অন্যদৃষ্টি
গাজা নিয়ে বিশ্ব নীরব কেন
নাসরিন মালিক
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়নের মাত্রা এবং তা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকার ফারাক অনেক। এখন তা এতটাই প্রকট যে, এর বাস্তবতা যেন মুছে গেছে। জার্মানির মতো দেশগুলো থেকে ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানির লাইসেন্স দেওয়ার হার যখন হু হু করে বাড়ছে, তখন অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের কঠোর পদক্ষেপ ও নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি স্রেফ বুলি ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়। গাজায় মানুষ মারা যাচ্ছে; পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে; আর ইসরায়েলের চরমপন্থিরা তাদের আসল আশার কথা ও পরিকল্পনার কথা বিশ্বকে জানিয়ে বারবার প্রমাণ করে দিচ্ছে– এই নিপীড়ন ভুলবশত নয়, বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
গত কয়েক দিনের কিছু ঘটনার কথা ধরা যাক। বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী ইতমার বেন-গাভির গাজা থেকে সব ফিলিস্তিনিকে বেআইনিভাবে জাতিগত নির্মূল করার জন্য একটি পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি এআই দিয়ে তৈরি একটি ভিডিও পোস্ট করেছিলেন, যেটি পরে মুছে ফেলা হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, ফিলিস্তিনি পুরুষদের একটি কনভেয়ার বেল্টে করে টেনে নিয়ে আটকে রাখা হচ্ছে এবং সেখান থেকে তারা কঙ্কালসার ও অশ্রুসজল চোখে বের হয়ে আসছে। একইভাবে কয়েক দিন আগে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ মন্তব্য করেছিলেন, দেশটি ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে ‘সম্ভব সকল উপায়ে’ বের করে দেওয়ার জন্য ‘সংগঠিত ও প্রস্তুত’।
বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না এমন এক বীভৎস নাটক যেন দিন দিন মঞ্চস্থ হয়ে চলেছে। বোর্ড অব পিস বা শান্তি পর্ষদ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, গাজাকে তার জনগণের ‘কল্যাণে পুনর্গঠন’ করা হবে। অথচ ইসরায়েলি রাজনীতিবিদরা ধারাবাহিকভাবে জোরালো কণ্ঠে বলছেন, ফিলিস্তিনিদের গাজায় কোনোভাবেই মাথা তুলে দাঁড়াতে দেওয়া যাবে না, যা আন্তর্জাতিক ঘোষণাগুলোকে সরাসরি উপহাস করে। গত মাসে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সাবেক প্রধান জিয়োরা আইল্যান্ড ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনা ইসরায়েলের গ্রহণ করা ছিল স্বল্পকালীন সামরিক কৌশল; দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য নয়।
তিনি বলেন, ‘গাজা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে ইসরায়েলের কোনো আগ্রহ নেই। এটি আগামী কয়েক প্রজন্মের জন্য ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় থাকা আমাদের জন্য ভালো।’
এখন মূল প্রশ্ন হলো, এসব মানুষের হুমকিকে কেন সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া হচ্ছে না? কেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর বিরুদ্ধে কোনো তাৎক্ষণিক জরুরি ব্যবস্থা বা ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে না? কেন ইসরায়েল রাষ্ট্রের এই নীতি ও ঘোষিত লক্ষ্যগুলোকে গুরুত্ব সহকারে নিয়ে উপযুক্ত নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্য ও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক তিরস্কারের মুখোমুখি করা হচ্ছে না? ইসরায়েলিদের বক্তব্য ও তাদের কর্মকাণ্ডকে বিশ্ব যেভাবে দেখে, তার মধ্যে এক অদ্ভুত বৈষম্য রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ফিলিস্তিনি ও তাদের সমর্থকদের ব্যবহৃত ‘নদী থেকে সমুদ্র’ বাক্যটিকে কড়া নজরদারিতে রাখা হয় এবং বিতর্কিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অথচ এ একই কথার সবচেয়ে উগ্র রূপ হলো– এই ভূখণ্ডে কেবল একটি মাত্র সার্বভৌম জাতির অস্তিত্ব থাকবে, যা ইসরায়েলে একেবারে সাধারণ বিষয়।
১৯৪৮ সালে যে লাখ লাখ ফিলিস্তিনিকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল বা পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল, তাদের সঙ্গে আজকের ফিলিস্তিনিদের পরিস্থিতির একটি ধারাবাহিক যোগসূত্র রয়েছে। ফিলিস্তিনিদের যে নিরাপত্তা ও বন্দিদশার মধ্যে রাখা হয়েছে– তাদের ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো ধ্বংস, তাদের ভূখণ্ডে উগ্র বসতি স্থাপন করে বিভক্ত এবং তাদের ওপর এমনভাবে ইসরায়েলি সার্বভৌমত্ব বিস্তার করা হয়েছে, যা তাদের অমানবিক ও নিপীড়িত করে রাখে। এ সবকিছুর মূল উদ্দেশ্য একটাই– যেন ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন হওয়া দূরের কথা, নিজেদের নিয়ন্ত্রণে শান্তিতে বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও চিরতরে নস্যাৎ হয়ে যায়।
নাসরিন মালিক: গার্ডিয়ানের কলাম লেখক; দ্য গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি