ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক

পুতিনের চীন সফরের নতুন বার্তা

পুতিনের চীন সফরের নতুন বার্তা
×

চীনের বেইজিংয়ে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে আয়োজিত এক অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন

রাজু আলীম

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ | ১৪:১২

একসময় আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্র ছিল ওয়াশিংটন। বৈশ্বিক সংকট, যুদ্ধ, বাণিজ্য কিংবা কূটনৈতিক সমঝোতার বড় সিদ্ধান্তগুলো শেষ পর্যন্ত গিয়ে থামত হোয়াইট হাউসের দরজায়। কিন্তু ২০২৬ সালের বিশ্বরাজনীতি সেই পুরোনো বাস্তবতা থেকে দ্রুত সরে যাচ্ছে। এখন বিশ্ব এমন এক অস্বস্তিকর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র এখনও সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি হলেও কূটনৈতিক কেন্দ্রীয়তা ক্রমশ সরে যাচ্ছে বেইজিংয়ের দিকে। আর গত এক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ যেন সেই পরিবর্তনের প্রতীকী প্রকাশ। প্রথমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফর, তারপর তার ঠিক পরেই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের চীন সফর—এই ধারাবাহিকতা শুধু কূটনৈতিক ক্যালেন্ডারের ঘটনা নয়; বরং এটি নতুন বৈশ্বিক শক্তি-সমীকরণের স্পষ্ট বার্তা।

চীন এখন এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে তারা একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে, আবার রাশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবেও থাকতে পারে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিকেই এখন কোনো না কোনোভাবে বেইজিংয়ের দরজায় যেতে হচ্ছে। এই বাস্তবতাই বিশ্লেষকদের মুখে একটি নতুন বাক্য তুলে এনেছে—“সব কার্ড এখন চীনের হাতে।”

পুতিনের এবারের সফরকে কেবল দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ সফরের সময়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প বেইজিং ছেড়ে যাওয়ার মাত্র এক দিন পর পুতিনের সফরের ঘোষণা আসে। অর্থাৎ চীন খুব সচেতনভাবেই বিশ্বকে একটি প্রতীকী বার্তা দিয়েছে। সেই বার্তা হলো—বিশ্বরাজনীতির দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি, ওয়াশিংটন ও মস্কো, দুপক্ষকেই এখন বেইজিংয়ের সঙ্গে হিসাব করেই চলতে হচ্ছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন সফরে গিয়েছিলেন মূলত অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক কিছু সমঝোতার আশায়। বিশেষ করে ইরান সংকট, বাণিজ্য এবং তাইওয়ান ইস্যুতে তিনি চীনের কাছ থেকে কিছু ইতিবাচক অবস্থান আশা করেছিলেন। কিন্তু সফরের পর পরিষ্কার হয়েছে, বেইজিং ট্রাম্পকে খুব বেশি কিছু দেয়নি। বরং চীন এমন এক অবস্থান নিয়েছে, যেখানে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে, কিন্তু একই সঙ্গে ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গেও কৌশলগত দূরত্ব তৈরি করছে না।
এই জায়গাটিই এখন চীনের সবচেয়ে বড় শক্তি। তারা আর স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের মতো কেবল একটি ‘উদীয়মান অর্থনীতি’ নয়। বরং তারা এখন এমন এক শক্তি, যারা প্রতিদ্বন্দ্বী ব্লকগুলোর মধ্যেও যোগাযোগের কেন্দ্র হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় এটিকে বলা যায় “কেন্দ্রীয় মধ্যস্থতাকারী শক্তি”। আর বেইজিং ঠিক সেটিই হতে চাইছে।

রাশিয়ার জন্য এই সম্পর্ক আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা রাশিয়াকে কার্যত চীনের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলেছে। জ্বালানি রপ্তানি থেকে প্রযুক্তি আমদানি—সব ক্ষেত্রেই এখন মস্কোর জন্য চীন অপরিহার্য। আগে রাশিয়া নিজেকে চীনের তুলনায় শক্তিশালী সামরিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখাতে পারত। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই ভারসাম্য বদলে গেছে। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক প্রভাব—সব দিক থেকেই এখন চীন এগিয়ে।

এই কারণেই চ্যাথাম হাউসের গবেষক টিমোথি অ্যাশের মন্তব্যটি এত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, “সব কার্ডই এখন চীনের হাতে।” কথাটি কেবল অলঙ্কার নয়; বরং বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার নির্যাস।
কারণ পুতিন এখন এমন এক অবস্থানে আছেন, যেখানে তাকে যুদ্ধ চালাতে অর্থনৈতিক সহায়তা দরকার, প্রযুক্তিগত সহায়তা দরকার, বিকল্প বাজার দরকার এবং কূটনৈতিক সমর্থনও দরকার। এই চারটি ক্ষেত্রেই চীন এখন রাশিয়ার সবচেয়ে বড় ভরসা। বিশেষ করে ড্রোন প্রযুক্তি, দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি এবং শিল্প সরঞ্জামের ক্ষেত্রে রাশিয়ার নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে।

অন্যদিকে চীনও রাশিয়াকে পুরোপুরি হারাতে চায় না। কারণ রাশিয়া এখন চীনের জন্য কয়েকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, রাশিয়া চীনের জন্য বিশাল জ্বালানি উৎস। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বৈশ্বিক ভারসাম্যে রাশিয়া চীনের প্রয়োজনীয় অংশীদার। তৃতীয়ত, ইউরেশীয় ভূরাজনীতিতে মস্কো এখনও সামরিক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।
কিন্তু এই সম্পর্কের মধ্যেও ক্ষমতার ভারসাম্য যে বদলে গেছে, তা এখন স্পষ্ট। আগে রাশিয়া-চীন সম্পর্ককে “সমমর্যাদার অংশীদারত্ব” বলা হতো। এখন সেটি ক্রমশ “চীনের নেতৃত্বাধীন কৌশলগত অংশীদারত্বে” রূপ নিচ্ছে।

এই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা গেছে জ্বালানি আলোচনাতেও। “পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২” পাইপলাইন প্রকল্প নিয়ে মস্কো যতটা আগ্রহী, বেইজিং ততটা প্রকাশ্য আগ্রহ দেখাচ্ছে না। কারণ চীন জানে, রাশিয়ার বিকল্প বাজার সীমিত। ইউরোপীয় বাজার প্রায় হারিয়ে ফেলার পর চীনের প্রয়োজন রাশিয়ার অনেক বেশি। ফলে দরকষাকষির ক্ষমতাও এখন বেইজিংয়ের হাতে।

তবে এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত অন্য জায়গায়। সেটি হলো চীনের নতুন কূটনৈতিক চরিত্র নির্মাণ। বেইজিং এখন নিজেকে এমন এক “নিরপেক্ষ পরাশক্তি” হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে, যারা কারও আনুষ্ঠানিক সামরিক মিত্র নয়, কিন্তু সবার সঙ্গে কাজ করতে সক্ষম।

ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ হরমুজ প্রণালিতে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্তদের একটি হবে চীন। তাদের শিল্প অর্থনীতি বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চীনের জন্য বড় ঝুঁকি।
এই কারণে চীন প্রকাশ্যে “শান্তি”, “মধ্যস্থতা” এবং “স্থিতিশীলতা”র কথা বলছে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা ইরান বা রাশিয়াকেও ছাড়ছে না। এই দ্বৈত কৌশলই এখন বেইজিংয়ের কূটনৈতিক দক্ষতার মূল জায়গা।

অন্যদিকে ওয়াশিংটনের জন্য এটি উদ্বেগের কারণ। কারণ যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক রাজনীতিকে “মিত্র বনাম প্রতিপক্ষ” কাঠামোয় দেখেছে। কিন্তু চীন সেই কাঠামো ভেঙে দিচ্ছে। তারা একই সঙ্গে সৌদি আরবের সঙ্গেও সম্পর্ক রাখছে, আবার ইরানের সঙ্গেও। তারা রাশিয়ার অংশীদার, কিন্তু ইউরোপের সঙ্গেও বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী, কিন্তু একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম অর্থনৈতিক অংশীদারদের একটি।
এই বহুমাত্রিক কৌশলই চীনকে অন্যদের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে।

সি চিন পিং ও পুতিনের যৌথ বিবৃতিও সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ। তারা “জঙ্গলের আইন” এবং “একক আধিপত্য” নিয়ে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, সেটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বার্তা। বিশেষ করে ট্রাম্পের “গোল্ডেন ডোম” ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রকল্পের সমালোচনা করে তারা স্পষ্ট করতে চেয়েছেন যে বর্তমান আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে বেইজিং ও মস্কোর অভিন্ন উদ্বেগ রয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, চীন ও রাশিয়া এখন আর শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে কথা বলছে না; তারা বিকল্প বিশ্বব্যবস্থার ভাষাও তৈরি করছে। “বহুমেরু বিশ্ব”, “সমতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক”, “একক আধিপত্যের বিরোধিতা”—এই শব্দগুলো এখন তাদের যৌথ রাজনৈতিক অভিধানের অংশ।
অবশ্য এই ভাষার মধ্যেও বাস্তব রাজনীতি আছে। কারণ “বহুমেরু বিশ্ব”র কথা বললেও বাস্তবে চীন নিজেই নতুন কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত হচ্ছে। পার্থক্য শুধু এটুকু যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রকাশ্য সামরিক জোটের বদলে অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং কৌশলগত নির্ভরতার মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করছে।

এই বাস্তবতায় ট্রাম্পের বেইজিং সফর এবং পুতিনের পরবর্তী সফর একটি প্রতীকী চিত্র তৈরি করেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে রাশিয়া—দুজনকেই এখন বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে হচ্ছে। আর চীন সেই অবস্থানকে ব্যবহার করছে নিজের বৈশ্বিক মর্যাদা আরও শক্তিশালী করার জন্য।

বিশ্বব্যবস্থা এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে পুরোনো একমেরু কাঠামো ভেঙে যাচ্ছে, কিন্তু নতুন কাঠামো এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই চীন নিজেকে “অপরিহার্য শক্তি” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে। তারা সরাসরি যুদ্ধ চায় না, প্রকাশ্য সামরিক সংঘাতও চায় না; বরং তারা এমন এক বিশ্ব চায়, যেখানে সব বড় শক্তিকে কোনো না কোনোভাবে বেইজিংয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে হবে।

পুতিনের সফর সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করেছে। হয়তো বড় কোনো চুক্তি হয়নি, নতুন কোনো নাটকীয় ঘোষণা আসেনি। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সব সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ঘোষণাপত্র নয়; অনেক সময় প্রতীকই সবচেয়ে বড় বার্তা দেয়। আর এই সফরের সবচেয়ে বড় প্রতীকী বার্তা হলো—আজকের বিশ্বে বেইজিংকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা কারও নেই।

এই পরিবর্তিত বাস্তবতার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, চীন এখন আর কেবল অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখছে না; বরং তারা ধীরে ধীরে বৈশ্বিক রাজনৈতিক ভাষাও নির্ধারণ করতে শুরু করেছে। একসময় আন্তর্জাতিক সংকটের বয়ান তৈরি হতো ওয়াশিংটনে, এখন সেই বয়ান তৈরির প্রতিযোগিতায় বেইজিংও সমান শক্তিশালী পক্ষ। “বহুমেরু বিশ্ব”, “পারস্পরিক সম্মান”, “অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা”, “উইন-উইন সহযোগিতা”—এই শব্দগুলো শুধু কূটনৈতিক অলংকার নয়; এগুলো চীনের বিকল্প বিশ্বদর্শনের অংশ। আর সেই দর্শনের লক্ষ্য হলো পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নৈতিক ও রাজনৈতিক একচেটিয়ত্বকে চ্যালেঞ্জ করা।

এই জায়গাটিতেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হচ্ছে। কারণ আমেরিকার সামরিক শক্তি এখনও বিশাল, প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি; কিন্তু সমস্যা হচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাবের কাঠামোতে। ইরাক যুদ্ধ, আফগানিস্তান, ইউক্রেন সংকট এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের “নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা”র ধারণা এখন অনেক দেশের কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ। বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো ক্রমশ এমন এক শক্তিকে খুঁজছে, যারা পশ্চিমা শর্ত ছাড়া অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশীদারত্ব দিতে পারে। চীন সেই শূন্যস্থানটিই পূরণ করার চেষ্টা করছে।

রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কও সেই বৃহত্তর কৌশলের অংশ। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাশিয়া যত বেশি বিচ্ছিন্ন হয়েছে, চীন তত বেশি সতর্ক কৌশল নিয়েছে। তারা কখনও সরাসরি রাশিয়ার যুদ্ধকে সমর্থন করেনি, আবার পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ভাষাও গ্রহণ করেনি। বরং চীন পুরো সময়টাতে নিজেদের এমনভাবে অবস্থান করিয়েছে, যাতে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলেও তারা লাভবান হতে পারে, আবার ভবিষ্যতে শান্তি আলোচনার ক্ষেত্রেও নিজেদের “গ্রহণযোগ্য মধ্যস্থতাকারী” হিসেবে তুলে ধরতে পারে।

এখানেই বেইজিংয়ের কৌশলগত ধৈর্য অন্যদের থেকে আলাদা। ওয়াশিংটন যেখানে দ্রুত ফল চায়, চীন সেখানে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্মাণে বিশ্বাস করে। “বেল্ট অ্যান্ড রোড”, আফ্রিকায় বিনিয়োগ, মধ্যপ্রাচ্যে মধ্যস্থতা, ব্রিকস সম্প্রসারণ কিংবা সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা—সবকিছুই আসলে একই বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ। সেই পরিকল্পনা হলো এমন একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, যেখানে পশ্চিমা জোটের বাইরে থেকেও দেশগুলো নিজেদের নিরাপদ ও লাভবান মনে করে।
পুতিনের এবারের সফর সেই বার্তাও দিয়েছে যে রাশিয়া এখন কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারবে না। তাদের অর্থনৈতিক টিকে থাকার জন্য চীন প্রয়োজন। আর চীন এই নির্ভরতাকে খুব হিসাব করে ব্যবহার করছে। তারা রাশিয়াকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়, কিন্তু এতটা শক্তিশালীও হতে দিতে চায় না যে মস্কো আবার স্বাধীন ভূরাজনৈতিক কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। ফলে সম্পর্ক যতই “বন্ধুত্বপূর্ণ” বলা হোক, বাস্তবে এটি এখন অসম অংশীদারত্বের দিকে এগোচ্ছে।

একই সঙ্গে এই সফর ইউরোপের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। কারণ ইউরোপীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে ভেবেছিল, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেও রাশিয়াকে আলাদা করা সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, চীন রাশিয়াকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবেই দেখছে। ফলে ইউরোপ এখন দ্বৈত সংকটে পড়েছে—একদিকে নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা, অন্যদিকে অর্থনীতির জন্য চীনের বাজারের প্রয়োজন।

এই জটিল বাস্তবতাই বর্তমান বিশ্বকে “নতুন স্নায়ুযুদ্ধ” বলার চেয়ে আরও জটিল করে তুলেছে। কারণ স্নায়ুযুদ্ধের সময় ব্লকগুলো স্পষ্ট ছিল। এখন সম্পর্কগুলো অনেক বেশি আন্তঃনির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন প্রতিদ্বন্দ্বী, কিন্তু তারা একে অপরের বড় অর্থনৈতিক অংশীদারও। চীন ও রাশিয়া ঘনিষ্ঠ, কিন্তু তারা আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট নয়। ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র, কিন্তু তারা চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতেও রাজি নয়।

এই বহুমাত্রিক বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্রেই এখন বেইজিং নিজেকে স্থাপন করছে। আর সি চিন পিং সম্ভবত এ কারণেই এত আত্মবিশ্বাসী। তিনি জানেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো চীনকে কেউ একঘরে করতে পারছে না। বরং প্রতিদ্বন্দ্বীরাও এখন বেইজিংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।
তবে এই উত্থানের মধ্যেও চীনের সামনে বড় ঝুঁকি রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আগের মতো নেই, জনসংখ্যাগত সংকট বাড়ছে, পশ্চিমা প্রযুক্তিনির্ভরতা পুরোপুরি কাটেনি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা উত্তেজনাও বাড়ছে। তাইওয়ান প্রশ্ন এখনও সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য সংঘাতের কেন্দ্র। দক্ষিণ চীন সাগরেও উত্তেজনা রয়েছে। অর্থাৎ চীনের উত্থান যত দ্রুত হয়েছে, তার ঝুঁকিও তত গভীর।

তবু বর্তমান মুহূর্তে একটি বিষয় পরিষ্কার—বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রীয় মঞ্চে এখন চীন ছাড়া কোনো সমীকরণ সম্পূর্ণ হয় না। ট্রাম্পের সফর সেটি দেখিয়েছে, পুতিনের সফর সেটিকে আরও দৃশ্যমান করেছে। একসময় ওয়াশিংটন ছিল সেই রাজধানী, যেখানে সবাইকে যেতে হতো; এখন বেইজিংও সেই তালিকায় স্থায়ীভাবে যোগ হয়েছে।
আর এ কারণেই পুতিনের সফর শুধু রাশিয়া-চীন সম্পর্কের বিষয় নয়। এটি আসলে এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার প্রতীক, যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্র ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে সরে যাচ্ছে। ইতিহাসের চাকা এখন এমন এক দিকে ঘুরছে, যেখানে বেইজিং আর কেবল অংশগ্রহণকারী নয়; বরং খেলাটির অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক।

রাজু আলীম: কবি ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×