহ সব মন্ত্রণালয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে কাজ করতে হতো।
এই পরিস্থিতি তৈরির পেছনে প্রাইভেট সেক্টরের ব্যর্থতাও অনেক। প্রাইভেক্ট হাসপাতালগুলো এক হয়ে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করলে সরকারের চেয়েও বেশি ভূমিকা রাখতে পারত। প্রতিদিন আমাদের শিশুরা মারা যাচ্ছে। এর মধ্যে যে চারশর বেশি সংখ্যা বলা হচ্ছে; এটা শুধু হাসাপাতালের রেকর্ড। আরও কত শিশু যে বাড়িতে বিনা চিকিৎসায় মারা গেল, আমরা জানতেও পারব না। কত শিশু যে নৌকায় উঠতে উঠতেই চলে গেল, আমরা তা জানি না। এত বড় ব্যর্থতার দায় কেউ অস্বীকার করতে পারবে না।
সমকাল: টিকা সংকটের সমাধান হতে না হতেই দেখা গেল কিট সংকট শুরু হয়েছে। কিট না থাকা কি আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে পরিস্থিতি?
আবু জামিল ফয়সাল: এটি স্পষ্ট অবহেলার ফল এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। কিট সংকটে পরীক্ষা বন্ধ হয়ে গেলে সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হবে। তবে হামের লক্ষণ দেখা দিলে অভিজ্ঞ চিকিৎসক পরীক্ষা না করেও বুঝতে পারেন। কিটের সংকটকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া মানে হচ্ছে আসল সমস্যা থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া।
শিশুদের হাম হলে বমি, পাতলা পায়খানা ও শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। এই রোগের সেবা কেন উপজেলার হাসপাতালে পাবে না রোগী? সব রোগী কেন ঢাকায় চলে আসছে? এই যে উপজেলা পর্যায়েও রোগীর জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থা করতে না পারা, এটা স্বাস্থ্যসেবার অব্যবস্থাপনা। সরকার টিকাদান কার্যক্রম চালালেও আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়, সংসদে আলোচনা এবং বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার উদ্যোগ তেমন একটা দেখা যায়নি। এমনকি যে টিকা দেওয়া শুরু হলো, সেখানেও বড় ত্রুটি রয়েছে। কিট নিয়ে একদম মাথা ঘামাচ্ছি না। গুরুত্ব দিতে হবে স্থানীয় টিকা দেওয়ার ব্যবস্থাপনার দিকে।
সমকাল: টিকা কার্যক্রমের ত্রুটির বিষয়টি যদি স্পষ্ট করতেন।
আবু জামিল ফয়সাল: এই ত্রুটি বলতে গেলে আপনাকে ইপিআই (সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি) প্রোগ্রামের মাইক্রোপ্ল্যানিং বুঝতে হবে। টিকা যে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও কোনো প্রচারণা আছে? আপনি কোনো পোস্টার, ব্যানার টেলিভিশনে দেখেছেন বা মাইকিং শুনেছেন; কবে থেকে কবে কোন কোন জায়গায় টিকা দেওয়া হবে? প্রত্যন্ত গ্রামের অনেক মানুষ এখনও সচেতন নয় বা তারা প্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্য পেতেও অভ্যস্ত নয়। প্রতিটি ইউনিয়নের হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্টের কাছে তালিকা থাকে– কোন বয়সের শিশু কোন ঠিকানায় আছে, কাকে টিকা দিতে হবে। আগে ইপিআই কর্মসূচির সময় সেই স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছ থেকে তালিকা নিয়ে সে অনুযায়ী ওই এলাকায় মাইকিং করে সচেতন করা হতো। এবার তা হচ্ছে না। ইপিআইর এই মাইক্রোপ্ল্যানিং এবার অনুপস্থিত। ফলে টিকা দেওয়া হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সব শিশুকে তার আওতায় আনার চেষ্টা সরকারের ব্যবস্থাপনায় নেই।
অনেক স্বাস্থ্যকর্মী (হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট) এরই মধ্যে অবসরে গেছেন। বেতন নিয়ে ঝামেলার ফলে অনেক কর্মী কাজ করেননি। এখনও সে সমস্যা বিরাজমান। সে ক্ষেত্রে বিকল্প হতে পারতেন পরিবার পরিকল্পনার মাঠকর্মীরা। এ কাজে সমন্বয়েরও পরিকল্পনা নেই। এসবই টিকা কার্যক্রমের ছোট ছোট ঘাটতি।
সমকাল: করোনা অতিমারির সময় সরকারের বাইরে অনেক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি জনসচেতনতার কাজ করেছেন। এবার তা নেই কেন?
আবু জামিল ফয়সাল: আমরা সরকারকে বোঝাতে পারিনি– সবাইকে সম্পৃক্ত করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ের একজন ধর্মীয় নেতা, এলাকার মুরব্বি বা সমাজসেবক যত সহজে সেখানকার মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারেন, তা কেন্দ্রে বসে সম্ভব না। প্রাইভেট হাসপাতাল এ ক্ষেত্রে জনসচেতনতার কাজ করতে পারত। একটা হামের শিশুকে নিয়ে যখন তার পরিবার হাসপাতালে আসে তখন দেখা যায়, সঙ্গে আরও দুটি সুস্থ শিশু আছে। এই শিশুদের নিরাপদ রাখার বিষয় নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সচেতনতামূলক প্রচার দরকার। হাম রোগটি সংক্রামক– সেটা বোঝাতে হবে। টিকা নেওয়ার গুরুত্বের সঙ্গে জরুরি সময়ে কেন বড় ডাক্তারের জন্য অপেক্ষা না করে এলাকায় প্র্যাকটিস করা ডাক্তারের কাছে যেতে হবে– তা বোঝানোর সুযোগ প্রাইভেট হাসাপাতালের রয়েছে।
সমকাল: তিন থেকে চার বছর পরপর একটা সংক্রমণজনিত রোগ মহামারি হয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে। সামনে আর কোন সংক্রমণ এমন আসার আশঙ্কা রয়েছে?
আবু জামিল ফয়সাল: হামের প্রাদুর্ভাবে শিশুদের প্রাণহানি যেন এখানেই শেষ হয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, তা এখানে শেষ হবে না। আরও শিশুর প্রাণ যাবে। এখনও ব্যাপারগুলো শুধু টিকা, কিট, আইসিইউ পাওয়া-না পাওয়ায় আটকে আছে। আবারও বলি, সমস্যার সমাধান হয়নি। এসব ব্যবস্থাপনা দেশে যে কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব হলেই তা নিয়ন্ত্রণের জন্য অত্যন্ত জরুরি। সামনে আবার ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া শুরু হবে। জাহাজ থেকে হান্টা ভাইরাস ছড়ানোর খবর পাওয়া যাচ্ছে। এই ভাইরাস কোথায় কতদূর বিস্তৃত হবে, এখনও আমরা ধারণা করতে পারছি না।
সমকাল: হাম নিয়ন্ত্রণে এই মুহূর্তে কী করণীয়?
আবু জামিল ফয়সাল: বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে ঠিকমতো স্বাস্থ্যসেবাই আমরা দিতে পারছি না। সেবা পাওয়ার আগেই শিশুটি মরে যাচ্ছে। ফলে এখন কিট বা টিকা পাওয়া-না পাওয়ার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাপনা। মানুষকে সচেতন করতে হবে; সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে সরকারকে। এই সরকার যথেষ্ট বুদ্ধিমান বলে এমন পরিস্থিতিতেও জরুরি অবস্থা জারি করছে না। মনোযোগ নিয়ে যাচ্ছে শুধু ইউনূস সরকারের সময়ে টিকা না দেওয়ার ব্যর্থতার দিকে। কিন্তু যে কাজটি করলে অনেক শিশুকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানো যেত, সেই ব্যবস্থাপনাই আমলে নিচ্ছে না। টিকা তো দিতেই হবে। কিন্তু দেখুন, টিকা গ্রহণের বয়স হয়নি এমন শিশুরাও সংক্রমিত হচ্ছে। ফলে টিকা গ্রহণের পাশাপাশি সচেতনতার প্রচারণা চালানো আবশ্যক। বিজ্ঞাপন, বিলবোর্ডসহ সব গণমাধ্যম, হাসাপাতালের দেয়াল, বিভিন্ন সড়কে প্রচারণা চালাতে হবে। সবাইকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
আবু জামিল ফয়সাল: আপনাদেরও ধন্যবাদ।
- বিষয় :
- সাক্ষাৎকার
