সড়ক দুর্ঘটনা
ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনা রোধে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন
ফাইল ছবি
এস এম আজাদ হোসেন
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ | ২১:০৮
পবিত্র ঈদুল আজহা বাঙালির ধর্মীয়, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের এক গভীর আবেগের উৎসব। এই উৎসবকে ঘিরে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বড় শহরগুলো ফাঁকা হতে থাকে, আর মহাসড়কগুলো পরিণত হয় মানুষের স্রোতে। লাখো মানুষ পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের জন্য গ্রামের পথে ছুটে যায়। কিন্তু আনন্দের এই যাত্রা প্রায় প্রতিবছরই রূপ নেয় শোকের মিছিলে। বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিয়ন্ত্রণহীন মোটরসাইকেল, ক্লান্ত চালকের ঘুম, অতিরিক্ত গতি, অব্যবস্থাপনা ও আইন অমান্য করার প্রবণতা অসংখ্য প্রাণ কেড়ে নেয়।
দেশে সড়ক দুর্ঘটনা এখন কেবল একটি পরিবহন সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি, প্রশাসন ও মানবিক সংকটের বিষয়। বিশেষ করে ঈদকেন্দ্রিক যাত্রায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। উন্নয়নশীল বাংলাদেশ যখন অবকাঠামোগত অগ্রগতির গল্প বলছে, তখন সড়কে প্রাণহানি সেই অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাই ঈদুল আজহা সামনে রেখে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন রাষ্ট্র, মালিক, চালক, যাত্রী ও পথচারী সবার যৌথ দায়িত্ব।
রোডক্রাশ বা সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ:
সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কাঠামোগত কারণ রয়েছে। ঈদের সময় এই কারণগুলো আরও প্রকট হয়ে ওঠে। প্রথমত, অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া চালনা দুর্ঘটনার সবচেয়ে বড় কারণ। বিশেষ করে রাতের বেলায় এই প্রবণতা ভয়াবহ রূপ নেয়।
দ্বিতীয়ত, অদক্ষ ও ক্লান্ত চালক। অনেক সময় সহকারী বা লাইসেন্সবিহীন ব্যক্তিরাও গাড়ি চালান।
তৃতীয়ত, ফিটনেসবিহীন যানবাহন। ব্রেক, চাকা, স্টিয়ারিং বা আলো ত্রুটিপূর্ণ থাকা সত্ত্বেও বহু গাড়ি মহাসড়কে চলাচল করে। ঈদের আগে অতিরিক্ত যানবাহন নামানোর কারণে এ সমস্যা বাড়ে।
চতুর্থত, সড়ক ব্যবস্থাপনাজনিত দুর্বলতা। মহাসড়কে অবৈধ পার্কিং, বাজার, ভাঙা রাস্তা, অসমাপ্ত নির্মাণকাজ ও অপরিকল্পিত ইউ-টার্ন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।
পঞ্চমত, মোটরসাইকেলের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। বর্তমানে সড়কে মোটরসাইকেলের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। হেলমেট ছাড়া চালানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিংয়ে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে।
ষষ্ঠত, পথচারীদের অসচেতনতা। ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করা, হঠাৎ রাস্তা পার হওয়া কিংবা মহাসড়কে হাঁটার প্রবণতাও দুর্ঘটনার কারণ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা ও উদ্ধার ব্যবস্থার ঘাটতিও বহু মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
গত ঈদুল আজহার দুর্ঘটনা ও হতাহতের চিত্র:
বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে সারাদেশে শত শত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। যাত্রী কল্যাণ সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, গত বছরের ঈদুল আজহার আগে ও পরে প্রায় দুই সপ্তাহে কয়েক শতাধিক দুর্ঘটনায় বহু মানুষ নিহত ও আহত হন।
সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে মহাসড়কে। বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও মোটরসাইকেল সংঘর্ষে প্রাণহানি বেড়েছে উদ্বেগজনকভাবে। অনেক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের একাধিক সদস্য নিহত হয়েছেন। পদ্মা সেতু এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, যমুনা সেতু মহাসড়ক ও ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক ছিল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।
সড়ক দুর্ঘটনা থেকে উত্তরণের উপায়:
ঈদ সামনে রেখে অবিলম্বে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রথমত, মহাসড়কে ফিটনেসবিহীন যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। বিআরটিএ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নজরদারি চালাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, চালকদের ডোপ টেস্ট, লাইসেন্স যাচাই এবং বিশ্রাম নিশ্চিত করতে হবে। একটানা নির্দিষ্ট সময়ের বেশি গাড়ি চালানো বন্ধে কঠোর নিয়ম প্রয়োগ জরুরি।
তৃতীয়ত, মহাসড়কে অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ক্যামেরা নজরদারি বাড়াতে হবে।
চতুর্থত, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় বিশেষ সতর্কতা, আলোকসজ্জা ও ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন করতে হবে।
পঞ্চমত, যাত্রীদেরও সচেতন হতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ গাড়িতে না ওঠা, ছাদে ভ্রমণ না করা এবং চালককে বেপরোয়া গতিতে চালাতে নিরুৎসাহিত করা জরুরি।
ষষ্ঠত, ঈদযাত্রায় মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন। মহাসড়কে ঝুঁকিপূর্ণ বাইক চলাচল সীমিত করতে হবে।
মধ্যমেয়াদি করণীয়:
মধ্যমেয়াদে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিছু কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।
প্রথমত, গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। রুট পারমিট, চালক প্রশিক্ষণ ও কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা কার্যকর করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, সড়ক নির্মাণে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করতে হবে। আলাদা লেন, ওভারপাস, সার্ভিস রোড ও নিরাপদ ইউ-টার্ন তৈরি জরুরি।
তৃতীয়ত, স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকেই সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা চালু করা উচিত।
চতুর্থত, প্রতিটি মহাসড়কে দ্রুত চিকিৎসা ও উদ্ধার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দুর্ঘটনার পর প্রথম এক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পঞ্চমত, তথ্যভিত্তিক সড়ক ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ বিশ্লেষণ করে সমাধান নির্ধারণ জরুরি।
দীর্ঘমেয়াদি করণীয়:
দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশকে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থার দিকে যেতে হলে সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা প্রয়োজন।
প্রথমত, রেল ও নৌপথের আধুনিকায়নের মাধ্যমে সড়কের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নগর পরিকল্পনা ও পরিবহন পরিকল্পনাকে সমন্বিত করতে হবে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ সড়ক সংকট বাড়াচ্ছে।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত পরিবহন খাত গড়ে তুলতে হবে। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ না হলে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না।
চতুর্থত, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল মনিটরিং ও স্বয়ংক্রিয় জরিমানার ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে।
পঞ্চমত, নিরাপদ সড়ককে জাতীয় সংস্কৃতির অংশে পরিণত করতে হবে। আইন মানা, ধৈর্য ও দায়িত্বশীল আচরণ ছাড়া কোনো উন্নত সড়ক ব্যবস্থা সম্ভব নয়।
ঈদ মানে আনন্দ, মিলন ও ভালোবাসা। কিন্তু প্রতিবছর যদি সেই আনন্দ লাশের মিছিলে রূপ নেয়, তবে উন্নয়ন ও অগ্রগতির সব গল্প ম্লান হয়ে যায়। সড়ক দুর্ঘটনা কোনো ভাগ্যের বিষয় নয়; এটি মূলত অব্যবস্থাপনা, অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার ফল।
সরকার যদি কঠোর আইন প্রয়োগ করে, মালিকপক্ষ যদি নিরাপদ যান নিশ্চিত করে, চালক যদি দায়িত্বশীল হন, যাত্রী যদি সচেতন হন এবং পথচারী যদি নিয়ম মানেন, তবেই পরিবর্তন সম্ভব। উন্নত সড়ক শুধু উড়ালসেতু বা এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে হয় না; হয় মানুষের সচেতনতা ও আইনের সুশাসনে।
আসছে ঈদুল আজহায় একটি নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ নয়, এটি মানবিক দায়িত্বও। কারণ একটি দুর্ঘটনা শুধু একটি প্রাণই কেড়ে নেয় না; ধ্বংস করে দেয় একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, কখনও কখনও পুরো ভবিষ্যৎ।
এস এম আজাদ হোসেন: ভাইস চেয়ারম্যান, নিরাপদ সড়ক চাই
- বিষয় :
- সড়ক দুর্ঘটনা
