ঢাকা মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

স্মরণ

আমাদের একজন আকবর আলি খান ছিলেন

আমাদের একজন আকবর আলি খান ছিলেন
×

ড. আকবর আলি খান

মামুন রশীদ

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

ড. আকবর আলি খান নেই আজ প্রায় কয়েক বছর। আমার কিন্তু কোনো মেধাবী সরকারি কর্মকর্তা বা দায়িত্বশীল শিক্ষক দেখলেই তাঁর কথা মনে পড়ে। আমি তাঁর মতো মেধাবী একজনকে দেখিনি বললেই চলে। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিসের অন্যতম পরিচিত মুখ, সত্যিকারের দায়িত্বশীল একজন সরকারি কর্মকর্তা, মুক্তিযোদ্ধা, চেঞ্জ মেকার, প্রতিশ্রুতিবদ্ধ শিক্ষক। সর্বোপরি একজন সাদামনের মানুষ। 

ড. খানের ছায়ায় আমি অনেকটা বেড়ে উঠেছি। তবে আকবর আলি খানের প্রতি আল্লাহ যতটা দয়ালু ছিলেন, ততটা বোধহয় আমার ক্ষেত্রে নন। তাঁর প্রজ্ঞা, জ্ঞান, বোঝাপড়া ও পাণ্ডিত্যের ছিটেফোঁটাও আমি দাবি করতে পারি না। তবুও অনেক বছর ধরে আমরা ছিলাম ভালো বন্ধু। কয়েক সপ্তাহ তাঁর সঙ্গে কথা না বললে আমি এক ধরনের মনোকষ্ট ও হতাশায় ভুগতাম।
নব্বই দশকের শুরুতে এএনজেড গ্রিন্ডলেজ ব্যাংকে পাবলিক সেক্টর ইউনিটপ্রধানের ভূমিকাই আমাকে তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ করে। তখন থেকে তাঁকে অনুসরণ করা আমার অভ্যাসে পরিণত হয় এবং ওই মানুষটি কী বলছেন, সবসময় উপলব্ধির চেষ্টা করি। অবাক হয়ে যাই, তিনি এত কিছু কীভাবে বোঝেন!

তিনি যখন এনবিআরের চেয়ারম্যান ছিলেন তখন অফশোর ব্যাংকিংয়ের জন্য কর সুবিধার বিষয়ে সুপারিশ করতে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে আমার বস জেফ উইলিয়ামসকে নিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলাম। সেদিন তিনি মালয়েশিয়া, তাইওয়ান, লাতিন আমেরিকাসহ অনেক দেশের অফশোর ব্যাংকিংয়ের সার্বিক কর চিত্র সম্পর্কে আমাদের জানিয়েছিলেন এবং আমাদের জন্য কিছুই করার নেই বলে প্রায় পত্রপাঠ বিদায় করেছিলেন।

পরে আকবর আলি খান অর্থ সচিব হলে আমাকে একদিন ডেকেছিলেন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় বৃহৎ লেনদেনের সহায়তা জোগাতে বাংলাদেশের জন্য কিছু বিদেশি অর্থায়ন উত্তোলনে সাহায্যের কথা বলেছিলেন। আলোচ্য সাহায্যের জন্য আমি যখন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের কোন ডেস্কটি উপযুক্ত হবে ভাবছিলাম তখন ড. খান বললেন, “আমি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের (এসসিবি) এক বা দুটি শাখার কথা জানি, যারা অভ্যন্তরীণ রেমিট্যান্সের ‘সিকিউরাইটাইজেশন’ করেছে।” আমি হতবিহ্বল হয়ে গিয়েছিলাম, এই মানুষটি এতটা কীভাবে জেনেছিলেন! 
কয়েক মাস পর ড. খান ওভারসিজ টেলিফোন কল ফর রিসিভেবল সিকিউরিটাইজেশন সম্পর্কে কথা বলছিলেন। আমি আদৌ বিস্মিত হইনি। তাঁর চোখ ছিল স্ক্যানারের মতো। আমার দেখা অন্যতম দ্রুততম পাঠক। অর্থ সচিব থাকাকালে জাতীয় বাজেটের কয়েক মাস আগে তিনি আমাকে ফোন করতেন এবং সিরামিক, বৈদ্যুতিন কেবল, চামড়াজাত পণ্য বা স্থানীয় বই রপ্তানির মতো যে কোনো শিল্প খাত নিয়ে অর্ধ পৃষ্ঠা লিখে পাঠাতে বলতেন। কয়েক মাস পার হলে আমি জাতীয় বাজেটে আমার ওই অর্ধ পৃষ্ঠা লেখার প্রতিফলন দেখতাম; হোক সেটা কোনো খাতে কর রেয়াত কিংবা কোনো খাতের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণায়।

এই বয়োজ্যেষ্ঠ ‘তরুণ মানুষ’টির (ওল্ড ইয়াংম্যান) মধ্যে চমৎকার রসিকতাবোধও ছিল। তাঁর প্রবন্ধগুলোতে অনেক ক্ষেত্রে নাসিরুদ্দিন হোজ্জার কথা আছে। তাঁর নিজের ‘পরার্থপরতার অর্থনীতি’ নামক বইটি উন্মোচন অনুষ্ঠানে যোগদান শেষে ড. খানকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘স্যার, ব্যঙ্গের এসব সূক্ষ্ম প্রচেষ্টা কীভাবে চিন্তা করতে পারেন?’ তিনি হেসে বলেছিলেন, ‘একজন অর্থ সচিব হিসেবে এমন সব নির্জীব, বিরক্তিকর ও একঘেয়েমিপূর্ণ কাজ করতে হয়, যা থেকে কেবল কিছু ব্যঙ্গ-রসিকতাই আমাকে অনেকটা চাপমুক্ত রাখে।’

প্রায় ১৫ বছর আগে আমার করা এক ছোট্ট পর্যালোচনা প্রতিবেদনে (কোনো কোনো নিয়ামকগুলো বাংলাদেশকে আজকের এই পর্যায়ে আসতে সাহায্য করেছে তা বুঝতে) আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ এবং আমাদের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা কয়েক ডজন আমলা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও রাজনৈতিক নেতার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। আলোচ্য গবেষণায় এটা স্পষ্ট ছিল– উত্তর আমেরিকাফেরত শিক্ষিত কিছু আমলা যাদের কেউ কেউ মুক্তিযোদ্ধাও বটে, বাংলাদেশের অর্থনীতির রূপান্তর ও প্রবৃদ্ধিতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। আকবর আলি খান শুধু তেমন ব্যক্তিত্বই নন; তিনি অর্থনীতিকে অধিকতর প্রতিযোগিতামূলক প্রি-টেক-অফ স্টেজে আনার এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছেন।
১৯৯৮ সালের বন্যার সময় যখন গ্রামীণ ব্যাংক ‘তহবিল সংকট’ সমস্যা মোকাবিলা করছিল, তখন আকবর আলি খান গ্রামীণ ব্যাংকের সাফল্য ও অধ্যাপক ইউনূসের ওপর দুটি বই দিয়ে সেগুলো লন্ডনে আমাদের রিস্ক সিনিয়রদের কাছে কুরিয়ার করতে বলেছিলেন।

গ্রামীণ ব্যাংককে আপৎকালীন সাহায্য করতে ৫০ কোটি টাকার বিশেষ ঋণ মঞ্জুর করতে তিনি আমার সিনিয়রদের উপযুক্ত মনে করেছিলেন। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পিএটিসি, অর্থ বিভাগ, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, বিশ্বব্যাংক– যেখানে যে কাজই তাঁকে দেওয়া হোক, সেটা তিনি সুচারুরূপে সম্পাদন করেছেন। এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্বল্প সময়েও তাঁর এতটুকু দায়িত্বের ব্যত্যয় ঘটেনি।
মনে পড়ে, একটি পত্রিকায় আমি তাঁর ‘পরার্থপরতার অর্থনীতি’ বইয়ের একটি পর্যালোচনা ছেপেছিলাম। বইটি পড়তে আমার একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। তবে বইটি পড়ে এতটাই হালকা বোধ করেছিলাম, যেন তখনই জীবনের সর্বোত্তম ‘নলেজ টিপস’ পেয়ে গিয়েছি। বইটিতে চারপাশে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলোর এমন গভীর বিশ্লেষণ তিনি হাজির করেছিলেন, যা ঈর্ষণীয়।

কয়েক বছর পর প্রকাশ হওয়া ‘গ্রেসাম ল সিন্ড্রোম অ্যান্ড বিয়ন্ড’-এর মতো আরেকটি সত্যিকার অর্থবহ, গভীর বিশ্লেষণধর্মী ও চিন্তার উদ্রেককারী বই আমরা তাঁর কাছ থেকে পেয়েছি। বাংলাদেশের রাজনীতির ওপর লেখা তাঁর বই ‘অবাক বাংলাদেশ বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি’ বাংলাদেশ তথা এতদঞ্চলের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক সেরা দলিল। দারিদ্র্য নিয়ে বইটিও নীতি বিশ্লেষকদের অবশ্য পাঠ্য হতে পারে।
একমাত্র সন্তান ও স্ত্রীর মৃত্যুতে তিনি স্বাভাবিকভাবেই চরম শোকাহত হয়ে পড়েছিলেন। তারপরও এক তীব্র মানসিক দৃঢ়তা নিয়ে তিনি শিক্ষকতা ও লেখালেখি চালিয়ে গিয়েছিলেন। 
প্রকৃত অর্থেই তিনি ছিলেন মানবদরদি; বাংলাদেশে সুশাসন এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় এক লড়াকু সৈনিক। শত চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও তিনি নিজের কর্মনিষ্ঠা ও স্পৃহা বজায় রেখেছিলেন। শারীরিক যন্ত্রণা বা রোগ-শোক তাঁকে সহজে কাবু করতে পারেনি, যদিও তাঁকে অনেকটা অকালেই চলে যেতে হলো। আজকে তাঁর হয়তো অনেক প্রয়োজন ছিল। তবুও তিনি বেঁচে থাকবেন সব অনুসন্ধিৎসু মন আর মেধাবী নীতি প্রণেতা এবং বিশ্লেষকদের মধ্যে; দেশের প্রশ্নে ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা আর ভালোবাসার মধ্যে।

মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক; ব্র্যাক বিজনেস স্কুলে আকবর আলি খানের সহকর্মী
 

আরও পড়ুন

×