আন্তর্জাতিক
ইরান যে কারণে ইতিমধ্যেই যুদ্ধে জিতে গেছে
এম এ হোসেন
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ | ১৭:৪৮
প্রতিটি বড় ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতে এমন একটি মুহূর্ত সামনে আসে, যখন এর ফলাফল কাঠামোগতভাবে অনিবার্য হয়ে ওঠে, যদিও তা কেউ স্বেচ্ছায় ঘোষণা করার অনেক আগেই। রোম এটা বুঝেছিল যখন জার্মান উপজাতিরা পিছু না হটে সামনে এগুচ্ছিল। ব্রিটেন এটা বুঝেছিল ১৯৪৭ সালে, দিল্লিতে নিরস্ত্র দাঁড়িয়ে। যুক্তরাষ্ট্র এটা বুঝেছিল ফালুজা ও কান্দাহারের মাঝামাঝি কোনো এক জায়গায়, যদিও তা প্রকাশ্যে স্বীকার করতে তাদের আরও এক দশক রক্তক্ষরণ করতে হয়েছিল। আমরা এখন ঠিক তেমনই এক মুহূর্তের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, অথচ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কক্ষগুলোর প্রায় কেউই তা স্বীকার করবে না।
ইরান জিতেছে– যতটা কৌশলগতভাবে, ততটা যুদ্ধক্ষেত্রে নয়। আর এর প্রমাণ ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা বা হতাহতের পরিসংখ্যানে পাওয়া যায় না। এর প্রমাণ মেলে এক অকাট্য সত্যে যে, ইরান ইতোমধ্যে যা করেছে তার চেয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব উভয়ই তেহরান এরপর কী করবে তা নিয়ে বেশি ভীত।
সেই ভয় যুক্তিসঙ্গত। এটি কেন যুক্তিসঙ্গত, তা বুঝতে হলে সংবাদ সম্মেলন ও কংগ্রেসীয় শুনানির আরামদায়ক মঞ্চ ছেড়ে বেরিয়ে এসে গত চার দশকের আমলনামা খতিয়ে দেখতে হবে।
ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী ২০ বছর ধরে একটি সেনাবাহিনী গড়ে তোলেনি। তারা আরও অনেক বেশি বিপজ্জনক কিছু তৈরি করেছে। যেমন– বৈরুত থেকে সানা পর্যন্ত বিস্তৃত প্রক্সি, সুড়ঙ্গ ব্যবস্থা, ড্রোন কারখানা, ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ এবং গোয়েন্দা সম্পদের এক বিকেন্দ্রীভূত ও স্ব-নিয়ন্ত্রিত নেটওয়ার্ক কাঠামো। তাছাড়া এটি কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে নির্মিত হয়েছিল।
গেম থিওরিস্টরা একে বলেন ‘সেকেন্ড-মুভার অ্যাডভান্টেজ’। বেশিরভাগ প্রচলিত সামরিক চিন্তাভাবনা প্রথম আঘাত হানার বিষয়টিকে ঘিরেই আবর্তিত হয়, যার মধ্যে রয়েছে ধাক্কা, আধিপত্য এবং প্রথম আঘাত হানার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব। আমেরিকা তার সুনির্দিষ্ট বোমাবর্ষণ এবং ‘ডিক্যাপিশন স্ট্রাইক’-এর ‘শক অ্যান্ড অ’ অভিযানের মাধ্যমে এই কৌশলকে নিখুঁত করে গড়ে তুলেছে। যে শত্রু একই নিয়ম মেনে যুদ্ধ করে, তার বিরুদ্ধে এটি একটি অসাধারণ কৌশল।
তবে ইরান কখনও সেই নিয়ম মেনে চলেনি। পরিবর্তে তারা সেই একটি শিক্ষাই গ্রহণ করেছিল, যা ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা থেকে তারা উপলব্ধি করেছে। সেটি হল আমেরিকা লড়াইয়ে জেতে, কিন্তু যুদ্ধে হারে। গোলাবর্ষণ সংঘাতের ফলাফল নির্ধারণ করে, কিন্তু ইচ্ছাশক্তিই বড় যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণ করে। আর অস্তিত্ব রক্ষা আর বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার জন্য লড়াইরত দুটি জাতি কখনও এক হতে পারে না। অস্তিত্ব রক্ষায় লড়াইরত একটি জাতির মধ্যে গড়ে উঠে প্রবল ইচ্ছাশক্তি। এই অসামঞ্জস্য ইরান যুদ্ধের সবকিছুকে চালিত করার মূল চালিকাশক্তি।
৪৫ বছরের নিষেধাজ্ঞা, বিচ্ছিন্নতা, গুপ্তহত্যা ও বোমাবর্ষণ সত্ত্বেও ইরান টিকে আছে এবং সেখানকার শাসনব্যবস্থা এখনও বিদ্যমান। এই একটিমাত্র তথ্যেই ১ হাজার গোয়েন্দা ব্রিফিংয়ের চেয়েও বেশি কৌশলগত তথ্য এতে নিহিত রয়েছে। পারস্যের কৌশলগত সংস্কৃতিতে ধৈর্য যতটা না মজ্জাগত, তার চেয়ে বেশি মতাদর্শগত। আর ইতিহাস—সত্যিকার অর্থে, ধারাবাহিকভাবে এবং ব্যতিক্রমহীনভাবে—ধৈর্যশীলদের দিকেই ঝুঁকে পড়ে।
এম এ হোসেন: সাংবাদিক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক; এশিয়া টাইমস থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
