সাক্ষারতা দিবস
টেকসই সমৃদ্ধির জন্য নিরক্ষরতা দূর করতে হবে
মোছা. নূরজাহান খাতুন
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
আজ বিশ্বব্যাপী সাক্ষরতা দিবসের প্রতিপাদ্য– মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা। আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালনের মূল তাৎপর্য হলো দেশের প্রত্যেক মানুষের মধ্যে শিক্ষা ও অক্ষরজ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া এবং নিরক্ষরতা দূর করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার সময় আমাদের দেশে সাক্ষরতার মাত্রা ছিল ১৬.৮ শতাংশ এবং ১৯৭৪ সালের প্রথম জনশুমারিতে তা দাঁড়ায় ২৬.৮৩ শতাংশে, এখন ৭৭.৯ শতাংশ।
ব্যক্তি, সমাজ ও জাতীয় জীবনে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। শিক্ষা গ্রহণের প্রাথমিক পর্যায় হলো সাক্ষরতা, যা ব্যক্তির ক্ষমতায়ন, সামাজিক ও মানবীয় উন্নয়নের অন্যতম হাতিয়ার। স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও মৌলিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ায় শিক্ষা। জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেসকো) ১৯৯৩ সালে সাক্ষরতার সংজ্ঞা নির্ধারণ করে। সেখানে বলা হয়, মাতৃভাষায় ছোট বাক্য পড়া, লেখা ও দৈনন্দিন হিসাবনিকাশের জ্ঞানই সাক্ষরতা। ১৯৬৫ সালে ইউনেসকো প্রতি বছর ৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয় এবং ১৯৬৬ সালে ইউনেসকো প্রথমবারের মতো বিশ্বে দিবসটি পালন করে। এ ছাড়া জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৪ নম্বর লক্ষ্যমাত্রায় ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের সব পূর্ণবয়স্ক নারী-পুরুষ এবং প্রবীণ জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সাক্ষরতা ও হিসাবনিকাশে দক্ষতা অর্জনের কথা বলা হয়েছে। সেই লক্ষ্য অর্জনেও বাংলাদেশ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
যে দেশে সাক্ষরতার হার বেশি, সে দেশ তত উন্নত। ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, লুক্সেমবার্গের মতো ইউরোপের দেশগুলো আয়তনে ছোট হলেও সাক্ষরতার হার শতভাগ হওয়ায় তাদের জনগণ উন্নয়নের সুফল ভোগ করছে। অন্যদিকে মালি, নাইজার, সোমালিয়ার মতো তুলনামূলক বৃহদায়তনের আফ্রিকান দেশগুলোতে সাক্ষরতার হার অনেক কম হওয়ায় তারা ক্ষুধা, দারিদ্র্যসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যায় জর্জরিত। অর্থনীতি ও জনসংখ্যায় বৃহৎ দেশগুলোসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের সাক্ষরতার হার বৃদ্ধির জন্য নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করছে। বাংলাদেশে সামগ্রিক সাক্ষরতার হার বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও এখনও প্রায় ২২ শতাংশ মানুষের অক্ষরজ্ঞান নেই।
শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার।এই মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় শিক্ষা আইন দরকার। আমাদের প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশসহ উন্নত দেশে শিক্ষা আইন রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে শিক্ষা আইন নেই। ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী কভিডের সময়ে বাংলাদেশে তিন কোটি ৭০ লাখ শিশুর পড়াশোনা সরাসরি বিঘ্নিত হয়েছে, যা বিশ্বে চতুর্থ সর্বোচ্চ। বাংলাদেশে কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে দীর্ঘ ১৭ মাস স্কুল বন্ধ ছিল। দারিদ্র্য, জলবায়ুর প্রভাব, নারীর নিরাপত্তা, বাল্যবিবাহ, বন্যা, মহামারি এবং হাওর-বাঁওড় এলাকায় ব্যাপকভাবে এই সাক্ষরতার হার বিঘ্নিত হচ্ছে। এ জন্য সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং পদক্ষেপ দরকার। বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তিগতভাবে অনেক এগিয়ে গেছে। এ সময় শুধু অক্ষর বা বাক্য লিখতে, পড়তে পাড়া ও গণিতের জ্ঞানসম্পন্ন প্রচলিত সাক্ষরতার গুরুত্ব কমে এসেছে।
এবারের প্রতিপাদ্যে সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতার কথা বলা হয়েছে। টেকসই সমৃদ্ধির পূর্বশর্তের জন্য নিরক্ষরতা দূরীকরণ ও দক্ষ জনশক্তি গঠন জরুরি। সে জন্য তরুণ জনগোষ্ঠীকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা দিয়ে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে, যাতে তারা উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত হতে পারে। আমাদের সংবিধানে শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি নিরক্ষরতা দূরীকরণের অঙ্গীকার করা হয়েছে। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আইন-২০১৪ অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রম আরও বিস্তৃত এবং শিক্ষা আইন করতে হবে।
পৃথিবীতে এমন একটি দেশ নেই– শতভাগ সাক্ষর হয়েও গরিব। প্রতিটি দেশই আগে শতভাগ বা তার কাছাকাছি সাক্ষর হয়েছে, তারপর উন্নতি করেছে। আমাদের দেশের ২২ শতাংশ মানুষকে নিরক্ষর রেখে সামনে এগোনো অসম্ভব। শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে মেধানির্ভর ও প্রযুক্তিভিত্তিক উন্নত অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য সাধারণ সাক্ষরতার গণ্ডি পেরিয়ে আমাদের মানসম্মত শিক্ষার দিকে এগোতে হবে।
মোছা. নূরজাহান খাতুন: অতিরিক্ত সচিব (অব.)
- বিষয় :
- দিবস