ঢাকা মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জবি শিক্ষার্থীকে আটকের চেষ্টা

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাড়াবাড়ি

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাড়াবাড়ি
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২১

| প্রিন্ট সংস্করণ

রবিবার সকালে র‍্যাবের কতিপয় সদস্য কর্তৃক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী শিক্ষার্থীকে তুলিয়া লইবার চেষ্টায় সচেতন মানুষ মাত্রেরই উদ্বিগ্ন হওয়া স্বাভাবিক। যাহাদের কারণে ভুক্তভোগী অন্তত সেই যাত্রায় রক্ষা পাইয়াছেন, তাহাদের বক্তব্য উদ্ধৃত করিয়া সোমবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন বলিতেছে, পারিবারিক বিরোধ হেতু দায়ের হওয়া এক চুরির মামলায় রাজধানীর পুরান ঢাকার কলতাবাজার এলাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ছাত্রীদের একটি মেসে অভিযান চালাইয়া উক্ত ছাত্রীকে র‍্যাবের গাড়িতে তোলা হয়। খবর পাইয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম ও এক শিক্ষক দ্রুত অকুস্থলে গিয়া নিয়মবহির্ভূত উপায়ে তাহাদের ছাত্রীকে আটকের বিরোধিতা করেন। শেষ পর্যন্ত র‍্যাব সদস্যরাও কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে উক্ত বিষয়ে অবহিতকরণের কোনো নমুনা দেখাইতে না পারিয়া ঐ শিক্ষার্থীকে ছাড়াই ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকগণ যথার্থই বলিয়াছেন, শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা মামলা থাকিলে যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবস্থা লইতে হইবে, যাহা সাধারণত পুলিশের মাধ্যমেই কার্যকর হইয়া থাকে। নিঃসন্দেহে, পুলিশেরই বিশেষ ইউনিট হিসাবে প্রতিষ্ঠিত র‍্যাবও ক্ষেত্রবিশেষ কোনো মামলার আসামিকে গ্রেপ্তার করিতে পারে। সেই ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট থানাকে অবহিতকরণের বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। মূলত ঘটনাস্থলে উপস্থিত জকসুর সমাজসেবা সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমানের নিকট হইতে অবগত হইয়া এবং তাঁহার তাগাদায় সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে হাজির হন। ফলে ঘটনাটি উক্ত র‍্যাব সদস্যদের নিয়মবহির্ভূত আচরণই নির্দেশ করে না; অতীতে বিভিন্ন সময়ে এই বাহিনীর অসাধু সদস্যদিগের নানা অপকর্মের কথাও স্মরণ করাইয়া দেয়। অনেকের হয়তো স্মরণে থাকিবার কথা, ২০১১ সালের ২৩ মার্চ ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার কাঠপট্টি গ্রামে সন্ত্রাসের ভুয়া অভিযোগে র‍্যাব গুলি করিয়া কলেজছাত্র লিমন হোসেনকে গুরুতর আহত করে। যাহার ফলে ভুক্তভোগীর বাম পা কর্তন করিয়া ফেলিতে হয়। শুধু র‍্যাব নহে, সেই আমলে ডিবিসহ পুলিশের অন্যান্য শাখাও এহেন অসংখ্য বাড়াবাড়ি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনা ঘটায়।

স্বাভাবিকভাবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর আইনবহির্ভূত সকল কর্মকাণ্ড বন্ধ হইবে বলিয়া আশা করা হইয়াছিল। বিশেষত বিগত আমলে পুলিশ ও অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিপীড়ন ও হয়রানির প্রধান ভুক্তভোগী হিসেবে গত সংসদ নির্বাচনকালে এবং ক্ষমতাসীন হইবার পর বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দের প্রতিশ্রুতির পর জনপরিসরে সেই আশা ব্যাপকতা পায়। গত মে মাসে রাজধানীতে পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানেও প্রধানমন্ত্রী প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করিয়া পুলিশকে কেবল আইন অনুযায়ী কার্য সম্পাদনের স্বাধীনতা দেওয়া হইবে মর্মে প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বলিয়াছেন, সাধারণ নাগরিকদের উপর ক্ষমতার অপব্যবহার বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা-হয়রানি সম্পূর্ণ বন্ধ করিতে কঠোর নির্দেশনা পুলিশকে দেওয়া হইয়াছে। তিনি এমন কথাও বলিয়াছেন, ‘জনবান্ধব বাহিনী’রূপে শুধু পুলিশকে গড়িয়া তোলা হইবে না; এই লক্ষ্যে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আইনি কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা হইতেছে। তবে আলোচ্য ঘটনা প্রমাণ করিল– সেই প্রত্যাশা এখনও সুদূরপরাহত।

অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের দায়িত্ব যাহাদের উপর অর্পিত, তাহারা যখন আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনপূর্বক বেপরোয়া আচরণ করিয়া থাকেন তখন সাধারণ মানুষের আর ভরসার জায়গা থাকে না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারি অঙ্গীকারও কার্যত বুলিসর্বস্ব হইয়া দাঁড়ায়। আমরা জানি, দায়িত্ব পালনকালে বাড়াবাড়ি বা অপকর্মে সংশ্লিষ্ট হইবার কারণে প্রতিটি বাহিনীর জন্য সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান-সংবলিত আইন বিদ্যমান। কিন্তু অতীতে কোনো ঘটনাতে সেইগুলির কার্যকর প্রয়োগ হয় নাই। আমাদের প্রত্যাশা, বর্তমান সরকার এই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করিবে। উহার অংশরূপে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে আলোচ্য ঘটনায় সংশ্লিষ্ট র‍্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ গৃহীত হইবে এবং ভবিষ্যতে রক্ষকের ভক্ষক হইবার এহেন মন্দ দৃষ্টান্ত স্থাপনের পথ চিরতরে বন্ধ হইবে।

আরও পড়ুন

×