অর্থনীতি
ব্যাংক নয়, ব্যাংকিং ব্যবস্থা বাঁচানো দরকার
মাহফুজুর রহমান
মাহফুজুর রহমান
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
একজন চাকরিজীবী অফিস থেকে পাওয়া প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি ও অন্যান্য পাওনার প্রায় পুরোটাই ব্যাংকে রাখেন এটা ভেবে যে, সেখান থেকে প্রতি মাসে প্রাপ্ত সুদ বা মুনাফা দিয়ে তাঁর সংসার চলে যাবে। বাস্তবেও অনেক সময় তেমন ঘটে থাকে। সে হিসেবে ব্যাংক ওই চাকরিজীবীর কাছে শুধু টাকা রাখার জায়গা নয়, অবসর জীবনের নিরাপত্তাও বটে। কিন্তু সেই নিরাপত্তাই এখন প্রশ্নের মুখে। ব্যাংকের আর্থিক দুরবস্থার কারণে অনেক আমানতকারী সময়মতো নিজের টাকা তুলতে পারছেন না; কেউ প্রত্যাশিত মুনাফা পাচ্ছেন না, কেউ উদ্বেগে আছেন আসল টাকা ফেরত পাওয়া নিয়েও।
শুধু চাকরিজীবী নন; বহু কৃষক, অটোচালক তথা স্বল্প আয়ের মানুষও ব্যাংকে সঞ্চয় রেখে আজ অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। ব্যাংকের মতো একটা নিরাপদ আশ্রয় যখন অনিরাপদ হয়, তখন শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জনআস্থার সংকট তৈরি হয় না; সময়মতো উপযুক্ত প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ না নিলে ধীরে ধীরে এর প্রভাব পড়ে গোটা ব্যাংক ব্যবস্থায়।
কোনো একটি ব্যাংক আর পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে এক নয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতির স্বরূপ বোঝার জন্য কয়েকটি তথ্যই যথেষ্ট।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে। দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংকগুলোর গড় যেখানে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশের হার চার গুণেরও বেশি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূলধন-ঝুঁকি অনুপাত ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশ। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, দেশের মোট আর্থিক খাতের সম্পদের প্রায় ৯০ শতাংশই ব্যাংকিং খাতে। অর্থাৎ সংকট নিছক কয়েকটি ব্যাংকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যাংকিং খাত দুর্বল হলে তার অভিঘাত পড়ে আমানতকারী, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, চাকরিজীবী এবং শেষ পর্যন্ত পুরো অর্থনীতির ওপর।
ব্যাংকের প্রধান কাজ হলো মানুষের সঞ্চয় সংগ্রহ করে তা উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা। ব্যাংক সেই কাজ ঠিকমতো করতে না পারলে অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। নতুন শিল্প গড়ে ওঠে না, পুরোনো শিল্প বিনিয়োগ বাড়াতে পারে না, কর্মসংস্থান কমে, বিনিয়োগের খরচ বাড়ে। ফলে ব্যাংকিং সংকট শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও পেছনে টেনে ধরে।
কোনো ব্যাংক তার নিজের দুর্বলতা, অনিয়ম, ভুল ব্যবস্থাপনা কিংবা প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে বিপদগ্রস্ত হলে আমরা ব্যাংকটিকে বাঁচানোর জন্য রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে টাকা দিই অথবা দক্ষভাবে পরিচালিত মুনাফা অর্জনকারী ব্যাংককে টাকা দিতে বাধ্য করি। কিন্তু সংকট যেখানে সার্বিক সেখানে শুধু কয়েকটি ব্যাংক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করলে সংকটের মূল জায়গা সমাধানের বাইরেই থেকে যাবে। একটি দুর্বল ব্যাংককে তারল্য দেওয়া, মূলধন জোগানো, ঋণ পুনঃতপশিল করা কিংবা সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়তো সাময়িকভাবে ব্যাংকটিকে টিকিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু যদি একই সঙ্গে অনিয়মকারী মালিক, পরিচালক বা ঋণগ্রহীতার জবাবদিহি নিশ্চিত না হয়, তাহলে সমস্যাটির কুফলকে বড় জোর একটু বিলম্বিত করা হয়। আজ একটি ব্যাংককে বাঁচাতে টাকা দেওয়া হলো; কাল আরেকটি ব্যাংক একই সমস্যায় পড়ল। এভাবে চলতে থাকলে একসময় প্রশ্ন উঠবে, এর শেষ কোথায়?

রাষ্ট্রের অর্থ মানে শেষ পর্যন্ত জনগণের অর্থ। তাই ব্যাংক বাঁচানোর নামে ব্যাংকের মালিককে বাঁচানো যাবে না। রক্ষা করতে হবে আমানতকারী, সৎ ব্যাংকার, পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি গণআস্থাকে।
বিশ্বের উন্নত ব্যাংকিং ব্যবস্থাগুলো এই নীতিই অনুসরণ করে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৩ সালে সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক ও সিগনেচার ব্যাংক ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু ব্যাংক ব্যর্থ হয়েছে বলে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ভেঙে পড়তে দেওয়া হয়নি। আমানতকারীদের সুরক্ষা, সম্পদ ও দায়ের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজন হলে নতুন ব্যবস্থাপনার হাতে ব্যাংকের কার্যক্রম তুলে দেওয়ার মতো ব্যবস্থা সেখানে রয়েছে। সিলিকন ভ্যালি ব্যাংকের ক্ষেত্রে ‘ব্রিজ ব্যাংক’ গঠন করে কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছিল, যাতে আকস্মিক পতনের অভিঘাত কমানো যায়।
এর শিক্ষা খুব সরল: ব্যাংক ব্যর্থ হতে পারে; কিন্তু ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। একইভাবে দুর্বল ব্যাংককে প্রয়োজন হলে পুনর্গঠন, একীভূতকরণ বা সুশৃঙ্খলভাবে বাজার থেকে বের করে দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠনের জন্য বাংলাদেশেও ইতোমধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ বাংলাদেশ ব্যাংককে দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন বা সমাধানের ক্ষেত্রে নতুন ক্ষমতা দিয়েছে। পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে resolution প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। আমানতকারীর আস্থা বাড়াতে আমানত সুরক্ষার সীমা এক লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই লাখ টাকা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, সম্পদের মান যাচাই এবং ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ঋণের বিপরীতে সম্ভাব্য ক্ষতি হিসাবের ব্যবস্থাও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু শুধু এ পদক্ষেপগুলোই বিদ্যমান সংকট থেকে ব্যাংক ব্যবস্থাকে রক্ষা করবে, তা বলা যায় না। আইএমএফের সর্বশেষ জুলাই ২০২৬-এর পর্যবেক্ষণেও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ এখনও উচ্চ পর্যায়ে। সংস্থাটি বলেছে, ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনের কাজকে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সমন্বিত কৌশলের ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে হবে এবং সুশৃঙ্খলভাবে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর করা জরুরি। তাহলে আমাদের করণীয় কী?
প্রথমত, ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা গোপন না রেখে প্রকাশ করতে হবে। কত খেলাপি ঋণ, কত মূলধন ঘাটতি, কত সম্পদ আদৌ আদায়যোগ্য নয়, এসবের নিরপেক্ষ হিসাব দরকার। দ্বিতীয়ত, দুর্বল ব্যাংকের জন্য পরিষ্কার পথ থাকতে হবে– পুনর্গঠন, একীভূতকরণ অথবা সুশৃঙ্খলভাবে বন্ধ করে দেওয়া। তৃতীয়ত, আমানতকারীর স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। চতুর্থত, ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনায় যোগ্যতা, সততা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা আরও শক্তিশালী করতে হবে। নিয়ন্ত্রক দুর্বল হলে সবচেয়ে ভালো আইনও কার্যকর হয় না।
ব্যাংকিং ব্যবস্থা আসলে একটি বিশ্বাসের ব্যবস্থা। মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখেন এই বিশ্বাসে– প্রয়োজনের সময় তাঁর টাকা ফেরত পাবেন। ব্যবসায়ী ঋণ নেন এই বিশ্বাসে– ব্যাংক আগামীকালও তাঁর পাশে থাকবে। সেই বিশ্বাস ভেঙে গেলে শুধু ব্যাংকের হিসাবের খাতা ভারী হয় না; অর্থনীতির গতি মন্থর হয়ে যায়।
তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরবে– এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
মাহফুজুর রহমান: লেখক ও সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক
- বিষয় :
- অর্থনীতি